অপরাধ ও দুর্ণীতি

মৌলভীবাজারে রিসোর্টের দৌরাত্ম্যে ধ্বংসের মুখে পরিবেশ ও প্রকৃতি

⎙ প্রিন্ট
মৌলভীবাজারে রিসোর্টের দৌরাত্ম্যে ধ্বংসের মুখে পরিবেশ ও প্রকৃতি
মৌলভীবাজারে রিসোর্টের দৌরাত্ম্যে ধ্বংসের মুখে পরিবেশ ও প্রকৃতি
সবুজে ঘেরা একটি পাতা দুটি কুঁড়ির দেশ চায়ের রাজ্যে হিসেবে সমাদৃত মৌলভীবাজার জেলা। পাহাড়, টিলা ও ঘন বন কেটে মৌলভীবাজারে একের পর এক ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠছে বিলাসবহুল ও নামসর্বস্ব ‘ইকো-রিসোর্ট’। পর্যটনের প্রসারের নামে পরিবেশ ধ্বংসের এই ধ্বংস লীলা চললেও এসব রিসোর্টের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই প্রশাসনের কাছে এবং এগুলোর বৈধতা নিয়েও স্পষ্ট উত্তর দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো।
নজরদারি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে জেলাজুড়ে অনুমোদনহীন অবৈধভাবে গড়ে উঠা রিসোর্টের সংখ্যা বর্তমানে দুই শতাধিক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষত শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলায় গত কয়েক বছরে পাহাড়-টিলা কেটে, বন উজাড় করে এবং কৃষিজমিতে গড়ে উঠছে এসব রিসোর্ট ও কটেজ। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটন ব্যবসায়ী ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, প্রকৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি অনেক স্থাপনার ভেতরের কার্যক্রমও থাকছে নজরদারির বাইরে।
২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর গ্র্যান্ড সুলতানের মতো পাঁচ তারকা মানসম্মত রিসোর্ট গড়ে উঠলেও গত তিন-চার বছরে নতুন নতুন স্থাপনা তৈরির প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, পুরো জেলায় রিসোর্টের সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক, যার মধ্যে শুধু শ্রীমঙ্গলেই রয়েছে শতাধিক এবং উপজেলার রাধানগর এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশতের ও অধিক রিসোর্ট ও কটেজ। অনেকে কয়েক শতক জমিতে দুই-তিনটি ঘর তুলে সেটিকেও ‘রিসোর্ট’ হিসেবে চালাচ্ছেন, যেগুলোতে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বা নিরাপত্তার মান নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমদ বলেন, জেলায় দুই শতাধিক রিসোর্টের মধ্যে প্রকৃত অর্থে রিসোর্ট বলা যায় এমন প্রতিষ্ঠান ১০-১২টির বেশি হবে না এবং বাকিগুলো কারা পরিচালনা করছে তা তাদের জানা নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নামসর্বস্ব এসব রিসোর্টের অনেকগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই এবং সিসিটিভি বা নৈশপ্রহরীও নেই, যা এগুলোর ভেতরের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলের একটি রিসোর্টে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর রাতারাতি নাম পরিবর্তনের খবরও পাওয়া গেছে, যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রিসোর্টগুলোর বক্তব্য জানা যায়নি।
রিসোর্ট নির্মাণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জেলার পাহাড়, টিলা ও বনাঞ্চলে, যেখানে উঁচু টিলা কেটে সমতল করা এবং গভীর বনের ভেতরে কটেজ নির্মাণের ফলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে বলেই প্রায়শই বাসা বাড়ি হাসপাতাল ও বিভিন্ন অফিসসহ লোকালয় বেষ্টিত এলাকায় খুব বেশি ডুকে পড়ছে খাবারের সন্ধানে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আসম সালেহ সোহেল বলেন, পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে গড়ে ওঠা এসব রিসোর্টের তদারকি সরকারের কোনো দপ্তর করছে না এবং পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
রিসোর্টগুলোর অনুমোদন ও পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে বলে জানা গেছে। মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, ২০টির বেশি কক্ষবিশিষ্ট মাত্র ৬০টি রিসোর্ট তাদের কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে এবং বাকি শতাধিক রিসোর্ট কার অনুমোদনে চলছে তা তাদের জানা নেই। কিন্তু এসবের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তালিকা থাকলে ও লোকবলের অভাবে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান জানান, রিসোর্ট নির্মাণের জন্য একটি নীতিমালা প্রয়োজন এবং ইতিমধ্যে একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, তারা মূলত তিন ও পাঁচ তারকা মানের হোটেল-রিসোর্ট তদারকি করেন এবং ছোট রিসোর্টগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছে নেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ অসংলগ্ন ও সামাজিক বহির্ভূত কর্মকাণ্ড এসব রিসোর্ট গুলোতে অনৈতিক কাজ হচ্ছে জানার পর ও প্রশাসন কোন উদ্যোগ করেন না।

সম্পর্কিত সংবাদ