একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পরিচিত ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি বিধান অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলেও, এসব কর্মকর্তার নাম ২০১৮ সালের নির্বাচন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল।
জানা গেছে, বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা মূলত ২০তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের সদস্য। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তারা দেশের বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্বাচনে ভোটের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
সূত্র জানিয়েছে, একই ধরনের অভিযোগে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ২১ ও ২২ ব্যাচের আরও ৩৫ কর্মকর্তার বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। তাদের চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হবে ২০২৮ সালে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তখন তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আগের সময়ে শুরু হলেও তারা ২০০১ সালের ৩১ মে চাকরিতে যোগ দেন। একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেন, পুলিশ বাহিনী চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং দায়িত্ব পালনকালে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন। অবসরের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে তারা মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বাধ্যতামূলক অবসরের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্ত।
অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন বরিশালের সাবেক এসপি সাইফুল ইসলাম, নরসিংদীর মিরাজ উদ্দিন, ঢাকা জেলার শাহ মিজান শাফিউর রহমান, গুলশান বিভাগের সাবেক ডিসি মোস্তাক আহমেদ খান, চাঁদপুরের জিহাদুল কবির, যশোরের মঈনুল হক, নোয়াখালীর ইলয়াছ শরীফ, ফরিদপুরের জাকির হোসেন, ময়মনসিংহের শাহ আবিদ হোসেন, সিলেটের মনিরুজ্জামান, সুনামগঞ্জের বরকত উল্লাহ খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আনোয়ার হোসেন, টাঙ্গাইলের সঞ্জয় কুমার, গোপালগঞ্জের সাইদুর রহমান খান, গাজীপুরের শামসুন্নাহার, মাগুরার খান মুহাম্মদ রেজোয়ান, কিশোরগঞ্জের মাশরুকুর রহমান খালেদসহ আরও অনেকে। এছাড়া সাবেক সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলামও এ তালিকায় রয়েছেন।
তাদের মধ্যে সাবেক ডিআইজি ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পদায়নে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দায়িত্বে থাকাকালে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
অতিরিক্ত ডিআইজি আনোয়ার হোসেন খানের বিরুদ্ধেও কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপি হিসেবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগে তিনি আলোচনায় আসেন। এছাড়া ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, সাবেক পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে ইয়াবা পাচারকাণ্ডে অধীনস্থ সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং তদারকির ব্যর্থতার অভিযোগে সমালোচিত হন। বিষয়টি সে সময় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সরকারি সিদ্ধান্তে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ায় এসব কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও, তাদের অনেকের নাম দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে।
বিষয় : পুলিশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুলাই ২০২৬
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বহুল আলোচিত ‘রাতের ভোট’ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পরিচিত ৩৩ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি বিধান অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলেও, এসব কর্মকর্তার নাম ২০১৮ সালের নির্বাচন, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল।
জানা গেছে, বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা মূলত ২০তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের সদস্য। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তারা দেশের বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্বাচনে ভোটের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।
সূত্র জানিয়েছে, একই ধরনের অভিযোগে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের ২১ ও ২২ ব্যাচের আরও ৩৫ কর্মকর্তার বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। তাদের চাকরির ২৫ বছর পূর্ণ হবে ২০২৮ সালে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তখন তাদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের আগের সময়ে শুরু হলেও তারা ২০০১ সালের ৩১ মে চাকরিতে যোগ দেন। একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেন, পুলিশ বাহিনী চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং দায়িত্ব পালনকালে তারা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন। অবসরের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে তারা মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, বাধ্যতামূলক অবসরের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্ত।
অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন বরিশালের সাবেক এসপি সাইফুল ইসলাম, নরসিংদীর মিরাজ উদ্দিন, ঢাকা জেলার শাহ মিজান শাফিউর রহমান, গুলশান বিভাগের সাবেক ডিসি মোস্তাক আহমেদ খান, চাঁদপুরের জিহাদুল কবির, যশোরের মঈনুল হক, নোয়াখালীর ইলয়াছ শরীফ, ফরিদপুরের জাকির হোসেন, ময়মনসিংহের শাহ আবিদ হোসেন, সিলেটের মনিরুজ্জামান, সুনামগঞ্জের বরকত উল্লাহ খান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আনোয়ার হোসেন, টাঙ্গাইলের সঞ্জয় কুমার, গোপালগঞ্জের সাইদুর রহমান খান, গাজীপুরের শামসুন্নাহার, মাগুরার খান মুহাম্মদ রেজোয়ান, কিশোরগঞ্জের মাশরুকুর রহমান খালেদসহ আরও অনেকে। এছাড়া সাবেক সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলামও এ তালিকায় রয়েছেন।
তাদের মধ্যে সাবেক ডিআইজি ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং পদায়নে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দায়িত্বে থাকাকালে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
অতিরিক্ত ডিআইজি আনোয়ার হোসেন খানের বিরুদ্ধেও কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এসপি হিসেবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগে তিনি আলোচনায় আসেন। এছাড়া ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, সাবেক পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনকালে ইয়াবা পাচারকাণ্ডে অধীনস্থ সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং তদারকির ব্যর্থতার অভিযোগে সমালোচিত হন। বিষয়টি সে সময় দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
সরকারি সিদ্ধান্তে ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ায় এসব কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও, তাদের অনেকের নাম দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিতর্কের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন