সীমাহীন স্বপ্ন, অদম্য ইচ্ছা আর চেতনার প্রদীপ্ত আলোয় এক কিশোরের দূরদর্শী পদচারণা আজ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে করেছে গৌরবান্বিত। শিশুদের 'নোবেল' হিসেবে খ্যাত সম্মানজনক 'আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার-২০২৬'-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার উদীয়মান তরুণ সমাজকর্মী ও শিশু অধিকারকর্মী মারুফ উজ্জামান। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'কিডসরাইটস Foundation' (KidsRights) বিশ্বজুড়ে শিশু অধিকার রক্ষায় অনন্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ মনোনয়ন প্রদান করেছে। প্রান্তিক হাওরবেষ্টিত জেলার সাধারণ এক পরিবারের সন্তানের এই বিশ্বজয়ের সংবাদে পাকুন্দিয়াসহ পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে এখন আনন্দ ও গর্বের মাতম। আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়, এটি বিশ্বজুড়ে সংগ্রাম করা কোটি শিশুর অধিকার রক্ষায় তরুণদের সাহসের প্রতীক। আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি পাওয়ার খবরে পাকুন্দিয়া উপজেলার সুশীল সমাজ, শিক্ষাবিদ, স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং শিশু অধিকারকর্মীরা মারুফকে শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত করছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বইছে অভিনন্দনের জোয়ার। প্রান্তিক অঞ্চলের নানা প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে মারুফ যেভাবে শিশু সুরক্ষা, সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষা প্রসারে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন, তা রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। শৈশব থেকেই বৈষম্য ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন মারুফ উজ্জামান। নিজের চারপাশের সুবিধাবঞ্চিত, শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত ও শোষণের শিকার শিশুদের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত। আর সেই কষ্টই পরবর্তী সময়ে পরিণত হয় পরিবর্তনের শক্তিতে। স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিয়ে রোধ, ঝরে পড়া শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা, অনলাইন নিরাপত্তা প্রদান এবং শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। সহপাঠী ও তরুণদের সংগঠিত করে সচেতনতামূলক কর্মশালা, সেমিনার এবং মাঠপর্যায়ে প্রচারণায় সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন এই কিশোর। তাঁর নেতৃত্বেই গ্রামের বহু শিশু ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক ও সুরক্ষিত শৈশব।
২০০৫ সাল থেকে প্রতিবছর কিডসরাইটস ফাউন্ডেশন বিশ্বব্যাপী সেইসব অসাধারণ শিশুদের পুরস্কৃত করে থাকে, যারা নিজস্ব উদ্যোগ ও সাহসের মাধ্যমে শিশুদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজ করে। শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই এবং পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গের মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গ ইতোপূর্বে এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন বা মনোনয়ন পেয়েছেন। ২০২৬ সালের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শত শত মনোনীত প্রার্থীর মধ্য থেকে কিডসরাইটসের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি মারুফ উজ্জামানকে বেছে নিয়েছে। মারুফের এই মনোনয়ন প্রমাণ করে যে পরিবর্তন আনার জন্য বয়স কিংবা ভৌগোলিক অবস্থান কখনোই বাধা হতে পারে না।
আন্তর্জাতিক এই অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মারুফ উজ্জামান বলেন, "শিশুদের সুরক্ষায় এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের না-বলা কথাগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরার যে চেষ্টা আমি শুরু করেছিলাম, এই মনোনয়ন সেই চেষ্টার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এটি কেবল আমার একার অর্জন নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশ এবং আমার গ্রামের সেইসব শিশুদের জয়, যারা প্রতিদিন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকে। এই মর্যাদা আমার দায়িত্ববোধকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। ভবিষ্যতেও শিশু অধিকার ও বৈষম্যহীন নিরাপদ বিশ্ব গড়ার লক্ষ্যে আমার কাজ অব্যাহত রাখব।"
পাকুন্দিয়ার স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষকদের মতে, মারুফ উজ্জামানের এই বিশ্বমঞ্চে পদার্পণ দেশের হাজার হাজার তরুণ ও কিশোর-কিশোরীকে ইতিবাচক সামাজিক কাজে উৎসাহিত করবে। তাঁর এই অর্জনে স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলো গভীর আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই অর্জন কেবল একজন মারুফ উজ্জামানের একক সাফল্য নয়, এটি লাল-সবুজের বাংলাদেশের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় সমাসীন করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রত্যন্ত পাকুন্দিয়ার অদম্য এই তরুণ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিক শিশু অধিকার ও শান্তির শুভ বার্তা—এখন এটাই গোটা দেশবাসীর পরম প্রত্যাশা।
সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ।tapashmainul70@gmail.com
বিশ্বমঞ্চে কিশোরগঞ্জের গৌরব শিশু শান্তি পুরস্কারে পাকুন্দিয়ার মারুফ
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'কিডসরাইটস Foundation' (KidsRights) বিশ্বজুড়ে শিশু অধিকার রক্ষায় অনন্য ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ মনোনয়ন প্রদান করেছে।








