অপরাধ ও দুর্ণীতি

মিঠামইনে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ২; ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা

আটক দুই ব্যক্তিসহ স্থানীয় অনুমোদিত এক সার ডিলার ও তার সহযোগীকে আসামি করে মিঠামইন থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।

⎙ প্রিন্ট
মিঠামইনে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ২; ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা
মিঠামইনে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ, আটক ২; ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা
⌖ মিঠামইন
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের একমাত্র আশা-ভরসা আর কষ্টার্জিত ফসলের প্রাণশক্তি রক্ষায় সরকারের দেওয়া ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার যখন মেঠোপথ পেরিয়ে কালোবাজারের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই সেখানে হানা দিয়েছে পুলিশ। কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত মিঠামইন উপজেলায় কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি ভর্তুকিযুক্ত ইউরিয়া সার নিয়মবহির্ভূতভাবে সরিয়ে নেওয়া ও পাচারের চেষ্টার অভিযোগে দুইজনকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার ও সার পরিবহনে ব্যবহৃত দুটি ট্রলি গাড়ি জব্দ করে পুলিশ।​মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ) দুপুরে মিঠামইনে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় আটক দুই ব্যক্তিসহ স্থানীয় অনুমোদিত এক সার ডিলার ও তার সহযোগীকে আসামি করে মিঠামইন থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে।​পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কৃষকদের উৎপাদন খরচ সহনীয় রাখতে এবং হাওরের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতি বছর বিপুল অংকের ভর্তুকি দিয়ে ইউরিয়া সার সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী ও ডিলার সরকারের এই জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে সার কালোবাজারে পাচার করে আসছিল। ​এমনই এক সুনির্দিষ্ট ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত সোমবার সকাল ১১টার দিকে মিঠামইন উপজেলার কাটখাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. গাফফারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল উপজেলার কাটখাল ইউনিয়ন এলাকায় ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে। ​অভিযান চলাকালে কাটখাল এলাকার একটি রাস্তা দিয়ে দুটি ট্রলি গাড়িতে করে অবৈধভাবে সার অন্যত্র স্থানান্তরের সময় হাতেনাতে ধরে ফেলা হয় পাচারকারী শাহিন মিয়া ও জহির মিয়াকে। পরবর্তীতে ট্রলি দুটিতে তল্লাশি চালিয়ে ১১১ বস্তা ভর্তি সরকারি ইউরিয়া সার উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে সার পরিবহনে নিয়োজিত দুটি ট্রলি গাড়িও আটক করে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।​​পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, কৃষকদের জন্য নির্ধারিত এসব ভর্তুকিযুক্ত সার অনুমোদিত বিতরণ ব্যবস্থার বাইরে গোপনে সরিয়ে নিয়ে কালোবাজারে উচ্চমূল্যে বিক্রির চেষ্টা করা হচ্ছিল। ​এই জঘন্য কালোবাজারি ও পাচার চেষ্টার অপরাধে আটক শাহিন মিয়া ও জহির মিয়াকে প্রধান আসামি করার পাশাপাশি অনুমোদিত সার ডিলার মুস্তাফিজুল ইসলাম রতন এবং লিটন নামে আরও এক সহযোগীকে আসামি করে মঙ্গলবার দুপুরে মিঠামইন থানায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ডিলার মুস্তাফিজুল ইসলাম রতন সরকারি নিয়মকানুন অমান্য করে নিজ সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই সার কালোবাজারে সরিয়ে দিচ্ছিলেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।​​হাওরের বিশাল বিস্তীর্ণ মাঠে যখন বোরো বা অন্যান্য ফসলের চারা রোপণের ধুম পড়ে, তখন এক বস্তা সারের জন্য ডিলারের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও সার পান না সাধারণ কৃষকরা। মিঠামইনের ভুক্তভোগী সাধারণ কৃষকরা তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান, সার সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। প্রয়োজনের চরম মুহূর্তে ন্যায্যমূল্যে সার না পেয়ে তাদের খোলা বাজার থেকে চড়াদামে সার কিনতে হয়, যা তাদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।​এক স্থানীয় কৃষক আকুল কণ্ঠে বলেন, "সরকার তো আমাগো লাগি সার পাঠায়, কিন্তু হেই সার আমাগো পর্যন্ত পৌঁছায় না। দালালে আর ডিলারে মিল্লা রাইতের আঁধারে বেইচা দেয়। সার না পাইলে জমি চাষ করাম কেমনে? পুলিশ যদি এই চুরি বন্ধ না করে, তবে আমাগো না খাইয়া মরন ছাড়া উপায় নাই।"​কৃষকদের দাবি, শুধু দু-এক বস্তা সার আটক করলেই সমাধান হবে না; সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি বস্তা সার যেন কোনোভাবেই কালোবাজারে না যেতে পারে, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কঠোর থেকে কঠোরতর নজরদারি ও নিয়মিত তদারকি জোরদার করতে হবে।​মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, কৃষকের পেট কেটে কিংবা সরকারি সহায়তার সার চুরি করে যারা নিজেদের পকেট ভারী করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ​ওসি মনোয়ার মোহাম্মদ বলেন, "কৃষকদের জন্য সরকার নির্ধারিত ভর্তুকিযুক্ত সার পাচারের বিরুদ্ধে আমাদের এই সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত থাকবে। এ ধরনের দেশবিরোধী ও কৃষকবিরোধী ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।" ​তিনি আরও যোগ করেন, "অভিযানে উদ্ধার করা ১১১ বস্তা ইউরিয়া সার এবং সার বহনে ব্যবহৃত দুটি ট্রলি গাড়ি বর্তমানে মিঠামইন থানা পুলিশের হেফাজতে নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের পেছনে আর যারাই জড়িত থাকুক না কেন—চাই সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন—তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।"​কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং মেহনতী কৃষকের ঘাম ঝরানো হাসিকে ধরে রাখতে মিঠামইনে পুলিশের এই সময়োপযোগী অভিযান সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এখন সচেতন মহল অপেক্ষা করছে—অনুমোদিত ডিলারসহ মূল অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ কৃষকের হক ছিনিয়ে নেওয়ার সাহস না পায়।

সম্পর্কিত সংবাদ