সবুজের শ্যামলিমায় রূপসী বাংলাকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার দীপ্ত প্রত্যয়ে অনুষ্ঠিত 'বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ২০২৬'-এ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে হাওর-বাঁওড় ও নদীঘেরা ঐতিহাসিক জেলা কিশোরগঞ্জ। "সবুজে সাজাই বাংলাদেশ" — এই মর্মস্পর্শী ও দূরদর্শী প্রতিপাদ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে সমগ্র দেশজুড়ে পরিচালিত এই মহতী বৃক্ষরোপণ অভিযানে সাফল্য ও বাস্তবায়নের ভিত্তিতে সারা বাংলাদেশের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ চতুর্থ স্থান অধিকার করার গৌরব অর্জন করেছে এই জেলা। সবুজের প্রতি গভীর মমতা, সচেতনতা এবং সুসংগঠিত সমাজিক উদ্যোগের এক অপরূপ মেলবন্ধনে কিশোরগঞ্জ আজ জাতীয় অঙ্গনে এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।
প্রকৃতি ও মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই বছর বন বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কিশোরগঞ্জের প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলে এক অভাবনীয় সবুজ বিপ্লব ঘটে যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবেলা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ বছর জেলাজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে লাখ লাখ ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। চারা রোপণের কেবল সংখ্যাগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই নয়, বরং গাছের সঠিক পরিচর্যা, স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা এবং রোপণকৃত চারার স্থায়িত্ব ও টিকে থাকার উচ্চ হারের সুবাদেই বিচারক ও জাতীয় মূল্যায়ন কমিটির দৃষ্টিতে কিশোরগঞ্জ জেলা চতুর্থ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
কিশোরগঞ্জের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে এক বিশাল সুসংগঠিত কর্মযজ্ঞ ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের যৌথ পরিচালনায় বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় বিস্তৃত পরিসরে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়। সমতল ভূমির কৃষি ক্ষেত্রের আইল থেকে শুরু করে হাওরাঞ্চলের ভেড়িবাঁধ, নদীর তীর, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার প্রাঙ্গণ, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তার দুই পাশে রোপণ করা হয়েছে নিম, বকুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়া, মেহগনি, আমলকী, অর্জুন, বয়রা ও হরেক পদের দেশীয় ফলদ বৃক্ষ। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা হাওরাঞ্চল—ইটনা, মিঠামইন, অস্টগ্রাম ও নিকলীতে বাঁধ সুরক্ষা ও পরিবেশের সুরক্ষায় রোপণ করা হয়েছে বিশেষ হিজল, করচ ও ছাতিম গাছ, যা রূপসী হাওরের রূপকে কেবল দ্বিগুণই করেনি, বরং প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবেও কাজ করছে।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা বৃক্ষরোপণ কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন এই ঐতিহাসিক অর্জনে গভীর সন্তোষ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জানান, "সবুজে সাজাই বাংলাদেশ—এই ডাক কেবল একটি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ প্রতিপাদ্য ছিল না, বরং এটি হয়ে উঠেছিল কিশোরগঞ্জবাসীর প্রতিটি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়া এক সামাজিক আন্দোলন। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক, কৃষক, ছাত্র-শিক্ষক এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাটি ও সবুজের টানে এগিয়ে এসেছে। রোপণকৃত প্রতিটি চারার সুরক্ষা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত হয়েছিল স্থানীয় মনিটরিং দল। একটি বৃক্ষ রোপণ করা মানে শুধু একটি জীবন বাঁচানো নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক টুকরো সবুজ ও নির্মল পৃথিবী উপহার দেওয়া—এই উপলব্ধিই কিশোরগঞ্জকে আজ জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ স্থানের সম্মান এনে দিয়েছে।"
কিশোরগঞ্জ জেলা বন বিভাগের কার্যালয় সূত্রে পাওয়া পরিসংখ্যানে জানা যায়, এ বছর পুরো জেলায় সরকারিভাবে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে কয়েক লক্ষাধিক বৃক্ষরোপণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার প্রায় শতভাগই সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় নার্সারিগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা, বিনামূল্যে ও স্বল্পমূল্যে উন্নত জাতের চারাবিতরণ এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে "এক শিক্ষার্থী, একটি বৃক্ষ" কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৃক্ষপ্রেমের যে বীজ বপন করা হয়েছিল, তা সার্বিক মূল্যায়নে কিশোরগঞ্জকে অন্য অনেক জেলার চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছে। শুধু গাছ লাগানোই শেষ নয়, রোপণকৃত চারার সুরক্ষায় বাঁশের খাঁচা তৈরি ও নিয়মিত পানি সেচ দেওয়ার মতো নিবিড় পরিচর্যার বিষয়টিকে চূড়ান্ত মূল্যায়নে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বৃক্ষরোপণের এই সবুজ উৎসবে স্থানীয় জনগণের আবেগ ও আকুলতা ছিল চোখ পড়ার মতো। শহরের ইট-কাঠের যান্ত্রিক দেয়াল পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মেঠোপথ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের আনাচে-কানাচে লেগেছিল বৃক্ষরোপণের এক অনাবিল আনন্দ-উৎসব। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী তরুণরা স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রচারপত্র বিতরণ, পথনাটক এবং সুধী সমাবেশের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষায় গাছের অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। পরিবেশবিদরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে আমাদের রক্ষা পাওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টনী। কিশোরগঞ্জ জেলা যেভাবে জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ স্থান অর্জন করে এক অনন্য নজির গড়ে তুলল, তা দেশের অন্যান্য জেলার জন্যও অনুপ্রেরণার বার্তা বহন করে।
জাতীয় পর্যায়ে কিশোরগঞ্জের এই গৌরবময় স্বীকৃতি কেবল একটি পুরস্কার বা প্রাপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি কিশোরগঞ্জবাসীর পরিবেশ সচেতনতা এবং মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসার এক বাস্তব প্রতিফলন। 'সবুজে সাজাই বাংলাদেশ' প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে কিশোরগঞ্জ আজ যে নতুন রূপ লাভ করেছে, তার সুফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম। গাছের প্রতিটি কচি পাতার সজীবতায়, বাতাসের প্রতিটি নির্মল শ্বাসে এবং পাখিদের কলকাকলিতে বেঁচে থাকবে এই মহতী উদ্যোগের সাফল্য। সবুজে ঘেরা, শান্ত ও সুশীতল এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় কিশোরগঞ্জ জেলা সূচনা করেছে, সেই সবুজ বিপ্লবের ধারা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা জেলাবাসী ও সকল পরিবেশপ্রেমীদের।tapashmainul70@gmail.com
সবুজে সমারোহে দেশ গড়ার দীপ্ত অঙ্গীকার, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি ২০২৬-এ জাতীয় পর্যায়ে চতুর্থ কিশোরগঞ্জ।
সবুজের প্রতি গভীর মমতা, সচেতনতা এবং সুসংগঠিত সমাজিক উদ্যোগের এক অপরূপ মেলবন্ধনে কিশোরগঞ্জ আজ জাতীয় অঙ্গনে এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করল।








