অপরাধ ও দুর্ণীতি

টেলিগ্রামে চাকরির ফাঁদে ৯৪ লাখ খোয়া, কিশোরগঞ্জে ২ মূলহোতা গ্রেপ্তার

ডিজিটাল প্রযুক্তির আড়ালে আত্মগোপনে থাকা এই চক্রটিকে শনাক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি চালাচ্ছিল সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স টিম।

⎙ প্রিন্ট
টেলিগ্রামে চাকরির ফাঁদে ৯৪ লাখ খোয়া, কিশোরগঞ্জে ২ মূলহোতা গ্রেপ্তার
সিআইডির জালে আটক অনলাইন প্রতারণার মূল হোতা কিশোরগঞ্জের জুলহাস উদ্দিন ও প্রহড়।
⌖ কিশোরগঞ্জ সদর
টেলিগ্রাম অ্যাপে ঘরে বসে পার্ট-টাইম চাকরির লোভনীয় প্রস্তাব। শুধু অনলাইনে জুয়েলারি সামগ্রীর ‘অর্ডার সম্পন্ন’ করলেই মোটা অঙ্কের কমিশন। লোভের জালে পা দিয়ে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৯৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা খুইয়েছেন মেহেদি হক নিয়ন নামে এক ব্যক্তি। তবে শেষরক্ষা হয়নি সাইবার জগতের এই অদৃশ্য শিকারিদের। অবশেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জালে ধরা পড়েছে এই আন্তর্জাতিক ধাঁচের সংগঠিত অনলাইন প্রতারক চক্রের দুই সক্রিয় সদস্য।
​কিশোরগঞ্জে পরিচালিত এক বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া এই দুজন হলেন— জেলার নিকলী থানার দামপাড়া এলাকার মো. জুলহাস উদ্দিন (৩৯) এবং করিমগঞ্জ থানার গুনধর এলাকার প্রহড় (২৮)। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ।
​সিআইডি সূত্রে জানা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির আড়ালে আত্মগোপনে থাকা এই চক্রটিকে শনাক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি চালাচ্ছিল সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স টিম। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে কিশোরগঞ্জ সদর থানা এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালায় সিআইডির একটি বিশেষ টিম। ​অভিযানে মামলার ১৯ নম্বর এজাহারনামীয় আসামি মো. জুলহাস উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তাকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হলে বেরিয়ে আসে তার সহযোগীদের নাম ও গোপন আস্তানার তথ্য। জুলহাসের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে চক্রের অন্যতম সহযোগী প্রহড়কে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
​তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ডিজিটাল মাধ্যমে সুসংগঠিতভাবে সাজানো হয়েছিল এই প্রতারণার ছক। এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনাটির সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট। ভুক্তভোগী মেহেদি হক নিয়নের টেলিগ্রাম অ্যাপে অজ্ঞাত স্থান থেকে একটি মেসেজ আসে। তাকে বিশ্বখ্যাত ‘Zales’ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ঘরে বসে আকর্ষণীয় বেতনে খণ্ডকালীন চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়। ​চাকরির খবর পেয়ে নিয়ন কৌতূহলী হয়ে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আসল ওয়েবসাইট দেখতে পান। প্রতিষ্ঠানের সুনাম দেখে তার বিশ্বাস জন্মায়। তবে প্রতারক চক্রটি ভুক্তভোগীর এই সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে হুবহু মূল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি ‘ফিশিং লিংক’ (Phishing Link) তৈরি করে তাকে একটি ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে।​অনলাইনে যুক্ত করার পর চক্রটির প্রথম চাল ছিল ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জন করা। শুরুতে খুব ছোট ছোট কয়েকটি কাজ বা ‘অর্ডার সম্পন্ন’ করার বিপরীতে নিয়নকে কিছু টাকা কমিশন হিসেবে ফেরত দেওয়া হয়। এতে প্রতারকদের প্রতি তার শতভাগ আস্থা তৈরি হয়। এরপরই শুরু হয় আসল খেলা। চক্রটি নিয়নকে বলে— বড় অঙ্কের মুনাফা পেতে হলে বিভিন্ন ‘রাউন্ডে’ বিনিয়োগ করতে হবে। এভাবে ধাপে ধাপে ৯০টি আন্তর্জাতিক অর্ডারের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীকে যে ভুয়া ড্যাশবোর্ড বা অ্যাকাউন্ট দেওয়া হয়েছিল, সেখানে প্রতিবার টাকা জমা দেওয়ার পর কৃত্রিমভাবে বিপুল পরিমাণ ‘মুনাফা’ বা ব্যালেন্স দেখানো হতো। এটি দেখে প্রলুব্ধ হয়ে নিয়ন তার সারাজীবনের সঞ্চয় ও নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে ধারদেনা করে টাকা ঢালতে থাকেন। ​যখন ৯০টি অর্ডার শেষ হলো, তখন নিয়নের ভুয়া অ্যাকাউন্টে কোটি টাকারও বেশি মুনাফা প্রদর্শিত হচ্ছিল। কিন্তু সেই টাকা নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তুলতে গিয়েই বাঁধল আসল বিপদ। প্রতারক চক্রের সদস্যরা নতুন অজুহাত দাঁড় করায়— ‘টাকা তুলতে হলে প্রসেসিং ফি, ট্যাক্স ও সিকিউরিটি ডিপোজিট দিতে হবে।’
​মুনাফা পাওয়ার আশায় বাধ্য হয়ে নিয়ন প্রতারকদের দেওয়া বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে দফায় দফায় টাকা পাঠাতে থাকেন। একপর্যায়ে যখন একের পর এক ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে সর্বমোট ৯৪ লাখ ১৯ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পরও টাকা তোলার কোনো উপায় মিলল না, বরং আরও টাকা দাবি করা হলো— তখন ভুক্তভোগীর ভুল ভাঙে। তিনি বুঝতে পারেন, তিনি একটি ভয়ংকর সাইবার চক্রের শিকার হয়েছেন। ​সর্বস্ব হারিয়ে মেহেদি হক নিয়ন রাজধানীর পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। অপরাধের ধরণ জটিল ও সাইবার-ভিত্তিক হওয়ায় মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে। সিআইডির সাইবার আইটি শাখা আধুনিক ফরেনসিক অ্যানালিসিস, আর্থিক ট্রেইল (Financial Trail) এবং ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করে চক্রের নেটওয়ার্ক উন্মোচন করে।
​বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ জানান, "এটি কেবল একটি সাধারণ প্রতারণা নয়; এটি একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক সাইবার সিন্ডিকেট। তারা ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (Mule Accounts) এবং এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে সর্বশান্ত করছে। আমরা ইতোমধ্যে এই মামলার সঙ্গে জড়িত ১২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছি। সর্বশেষ কিশোরগঞ্জ থেকে জুলহাস ও প্রহড়কে গ্রেপ্তার করা হলো।"
​সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম কার্ড এবং ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এই চক্রের পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক মাস্টারমাইন্ড রয়েছে কি না বা হাতিয়ে নেওয়া টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী দল।​​প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজের প্রলোভন দেখিয়ে যেকোনো বিনিয়োগের অফার থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, ঘরে বসে শুধু লাইক, শেয়ার বা অর্ডার দিয়ে অতিরিক্ত উপার্জনের অফারগুলোর শতভাগই ভুয়া। আর অপরিচিত সূত্রের পাঠানো লিংকে ক্লিক করে ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাংকিং বিবরণ দেবেন না। তাছাড়া চাকরি পাওয়ার জন্য বা উপার্জিত টাকা তুলতে যদি উল্টো আপনাকে টাকা দিতে বলা হয়, তবে ধরে নেবেন এটি নিশ্চিত প্রতারণা।
tapashmainul70@gmail.com

সম্পর্কিত সংবাদ