ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

২৭ বছর পর ঘরে ফিরছেন নিখোঁজ প্রবাসী


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬

২৭ বছর পর ঘরে ফিরছেন নিখোঁজ প্রবাসী

দীর্ঘ ২৭ বছর নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরছেন শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার প্রবাসী আমির হোসেন তালুকদার। মঙ্গলবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে বাতিক এয়ারের একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার। প্রায় তিন দশক আগে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো এই ব্যক্তির দেশে ফেরা ঘিরে পরিবার ও এলাকায় তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়ায় যান আমির হোসেন। প্রবাস জীবনের শুরুতে প্রথম তিন বছর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তার। ফোন, চিঠি ও পরিচিতজনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজখবর পেতেন। তবে হঠাৎ করেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ ২৭ বছর।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার বহু জায়গায় খোঁজ নিয়েও কোনো তথ্য পায়নি। আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের সহায়তায় অনুসন্ধান চালানো হলেও কোথাও তার সন্ধান মেলেনি। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা ধরে নেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। স্ত্রী-সন্তান, স্বজনদের অপেক্ষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় অনিশ্চয়তা আর নীরব বেদনায়।

সম্প্রতি ঘটনাটি নাটকীয় মোড় নেয়। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজন বাংলাদেশি জানতে পারেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জঙ্গলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সন্দেহ হলে তারা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে ভাষা, আচরণ ও পরিচয় যাচাই করে ধারণা করা হয়, তিনি বাংলাদেশি এবং বহু বছর আগে নিখোঁজ হওয়া আমির হোসেন তালুকদার।

এরপর তাকে উদ্ধার করে পরিচয় নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস এবং দিপু নামের এক প্রবাসী। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে খবরটি। বিভিন্ন মাধ্যমে ছবি ও তথ্য প্রকাশের পর শরিয়তপুরে থাকা পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বহু বছর আগের চেহারা বদলে গেলেও চোখ-মুখ, কণ্ঠস্বর ও কিছু ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হন যে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনই। এই খবর পাওয়ার পর পরিবারের মধ্যে আনন্দ, কান্না ও বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে তাকে ট্রাভেল পাস দেয়। দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে তার ফেরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার।

স্থানীয়রা বলছেন, আমির হোসেনের ফিরে আসা শুধু একটি পরিবারের সদস্য ফিরে পাওয়া নয়, এটি বহু বছরের অপেক্ষার অবসান। যারা একসময় তাকে মৃত ভেবে নিয়েছিলেন, তাদের কাছে এটি যেন অলৌকিক প্রত্যাবর্তন।

তবে কীভাবে তিনি এত বছর জঙ্গলে কাটালেন, কেন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো, এই সময়ে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। দেশে ফেরার পর চিকিৎসা, বিশ্রাম ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পর হয়তো এসব রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।

প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা, অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি এবং বিদেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে এই ঘটনা। অনেক সময় ভাষা, কাগজপত্র, অসুস্থতা কিংবা প্রতারণার কারণে প্রবাসীরা দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকেন, কিন্তু তাদের সন্ধানে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।

আমির হোসেন তালুকদারের দেশে ফেরা তাই শুধু ব্যক্তিগত পুনর্মিলনের গল্প নয়, এটি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি উপলক্ষ।

#আর

বিষয় : প্রবাসী

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


২৭ বছর পর ঘরে ফিরছেন নিখোঁজ প্রবাসী

প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

দীর্ঘ ২৭ বছর নিখোঁজ থাকার পর অবশেষে পরিবারের কাছে ফিরছেন শরিয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার প্রবাসী আমির হোসেন তালুকদার। মঙ্গলবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে বাতিক এয়ারের একটি ফ্লাইটে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার। প্রায় তিন দশক আগে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো এই ব্যক্তির দেশে ফেরা ঘিরে পরিবার ও এলাকায় তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিবেশ।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩০ বছর আগে উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়ায় যান আমির হোসেন। প্রবাস জীবনের শুরুতে প্রথম তিন বছর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তার। ফোন, চিঠি ও পরিচিতজনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা তার খোঁজখবর পেতেন। তবে হঠাৎ করেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ ২৭ বছর।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবার বহু জায়গায় খোঁজ নিয়েও কোনো তথ্য পায়নি। আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের সহায়তায় অনুসন্ধান চালানো হলেও কোথাও তার সন্ধান মেলেনি। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা ধরে নেন, হয়তো তিনি আর বেঁচে নেই। স্ত্রী-সন্তান, স্বজনদের অপেক্ষা ধীরে ধীরে রূপ নেয় অনিশ্চয়তা আর নীরব বেদনায়।

সম্প্রতি ঘটনাটি নাটকীয় মোড় নেয়। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত কয়েকজন বাংলাদেশি জানতে পারেন, এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জঙ্গলে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সন্দেহ হলে তারা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে ভাষা, আচরণ ও পরিচয় যাচাই করে ধারণা করা হয়, তিনি বাংলাদেশি এবং বহু বছর আগে নিখোঁজ হওয়া আমির হোসেন তালুকদার।

এরপর তাকে উদ্ধার করে পরিচয় নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস এবং দিপু নামের এক প্রবাসী। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে খবরটি। বিভিন্ন মাধ্যমে ছবি ও তথ্য প্রকাশের পর শরিয়তপুরে থাকা পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বহু বছর আগের চেহারা বদলে গেলেও চোখ-মুখ, কণ্ঠস্বর ও কিছু ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিশ্চিত হন যে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বজনই। এই খবর পাওয়ার পর পরিবারের মধ্যে আনন্দ, কান্না ও বিস্ময়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

পরবর্তীতে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে তাকে ট্রাভেল পাস দেয়। দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফেরার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলে তার ফেরার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে তার।

স্থানীয়রা বলছেন, আমির হোসেনের ফিরে আসা শুধু একটি পরিবারের সদস্য ফিরে পাওয়া নয়, এটি বহু বছরের অপেক্ষার অবসান। যারা একসময় তাকে মৃত ভেবে নিয়েছিলেন, তাদের কাছে এটি যেন অলৌকিক প্রত্যাবর্তন।

তবে কীভাবে তিনি এত বছর জঙ্গলে কাটালেন, কেন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো, এই সময়ে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। দেশে ফেরার পর চিকিৎসা, বিশ্রাম ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পর হয়তো এসব রহস্য উন্মোচিত হতে পারে।

প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা, অভিবাসী শ্রমিকদের ঝুঁকি এবং বিদেশে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে এই ঘটনা। অনেক সময় ভাষা, কাগজপত্র, অসুস্থতা কিংবা প্রতারণার কারণে প্রবাসীরা দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকেন, কিন্তু তাদের সন্ধানে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায় না।

আমির হোসেন তালুকদারের দেশে ফেরা তাই শুধু ব্যক্তিগত পুনর্মিলনের গল্প নয়, এটি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে নতুন করে ভাবারও একটি উপলক্ষ।

#আর


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ