কিশোরগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি সিন্ডিকেটের অভিনব কারসাজি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বিদ্যুৎ বিল ঢাকা এবং অনৈতিক সুবিধা নিতে সংযোগের ট্যারিফ বদলে ফেলার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকের মিটারে বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত ইউনিট জমা রেখে পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে বিল পরিশোধের ক্যাটাগরি পরিবর্তন করে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিপিডিবির ভেতরে-বাইরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলীর সরাসরি নির্দেশে ইতিমধ্যেই এ ঘটনার তদন্তে মাঠে নেমেছেন ময়মনসিংহের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল বাশার ফারুক।অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া এলাকার বিদ্যুৎ গ্রাহক মো. নাজমুল হক (গ্রাহক হিসাব নম্বর: ৯৫০৫৮৩৮৮, মিটার নম্বর: ২৫০৪৯৯)-এর ব্যবহৃত সংযোগে দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিদ্যুৎ ব্যবহারের আসল হিসাব চেপে রাখা হচ্ছিল। সংগৃহীত নথি ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসের অফিশিয়াল বিলে গ্রাহকের মিটারের বর্তমান রিডিং দেখানো হয়েছিল মাত্র ২৭,৮৯৫ ইউনিট। কিন্তু বাস্তবে ওই একই সময়ে সরেজমিনে মিটারের ডিসপ্লেতে আসল রিডিং পাওয়া যায় ৪৯,৩৮৯.৬ ইউনিট।।এর অর্থ হলো, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মিটারে ২১,৪৯৪.৬ ইউনিটের বিশাল এক বকেয়া ব্যবহারের হিসাব অফিশিয়াল কাগজের বাইরে গোপন রাখা হয়। পরবর্তীতে এই বিপুল পরিমাণ জমানো ইউনিটের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক মূল্য ঢাকা এবং অর্জিত অবৈধ সুবিধা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে এক সুদূরপ্রসারী জালিয়াতি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। গত ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এক জরুরি ‘বিল কারেকশন ফরম’-এর মাধ্যমে সংযোগটির মূল বাণিজ্যিক (Commercial) ক্যাটাগরি রাতারাতি বদলে ‘LT-D1’ (আবাসিক/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) ট্যারিফে রূপান্তর করা হয়। বাণিজ্যিক ও আবাসিক রেটের মধ্যে ব্যবধান থাকায় এই ক্যাটাগরি পরিবর্তনের মাধ্যমে এক ধাক্কায় পিডিবির বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করে ওই চক্র নিজেদের পকেট ভারী করে।স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ উঠেছে, কিশোরগঞ্জ পিডিবির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ ও সংশ্লিষ্ট মিটার রিডার নাঈমের সরাসরি যোগসাজশে এই পুরো জালিয়াতি চক্রটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিশোরগঞ্জের এই নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে স্থানীয় একটি পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল বাশার ফারুক। সংগৃহীত অডিও রেকর্ডে তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের এই অনিয়মের বিষয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল বাশার ফারুক জানান, গ্রাহকের মিটারে এত বড় পরিমাণের রিডিং গোপন ও জমিয়ে রাখার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসার সাথে সাথেই জড়িতদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ জারি করা হয়েছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন যে, মিটার রিডিং জমা রাখার দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁর মতে, “তদারকির চূড়ান্ত দায়িত্ব নির্বাহী প্রকৌশলীর। তাঁর অধীনস্থ এলাকায় কোনো গ্রাহকের সঠিক বিল হচ্ছে কি না, তা প্রতিনিয়ত তদারকি ও তদারকি করা তাঁরই প্রশাসনিক দায়িত্ব।”তাছাড়া বাণিজ্যিক লাইনকে অনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ‘LT-D1’ (আবাসিক/শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, নিয়ম অনুযায়ী কোনো মাদ্রাসা বা বৈধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলে ক্যাটাগরি পরিবর্তন হতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রে বাস্তবে ওই স্থানে ঠিক কতদিন ধরে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছিল, ভাড়া চুক্তি কবে করা হয়েছে এবং কবে কোন প্রক্রিয়ায় এই ক্যাটাগরি পরিবর্তনের নথিপত্র সই হয়েছে—তার প্রতিটি পর্যায় নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, পিডিবির প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে পাওয়া লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি নিজে সরাসরি এই তদন্তের তদারকি করছেন। অপরাধ প্রমানিত হলে কোনো ছাড় দেয়া হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।শোলাকিয়া ও আশপাশের স্থানীয় সচেতন গ্রাহকদের মতে, যেখানে সাধারণ গ্রাহকরা দু-এক মাস বিল দিতে দেরি করলে বা সামান্য রিডিং এদিক-ওদিক হলে লাইন কেটে দেয়া হয় কিংবা ভুতুড়ে বিলের খড়্গ নেমে আসে, সেখানে একটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত সংযোগে ২১ হাজার ইউনিটেরও বেশি বিদ্যুৎ গায়েব করে দেওয়া সর্ষের মধ্যেই ভূত থাকার প্রমাণ দেয়। নির্বাহী প্রকৌশলী ও মিটার রিডারের মত দায়িত্বশীল পদের কর্মকর্তাদের মদদ ছাড়া এমন দুর্নীতির মহোৎসব কোনোভাবেই সম্ভব নয়।তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল বাশার ফারুকের এ ধরনের তড়িৎ ও দৃঢ় পদক্ষেপের পর কিশোরগঞ্জ পিডিবির ভেতরে চেপে বসে থাকা জালিয়াতি সিন্ডিকেটের আসল রূপ ও ‘থলের বিড়াল’ বেরিয়ে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও বিদ্যুৎ গ্রাহকরা। তারা অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি রাজস্ব নিয়ে কেউ এমন জালিয়াতির সাহস না পায়।
কিশোরগঞ্জ পিডিবিতে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি: হাজার হাজার ইউনিট রিডিং গায়েব করে বাণিজ্যিক লাইন আবাসিক করার অভিযোগ।
বিপুল পরিমান বিদ্যুৎ বিল ঢাকা ও অনৈতিক সুবিধা নেয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।








