চা দোকানে সাধারণ মানুষের চোখের সামনে তল্লাশি করে পাওয়া গেল না কিছুই। অথচ থানায় নেওয়ার পরই রাতারাতি ‘উদ্ধার’ হয়ে গেল ১৯৮ পিস ইয়াবা! দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ইউপি সদস্য জাকিরুল ইসলামকে (৩৯) গ্রেপ্তারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে উঠেছে এমন চোখ কপালে তোলার মতো গুরুতর সাজানো নাটক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ।ঘটনাটি ঘিরে পুরো উপজেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের এমন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঘোড়াঘাট থানা-পুলিশের ভাষ্যমতে, বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে বুলাকীপুর ইউনিয়নের কুলানন্দপুর নাপিতপাড়া বাজার এলাকায় মাদকের বড় চালান হাতবদলের সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রাজা মিয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে ২-৩ জন সটকে পড়লেও বুলাকীপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জাকিরুল ইসলামকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তল্লাশি চালিয়ে তাঁর কোমর থেকে ১৯৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ হাসান জানান, "জাকিরুল স্বীকার করেছেন যে বিক্রির উদ্দেশ্যেই ইয়াবাগুলো রাখা হয়েছিল। তাঁর ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।"
তল্লাশিতে মিলল না কিছুই, অতপর থানায় ‘মাদক আবিষ্কার’
পুলিশের এই সাজানো গল্পের আড়ালে ভিন্ন এক সত্য তুলে ধরছেন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁদের তথ্যমতে, ঘটনার সময় জাকিরুল মেম্বার নাপিতপাড়া বাজারের একটি সাধারণ চা দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ সিভিল পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি এসে নিজেদের পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলে। আটকের কারণ জানতে চাইলে পুলিশ সদস্যরা কোনো প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উল্টো তাঁর ওপর চড়াও হন।
স্থানীয়দের সামনেই জাকিরুল মেম্বারের দেহ তল্লাশি করা হয়, কিন্তু সেখানে কোনো মাদক মেলেনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, আটকের পরই পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। আর সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় ঘটে থানায় নেওয়ার পর—যেখানে হুট করেই তাঁর কাছে ১৯৮ পিস ইয়াবা উদ্ধারের নাটক সাজানো হয়।
তথ্য গোপনের চেষ্টা? ভিডিও করায় যুবকের ফোন ছিনতাই
পুলিশি অভিযানের স্বচ্ছতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে এক প্রত্যক্ষদর্শী যুবকের ওপর আচরণের পর। আটকের বিতর্কিত দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করার সন্দেহে সোহাগ নামের এক স্থানীয় যুবকের স্মার্টফোন কেড়ে নেয় পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, যদি অভিযান সত্যি ও আইনসম্মত হয়ে থাকে, তবে সাধারণ মানুষের ভিডিও করায় পুলিশের এই ভীতি ও ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার কারণ কী?
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এমন প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ও ক্ষমতার অপব্যবহারে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল। অপরাধ দমনের নামে নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসানো এবং ভুয়া উদ্ধার নাটক বন্ধের জন্য এ ঘটনার একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন কুলানন্দপুর গ্রামবাসী।
এখন দেখার বিষয়, জনমনে ওঠা এসব গুরুতর প্রশ্নের জবাব প্রশাসন কীভাবে দেয়, নাকি প্রথাগত প্রক্রিয়াতেই ধামাচাপা পড়ে যাবে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা?
চা দোকানে আটক, থানায় উদ্ধার ইয়াবা! ঘোড়াঘাটে পুলিশি ‘নাটক ও মারধরের’ অভিযোগ








