দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ট্যাক্স হলিডে বা কর রেয়াত সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর হার কম হোক কিংবা বেশি—সবার জন্য সমানভাবে কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর এনবিআর ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিইএ), বাংলাদেশ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রান্সফরমার্স অ্যান্ড সুইচগিয়ারস (বিএমএটিএস)সহ ১০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ট্যাক্স হলিডে ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ব্যবস্থার নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক কর কাঠামোকে দুর্বল করছে। তিনি বলেন, দেশের কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিক খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। কোনো একটি খাতে কর ছাড় দেওয়া হলে তারা দ্রুত সেই খাতে ব্যবসা স্থানান্তর করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে।
তার ভাষায়, এতে প্রকৃত বিনিয়োগ উৎসাহিত হওয়ার বদলে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় লিকেজ সৃষ্টি হয়। ফলে সরকারের আয় কমে যায়, একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, এখন সময় এসেছে কর রেয়াতনির্ভর ব্যবসা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। কোনো ব্যবসা যদি শুধুমাত্র কর ছাড় পেলেই লাভজনক হয়, তাহলে সেই ব্যবসার টেকসই ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকে। তিনি বলেন, নিয়মিত কর পরিশোধের পরও যদি কোনো খাত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় থাকে, তবে সেখানেই বিনিয়োগ হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত উৎপাদনশীলতা, বাজার সম্ভাবনা, দক্ষতা ও উদ্ভাবন; কর ছাড় নয়। দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবাইকে কর নেটের আওতায় আনতে হবে।
সভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা কর প্রশাসনের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এবং এএইচ ইলেকট্রিক কোম্পানির স্বত্বাধিকারী হারেস মোহাম্মদ অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল নিয়ে নানা জটিলতার কথা জানান।
তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হলেও পূর্বে জমা দেওয়া অনেক রিটার্ন এখনো সিস্টেমে হালনাগাদ হয়নি। ফলে করদাতারা অনলাইনে নতুন রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে জটিলতায় পড়ছেন। যাচাই-বাছাইয়ের নামে অনেক আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করদাতাদের সুবিধার জন্যই অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কর প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি জানান, পূর্বে জমা দেওয়া ম্যানুয়াল রিটার্ন নিজ উদ্যোগে অনলাইন সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা মার্চের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, কোথায় কত রিটার্ন ঝুলে আছে, কেন আটকে আছে—তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করতে হবে। পরে সংশ্লিষ্টদের ডেকে দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
৩১ মার্চের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও যেসব রিটার্ন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলোর কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে কোনো গাফিলতি, অনিয়ম বা অযৌক্তিক বিলম্ব পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান করদাতাদের উদ্দেশে বলেন, সমস্যাগুলো নির্দ্বিধায় তুলে ধরতে হবে। করদাতাদের বাস্তব সমস্যার সমাধান ছাড়া কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা ভ্যাট ব্যবস্থা আরও সহজীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়ানোর দাবি জানান। আগামী বাজেটে এসব সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
#আর
বিষয় : এনবিআর

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ট্যাক্স হলিডে বা কর রেয়াত সংস্কৃতি থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসতে চায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কর হার কম হোক কিংবা বেশি—সবার জন্য সমানভাবে কর প্রদানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।
মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর এনবিআর ভবনে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিইএ), বাংলাদেশ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রান্সফরমার্স অ্যান্ড সুইচগিয়ারস (বিএমএটিএস)সহ ১০টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ট্যাক্স হলিডে ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ব্যবস্থার নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক কর কাঠামোকে দুর্বল করছে। তিনি বলেন, দেশের কিছু বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিক খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। কোনো একটি খাতে কর ছাড় দেওয়া হলে তারা দ্রুত সেই খাতে ব্যবসা স্থানান্তর করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে।
তার ভাষায়, এতে প্রকৃত বিনিয়োগ উৎসাহিত হওয়ার বদলে কর ফাঁকির সুযোগ তৈরি হয় এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় লিকেজ সৃষ্টি হয়। ফলে সরকারের আয় কমে যায়, একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
মো. আবদুর রহমান খান বলেন, এখন সময় এসেছে কর রেয়াতনির্ভর ব্যবসা সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। কোনো ব্যবসা যদি শুধুমাত্র কর ছাড় পেলেই লাভজনক হয়, তাহলে সেই ব্যবসার টেকসই ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকে। তিনি বলেন, নিয়মিত কর পরিশোধের পরও যদি কোনো খাত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় থাকে, তবে সেখানেই বিনিয়োগ হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনার প্রধান শর্ত হওয়া উচিত উৎপাদনশীলতা, বাজার সম্ভাবনা, দক্ষতা ও উদ্ভাবন; কর ছাড় নয়। দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সবাইকে কর নেটের আওতায় আনতে হবে।
সভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা কর প্রশাসনের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি এবং এএইচ ইলেকট্রিক কোম্পানির স্বত্বাধিকারী হারেস মোহাম্মদ অনলাইনে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল নিয়ে নানা জটিলতার কথা জানান।
তিনি বলেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হলেও পূর্বে জমা দেওয়া অনেক রিটার্ন এখনো সিস্টেমে হালনাগাদ হয়নি। ফলে করদাতারা অনলাইনে নতুন রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে জটিলতায় পড়ছেন। যাচাই-বাছাইয়ের নামে অনেক আবেদন দীর্ঘদিন ঝুলে থাকছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করদাতাদের সুবিধার জন্যই অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কর প্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি জানান, পূর্বে জমা দেওয়া ম্যানুয়াল রিটার্ন নিজ উদ্যোগে অনলাইন সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা মার্চের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেন, কোথায় কত রিটার্ন ঝুলে আছে, কেন আটকে আছে—তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবেদন আকারে উপস্থাপন করতে হবে। পরে সংশ্লিষ্টদের ডেকে দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
৩১ মার্চের নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও যেসব রিটার্ন এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলোর কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে কোনো গাফিলতি, অনিয়ম বা অযৌক্তিক বিলম্ব পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান করদাতাদের উদ্দেশে বলেন, সমস্যাগুলো নির্দ্বিধায় তুলে ধরতে হবে। করদাতাদের বাস্তব সমস্যার সমাধান ছাড়া কার্যকর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা ভ্যাট ব্যবস্থা আরও সহজীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনে জবাবদিহিতা বাড়ানোর দাবি জানান। আগামী বাজেটে এসব সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
#আর

আপনার মতামত লিখুন