কিশোরগঞ্জ গণপূর্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির উৎসব, এক দিনে ২৭ টেন্ডার চুক্তি, পরদিনই বিল ভাউচার পাস।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে উন্নয়ন কাজ ও সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তের দাবি জানিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী ১৪ জন ঠিকাদার।অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয়টি ঘটে গত অর্থবছরের একদম শেষ মুহূর্তে। গত ২১ জুন কিশোরগঞ্জ মডেল মসজিদের ২৭টি কাজের জন্য ওটিএম (ওপেন টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বান করা হয়। তার ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ২২ জুন তড়িঘড়ি করে চুক্তিপত্র সম্পন্ন করা হয় এবং আশ্চর্যজনকভাবে ২৩ জুন সেই কাজগুলোর বিলের চেক ইস্যু করা হয়। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দরপত্র প্রক্রিয়া, কার্যাদেশ ও বিল পরিশোধের এই অবিশ্বাস্য গতিকে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও ভুয়া কাগজপত্রের কারসাজি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব কাজের সিংহভাগই নির্বাহী প্রকৌশলীর পছন্দের মাত্র পাঁচজন ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে।ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া নথিতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিয়ম অনুযায়ী সিংহভাগ কাজ এলটিএম (লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড) পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে অন্তত ৩৫টি কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হয়। ওটিএম পদ্ধতি করা সত্ত্বেও দরপত্রের বিজ্ঞপ্তি সঠিকভাবে প্রচার ও প্রকাশ না করে অত্যন্ত সীমিত সংখ্যক ঠিকাদারকে গোপনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে দরপত্র প্রক্রিয়ায় কোনো প্রতিযোগিতা হয়নি এবং সরকার বিপুল পরিমাণের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও একইভাবে অন্যায্য উপায়ে এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট সুবিধাপ্রাপ্ত ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তারা।সরকারি কাজের বিল বকেয়া আটকে রেখে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও অত্যন্ত প্রকট। মডেল মসজিদ, মিঠামইন শিল্পকলা একাডেমি, আইনজীবী ভবন ও বিভিন্ন থানা ভবনের উন্নয়ন কাজ নিয়ে গঠিত লিখিত অভিযোগে জানানো হয়, এসব প্রকল্পের বিপরীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শেষ না হতেই কিংবা কাজ না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মিঠামইন শিল্পকলা একাডেমির বাউন্ডারি ওয়াল ও পাইলিংয়ের ক্ষেত্রে ভ্যারিয়েশন অনুমোদনের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ নয়ছয় করা হয়েছে।অভিযোগে আরও জানানো হয়, নির্বাহী প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবন সংস্কার কাজ এবং ঠিকাদারদের সিকিউরিটি জামানতের (৫ শতাংশ টাকা) সুরক্ষিত তহবিল ব্যবস্থাপনায় ঘোর অনিয়ম করা হয়েছে। গত ঈদুল আজহার ঠিক আগে ঢাকার একজন ঠিকাদারের নামে ৯টি চেকের মাধ্যমে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে ঠিকাদাররা সরাসরি দাবি করেছেন। দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর নিজ নামে ও বেনামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে নাটোরে দুটি বহুতল বাড়ি নির্মাণ এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি ফ্ল্যাট বা ভবন নির্মাণের তথ্য অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা, আয়ের উৎস এবং সরকারি অর্থের সঙ্গে কোনো অবৈধ সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়াও সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকা, ব্যক্তি ও পারিবারিক কাজে সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ ব্যবহার এবং ছুটি না নিয়ে নিয়মিত ঢাকা অবস্থান করার মতো প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগও যুক্ত রয়েছে। এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে অফিসের বায়োমেট্রিক উপস্থিতি নথি, গাড়ির লগবুক এবং আর্থিক রেকর্ড পর্যালোচনার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।কিশোরগঞ্জ গণপূর্তের অধীনস্থ পাট গবেষণা কেন্দ্রে অবস্থিত সরকারি কোয়ার্টারগুলোর সংস্কার না করায় চরম অবহেলার চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোয়ার্টারে বসবাসরত ছয়টি পরিবার বাধ্য হয়ে বাসাবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ওই সরকারি ভবন ও আশপাশের প্রায় কোটি টাকার জমি অবৈধ দখলের চরম ঝুঁকিতে পড়েছে বলে স্থানীয়রা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।এসব গুরুতোর ও বিস্ফোরক অভিযোগের বিষয়ে কিশোরগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকল দাবি ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সাথে নিজের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কিছু সুবিধাবঞ্চিত ঠিকাদার নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করতে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, অতীতেও দপ্তর থেকে এসব বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত করা হয়েছে এবং সেখানে কোনো দুর্নীতির সত্যতা মেলেনি।তবে শুধু মৌখিক অস্বীকারে আশ্বস্ত হতে পারছেন না স্থানীয় সচেতন মহল ও ঠিকাদার সমাজ। কিশোরগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কাসেম বলেন, সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন করা অতি জরুরি। দরপত্রের নথি, চুক্তিপত্র, ব্যাংকিং হিসাব, বিল-ভাউচার এবং সরেজমিন কাজের গুণগত মান স্বাধীনভাবে যাচাই করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। যদি দুর্নীতির প্রমান পাওয়া যায় তবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, আর যদি অভিযোগ অমূলক প্রমাণিত হয় তবে সরকারি কর্মকর্তার ভাবমূর্তি রক্ষায় বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। বর্তমানে স্থানীয় ঠিকাদার ও সচেতন মহল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।








