ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর এবার বড় ধরনের আর্থিক ও সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। দলের প্রায় ৪৪০ কোটি রুপি জমা থাকা তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডেবিট অপারেশন স্থগিত করেছে পুলিশ। ফলে অ্যাকাউন্টগুলোতে নতুন অর্থ জমা দেওয়া গেলেও সেখান থেকে কোনো টাকা উত্তোলন বা অন্যত্র স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।
দলটির বিদ্রোহী কয়েকজন বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া এই পদক্ষেপ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে কোটি কোটি রুপির এই তহবিলের উৎস নিয়েও শুরু হয়েছে প্রশ্ন।
বিধাননগরের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি বেসরকারি ব্যাংকে থাকা তিনটি অ্যাকাউন্ট বর্তমানে ‘ডেবিট ফ্রিজ’-এর আওতায় রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন করা যাবে না।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের সাংগঠনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠে। একপক্ষে রয়েছেন দলের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায়ের অনুসারীরা।
এই বিরোধের জেরে ঋতব্রতপন্থী ১০ জন বিধায়ক বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তারা দাবি করেন, দলীয় অ্যাকাউন্টে থাকা বিপুল অর্থের উৎস তদন্ত করে দেখা হোক। সেই অর্থ বৈধ উৎস থেকে এসেছে নাকি অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তারা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, অ্যাকাউন্টগুলোতে জমা থাকা অর্থের সঙ্গে ‘কাটমানি’ আদায়, সরকারি অর্থের অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়মের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একজন বিদ্রোহী বিধায়ক অভিযোগে উল্লেখ করেন, নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত কিছু অর্থ এসব অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এক প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের বিষয়ে তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবগত হলেও এখনো কোনো সরকারি নোটিশ হাতে পাননি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে কয়েকদিন আগেই অরূপ বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে দলীয় তহবিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, দলের প্রায় ৫০০ কোটি রুপির বেশি অর্থ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। নেতৃত্ব সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের লেনদেন স্থগিত রাখারও অনুরোধ করেন তিনি।
তবে অরূপ বিশ্বাসের এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন তৃণমূলের আরেক নেতা কুনাল ঘোষ। তার দাবি, অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে দলের কোষাধ্যক্ষ নন এবং আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ারও তার নেই।
কুনাল ঘোষ জানান, গত ৫ জুন অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শুভাশিষ চক্রবর্তীকে দলের নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর থেকে তিনিই আর্থিক বিষয়গুলো দেখভাল করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন কেবল রাজনৈতিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একদিকে কোটি কোটি রুপির তহবিলের উৎস নিয়ে পুলিশি তদন্তে রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে দলের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের বৈধতা নিয়েও প্রকাশ্য সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দল পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ, সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর এবার বড় ধরনের আর্থিক ও সাংগঠনিক সংকটে পড়েছে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি)। দলের প্রায় ৪৪০ কোটি রুপি জমা থাকা তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ডেবিট অপারেশন স্থগিত করেছে পুলিশ। ফলে অ্যাকাউন্টগুলোতে নতুন অর্থ জমা দেওয়া গেলেও সেখান থেকে কোনো টাকা উত্তোলন বা অন্যত্র স্থানান্তর করা যাচ্ছে না।
দলটির বিদ্রোহী কয়েকজন বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া এই পদক্ষেপ তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একই সঙ্গে কোটি কোটি রুপির এই তহবিলের উৎস নিয়েও শুরু হয়েছে প্রশ্ন।
বিধাননগরের এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি বেসরকারি ব্যাংকে থাকা তিনটি অ্যাকাউন্ট বর্তমানে ‘ডেবিট ফ্রিজ’-এর আওতায় রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন করা যাবে না।
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে দলের ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের সাংগঠনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়ে ওঠে। একপক্ষে রয়েছেন দলের প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দোপাধ্যায়ের অনুসারীরা।
এই বিরোধের জেরে ঋতব্রতপন্থী ১০ জন বিধায়ক বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তারা দাবি করেন, দলীয় অ্যাকাউন্টে থাকা বিপুল অর্থের উৎস তদন্ত করে দেখা হোক। সেই অর্থ বৈধ উৎস থেকে এসেছে নাকি অবৈধ উপায়ে অর্জিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তারা।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, অ্যাকাউন্টগুলোতে জমা থাকা অর্থের সঙ্গে ‘কাটমানি’ আদায়, সরকারি অর্থের অপব্যবহার কিংবা অন্য কোনো আর্থিক অনিয়মের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একজন বিদ্রোহী বিধায়ক অভিযোগে উল্লেখ করেন, নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত কিছু অর্থ এসব অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ এক প্রবীণ নেতা জানিয়েছেন, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের বিষয়ে তারা অনানুষ্ঠানিকভাবে অবগত হলেও এখনো কোনো সরকারি নোটিশ হাতে পাননি। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে কয়েকদিন আগেই অরূপ বিশ্বাস সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে দলীয় তহবিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, দলের প্রায় ৫০০ কোটি রুপির বেশি অর্থ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। নেতৃত্ব সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের লেনদেন স্থগিত রাখারও অনুরোধ করেন তিনি।
তবে অরূপ বিশ্বাসের এই অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন তৃণমূলের আরেক নেতা কুনাল ঘোষ। তার দাবি, অরূপ বিশ্বাস বর্তমানে দলের কোষাধ্যক্ষ নন এবং আর্থিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ারও তার নেই।
কুনাল ঘোষ জানান, গত ৫ জুন অনুষ্ঠিত কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে শুভাশিষ চক্রবর্তীকে দলের নতুন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর থেকে তিনিই আর্থিক বিষয়গুলো দেখভাল করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হয়ে যাওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন কেবল রাজনৈতিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একদিকে কোটি কোটি রুপির তহবিলের উৎস নিয়ে পুলিশি তদন্তে রূপ নিয়েছে, অন্যদিকে দলের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের বৈধতা নিয়েও প্রকাশ্য সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দল পরিচালনার দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ, সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন