অপরাধ ও দুর্ণীতি

কিশোরগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, জিম্মি নরসুন্দাপাড়ের মানুষ

কিশোরগঞ্জ শহরের ভৌগোলিক অবস্থান ও নরসুন্দা নদীর সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পসংলগ্ন ওয়াকওয়েগুলোকে অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে এরা।

⎙ প্রিন্ট
কিশোরগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, জিম্মি নরসুন্দাপাড়ের মানুষ
প্রতীকী ছবি।
⌖ কিশোরগঞ্জ সদর

ঐতিহাসিক রূপসী নরসুন্দা নদীর কলকল ধ্বনি কিংবা ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ও সংস্কৃতির লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ জেলা শহর। কিন্তু প্রাচ্যের এই প্রাচীন ও শান্ত জনপদটি এখন রূপ নিয়েছে এক আতঙ্কের উপত্যকায়। সূর্যাস্তের পর তো বটেই, ভরদুপুরেও শহরের অলিগলি, নদীর পাড়, এমন কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশেও তাণ্ডব চালাচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের এক দল অপ্রতিরোধ্য সন্ত্রাসী। প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্রের মহড়া, মোড়ে মোড়ে আড্ডা, অস্ত্রের মুখে ছিনতাই, নারী শিক্ষার্থীদের চরম উত্ত্যক্তকরণ ও প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে জখম করার মতো ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

​গত কয়েক বছরে পুরো জেলা শহর যেন একেকটি ক্ষুদ্র অপরাধচক্রে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সচেতন মহল, শিক্ষক, অভিভাবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে কিশোরগঞ্জের কিশোর গ্যাং কালচারের নেপথ্য চিত্র, মূল হোতা এবং এর ভয়াবহ সামাজিক ক্ষত নিয়ে পরিচালিত  বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ফুটে উঠেছে ভয়াবহ চিত্র।

​কিশোরগঞ্জ শহরে ইদানীং যেকোনো ছোটখাটো বাকবিতণ্ডা মুহূর্তেই রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। কিশোর সন্ত্রাসীরা এখন কেবল দল বেঁধে চলাফেরাই করছে না, বরং তারা নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা ভাগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কোমর থেকে টেনে বের করছে রামদা, চাপাতি, সামুরাই, চাইনিজ কুড়াল ও চকচকে দেশীয় অস্ত্র। তাদের হামলায় শহরের বহু তরুণ ও যুবক হাত-পায়ের রগ কেটে কিংবা মাথার মারাত্মক আঘাতে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করার ঝুঁকিতে পড়েছেন। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে ভেতরের অলিগলিতে রিকশা কিংবা অটোরিকশা থামিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া নিত্যদিনের ঘটনা। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে আসা পথচারী বা যাত্রীদের "বড় ভাই" সম্মোধনে ঘিরে ধরে ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। তাছাড়া শহরের বিশেষ বিশেষ এলাকার ছাত্রী ও নারী পথচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিশেষ করে সকালে ও বিকেলে কোচিংয়ের ছুটির সময় কিশোর গ্যাংয়ের বখাটেরা মোটরসাইকেল নিয়ে হর্ন বাজিয়ে মহড়া দেয় এবং মেয়েদের উদ্দেশ্য করে অশালীন মন্তব্য করে। কোনো অভিভাবক বা পথচারী প্রতিবাদ করলে তার ওপর নেমে আসে সংঘবদ্ধ হামলা।

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ শহরের ভৌগোলিক অবস্থান ও নরসুন্দা নদীর সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পসংলগ্ন ওয়াকওয়েগুলোকে অপরাধের অভয়ারণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে এরা। মূলত এলাকাভিত্তিক বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট শহরের প্রতিটি কোণ দখল করে রেখেছে।

​বত্রিশ বাসস্ট্যান্ড ও কানিকাটা এলাকায় সক্রিয় রয়েছে একটি গ্রুপ। একক নেতৃত্বে পরিচালিত এই গ্যাংটি প্রধানত বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি, মারামারি, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হুমকি দেওয়া এবং নতুনদের গ্যাংয়ে ভেড়ানোর মতো অপকর্মে লিপ্ত।

​অন্যদিকে গুরুদয়াল কলেজ, গৌরাঙ্গ বাজার, ওয়াকওয়ে ও রথখোলা এলাকায় অবস্থান কয়েকজনের মিলিত একটি সিন্ডিকেটের। এই সিন্ডিকেটটি মূলত পর্যটন ও আড্ডার স্থানগুলোতে আসা মানুষকে ভয় দেখিয়ে ছিনতাই, মারধর, কোপানো ও প্রকাশ্যে চাপাতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে।

​এছাড়া খরমপট্টি, সরকারি পুকুরপাড় ও নগুয়া এলাকায় ছোট ছোট বিভিন্ন দল সক্রিয়, যাদের মূল কাজ কোচিং সেন্টারের সামনে ইভটিজিং, ছাত্রীদের পিছু নেওয়া, বখাটেপনা ও ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদকারীদের ওপর আক্রমণ করা।

​একইভাবে গাইটাল-শ্রীনগর, রাকুয়াইল ও হয়বতনগর এলাকায় একাধিক বিচ্ছিন্ন উপ-দল কাজ করছে, যারা মাদক সেবন ও বিক্রির স্পট পাহারা দেওয়া, চুরি এবং নদীর পাড়ে ছিনতাইয়ের কাজে লিপ্ত।

​স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় এসব দলের নেতৃত্ব আলাদা হলেও অপকর্মের স্বার্থে বা প্রতিপক্ষকে সাইজ করতে এরা এক নিমেষেই একে অপরের সঙ্গে জোট বাঁধে।

​কিশোর গ্যাংয়ের বাড়বাড়ন্তে কিশোরগঞ্জের অভিভাবক মহলে তৈরি হয়েছে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক। সন্তানদের স্কুলে বা কোচিংয়ে পাঠিয়ে দিয়ে অনেক মা-বাবা যতক্ষণ পর্যন্ত তারা ঘরে না ফিরছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দুশ্চিন্তায় প্রহর গুনতে থাকেন। একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আফসোসের সঙ্গে বলেন, “আগে আমরা সন্তানদের পড়াশোনা আর ফলাফলের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারতাম না, আর এখন তারা অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরবে কি না—এই আতঙ্কে বুক কাঁপে। চোখের সামনে বখাটেরা অপকর্ম করলেও প্রতিবাদ করতে পারি না, কারণ প্রতিবাদ করা মানেই নিজের পরিবারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।”

​ব্যবসায়ীরা জানান, সন্ধ্যার পর দোকানপাট খোলা রাখা কিংবা কাস্টমারদের কেনাকাটা করার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। শহরের পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা নরসুন্দা নদীপাড়ের ওয়াকওয়েতে এখন সাধারণ বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের মানুষ হাঁটাচলা করতে ভয় পায়, কারণ সেখানে মাদকসেবী ও কিশোর সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ।

​অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক চিত্র। কিশোর বয়সটিতে হিরোইজম বা ‘বড় ভাই’ হওয়ার একটা তীব্র আকর্ষণ থাকে। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কয়েকজন তরুণের আচরণ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গ্যাং কালচারের পেছনে কাজ করছে প্রধানত কয়েকটি মনস্তাত্ত্বিক ও পারিপার্শ্বিক কারণ। উঠতি বয়সী কিশোরদের বুঝানো হয়, কোনো গ্যাংয়ের ছায়াতলে না থাকলে অন্য দল তাদের ওপর অত্যাচার করবে। ফলে ‘আত্মরক্ষা’ এবং ‘বন্ধু রক্ষা’র নামে তারা ধারালো অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। ফেসবুক, টিকটক এবং লাইকি অ্যাপে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হিন্দি সিনেমা ও গ্যাংস্টার সিরিজের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে নিজেদের ছবি ও ধারালো অস্ত্রের ভিডিও আপলোড করে। লাইক, কমেন্ট ও ভিউ পাওয়ার এই সস্তা জনপ্রিয়তা তাদের আরও বড় অপরাধে উৎসাহিত করে। তাছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের অধিকাংশ সদস্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মাদকের সঙ্গে জড়িত। ইয়াবা, ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও গাঁজার টাকা জোগাড় করতেই এরা প্রধানত ছিনতাই ও চাঁদাবাজির পথ বেছে নেয়। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে কিশোররা স্মার্টফোনে কী দেখছে বা সন্ধ্যার পর কোথায় কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—পিতামাতার সেই খোঁজ না রাখা এই অপরাধপ্রবণতার প্রধান অনুঘটক।

​কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যাটি এখন আর কেবল পুলিশি ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি গভীর সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। অভিভাবকরা এখন বৈষয়িক ব্যস্ততা আর অর্থ উপার্জনের পেছনে এতটাই ছুটছেন যে, সন্তানদের মানসিক গঠন ও তাদের সঙ্গীদের বিষয়ে খেয়াল রাখার সময় পান না। অনেক নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তান হঠাৎ করে দামি মোবাইল বা বাইক নিয়ে ঘরে ফিরলেও মা-বাবা তার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। কিশোরগঞ্জে একসময় নাট্যচর্চা, ফুটবল ও ক্রিকেটের নিয়মিত টুর্নামেন্ট, খেলাধুলা ও তরুণদের লাইব্রেরিমুখী করার সামাজিক আন্দোলন ছিল। বর্তমানে খেলাধুলার মাঠের অভাব এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়ায় তরুণদের উদ্বৃত্ত শক্তি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে চালিত হচ্ছে। এছাড়া অনলাইন গেমস, ভায়োলেন্ট মুভি ও পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা কিশোরদের মন থেকে দয়া, মায়া ও মানবিক বোধ কেড়ে নিচ্ছে। ফলে কাউকে চাপাতি দিয়ে কোপাতেও তাদের বুক কাঁপে না।

​যদিও স্থানীয় থানা পুলিশ ও জেলা পুলিশ প্রশাসন মাঝেমধ্যেই বিশেষ অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করছে, কিন্তু কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে তারা আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে।

​জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির ও সচেতন সমাজের দাবি, সমস্যাটির স্থায়ী উপশমে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যারা কিশোরদের হাতে টাকা, মাদক ও অস্ত্র তুলে দিচ্ছে এবং অপরাধের পর তাদের আইনি বা সামাজিক সুরক্ষার ছাতা মেলে ধরছে—সেই মূল কারিগরদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। কিশোর গ্যাংয়ের রুট লেভেলে ভাঙন ধরাতে হলে শহরে মাদকের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া শুধু জেলে পুরেই কিশোরদের সুপথে আনা সম্ভব নয়। তাদের জন্য সংশোধন কেন্দ্র, কাউন্সেলিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কিশোরদের এনগেজমেন্ট বাড়াতে প্রতিটি মহল্লায় স্পোর্টস ক্লাব ও সামাজিক ক্লাব পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এছাড়া স্কুল-কলেজ ও কোচিং সেন্টারগুলোকে নিজস্ব নিরাপত্তা ও সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনতে হবে। বখাটেদের উপস্থিতি দেখামাত্র পুলিশকে অবহিত করার জন্য একটি দ্রুত সাড়াদানকারী বা হটলাইন টিম গঠন করা প্রয়োজন।

​কিশোরগঞ্জকে ঐতিহ্যগতভাবেই একটি শান্ত, ধার্মিক ও শিক্ষানুরাগী জেলা হিসেবে চেনে পুরো দেশ। তবে আজ কিশোর গ্যাংয়ের কালো ছায়া সেই ঐতিহ্যকে ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে চলবে না; শিক্ষক, অভিভাবক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজ ও তরুণ সমাজকে এক হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কিশোরদের হাত থেকে চাপাতি ও রামদা কেড়ে নিয়ে তাদের হাতে বই, খেলার সরঞ্জাম ও ইতিবাচক স্বপ্নের বীজ বুনে দেওয়াই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শহরের শান্তিকামী বাসিন্দাদের একটাই আকুতি—কিশোরগঞ্জ আবার ফিরে পাক তার চিরচেনা নিরাপত্তা ও শান্তির পরিবেশ।

সম্পর্কিত সংবাদ