রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে অনুপ্রবেশ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ইউক্রেনীয় সেনাসদস্যকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে রাশিয়ার একটি সামরিক আদালত। রুশ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এ রায় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবন্দি ইউক্রেনীয় সেনাদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার অংশ।
রোববার রাশিয়ার দ্বিতীয় পশ্চিম জেলা সামরিক আদালতের প্রেস সার্ভিস জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের নাম আন্দ্রি হ্রিনচিশিন। তার বয়স ৪৬ বছর। তিনি ইউক্রেনের ২২তম স্বতন্ত্র যান্ত্রিক ব্রিগেডের সদস্য বলে দাবি করেছে মস্কো। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, তাকে প্রথম পাঁচ বছর কারাগারে এবং বাকি সময় উচ্চ-নিরাপত্তার সংশোধনাগারে কাটাতে হবে।
রুশ তদন্ত সংস্থার দাবি, আন্দ্রি হ্রিনচিশিন একটি সংগঠিত দলের অংশ হিসেবে কুর্স্ক অঞ্চলে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি একে-৭৪ রাইফেল ও গ্রেনেড নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। পরে সুজা জেলার গুয়েভো গ্রামে সশস্ত্র অবরোধ ও অবৈধ দখল অভিযানে অংশ নেন।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল চলমান সংঘর্ষের সময় তাকে আটক করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয় এবং সামরিক আদালতে বিচার শুরু হয়।
এই মামলাকে বিশ্লেষকরা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। কারণ, ২০২৪ সালের আগস্টে ইউক্রেনীয় বাহিনী কুর্স্ক ওব্লাস্টে সীমান্ত-পার অভিযান চালায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়। ওই সময় ইউক্রেনীয় সেনারা রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রায় ১,৩০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ইউক্রেনে মোতায়েন রুশ সেনাদের অন্য ফ্রন্টে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা এবং রাশিয়ার সীমান্ত নিরাপত্তায় চাপ সৃষ্টি করা। যদিও মস্কো বরাবরই এ ধরনের অনুপ্রবেশকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পরবর্তীতে রাশিয়া বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অভিযানে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ১২ হাজার সেনা সহায়তা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে রুশ বাহিনী শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় সেনাদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয় বলে দাবি করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধবন্দিদের বিচার নিয়ে আগেও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে আটক সেনাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ মামলা চালানো হলে জেনেভা কনভেনশনের প্রশ্ন সামনে আসে। তবে রাশিয়া বলছে, সীমান্ত অতিক্রম করে বেসামরিক এলাকায় হামলা বা দখলচেষ্টা যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে না।
অন্যদিকে ইউক্রেন এ ধরনের বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। কিয়েভের দাবি, আটক সেনাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবেই এসব মামলা পরিচালিত হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দি সেনা, সীমান্ত হামলা এবং পাল্টা অভিযানের ঘটনা বাড়ছে। কুর্স্ক অঞ্চলের এই রায় দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি আদালত, প্রচারযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক চাপ এখন এই সংঘাতের নতুন মাত্রা হয়ে উঠেছে। আন্দ্রি হ্রিনচিশিনের দণ্ডাদেশ সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।
#আর
বিষয় : ইউক্রেন

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬
রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে অনুপ্রবেশ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ইউক্রেনীয় সেনাসদস্যকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে রাশিয়ার একটি সামরিক আদালত। রুশ কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এ রায় ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবন্দি ইউক্রেনীয় সেনাদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার প্রক্রিয়ার অংশ।
রোববার রাশিয়ার দ্বিতীয় পশ্চিম জেলা সামরিক আদালতের প্রেস সার্ভিস জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের নাম আন্দ্রি হ্রিনচিশিন। তার বয়স ৪৬ বছর। তিনি ইউক্রেনের ২২তম স্বতন্ত্র যান্ত্রিক ব্রিগেডের সদস্য বলে দাবি করেছে মস্কো। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, তাকে প্রথম পাঁচ বছর কারাগারে এবং বাকি সময় উচ্চ-নিরাপত্তার সংশোধনাগারে কাটাতে হবে।
রুশ তদন্ত সংস্থার দাবি, আন্দ্রি হ্রিনচিশিন একটি সংগঠিত দলের অংশ হিসেবে কুর্স্ক অঞ্চলে সশস্ত্র অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ২০২৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি একে-৭৪ রাইফেল ও গ্রেনেড নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। পরে সুজা জেলার গুয়েভো গ্রামে সশস্ত্র অবরোধ ও অবৈধ দখল অভিযানে অংশ নেন।
রাশিয়ার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল চলমান সংঘর্ষের সময় তাকে আটক করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ-সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হয় এবং সামরিক আদালতে বিচার শুরু হয়।
এই মামলাকে বিশ্লেষকরা বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তার অংশ হিসেবে দেখছেন। কারণ, ২০২৪ সালের আগস্টে ইউক্রেনীয় বাহিনী কুর্স্ক ওব্লাস্টে সীমান্ত-পার অভিযান চালায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়। ওই সময় ইউক্রেনীয় সেনারা রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রায় ১,৩০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ওই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ইউক্রেনে মোতায়েন রুশ সেনাদের অন্য ফ্রন্টে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা এবং রাশিয়ার সীমান্ত নিরাপত্তায় চাপ সৃষ্টি করা। যদিও মস্কো বরাবরই এ ধরনের অনুপ্রবেশকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পরবর্তীতে রাশিয়া বড় ধরনের পাল্টা অভিযান শুরু করে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ অভিযানে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ১২ হাজার সেনা সহায়তা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে রুশ বাহিনী শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনীয় সেনাদের ওই এলাকা থেকে সরিয়ে দেয় বলে দাবি করা হয়।
মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধবন্দিদের বিচার নিয়ে আগেও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে আটক সেনাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ মামলা চালানো হলে জেনেভা কনভেনশনের প্রশ্ন সামনে আসে। তবে রাশিয়া বলছে, সীমান্ত অতিক্রম করে বেসামরিক এলাকায় হামলা বা দখলচেষ্টা যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়মের মধ্যে পড়ে না।
অন্যদিকে ইউক্রেন এ ধরনের বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। কিয়েভের দাবি, আটক সেনাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হিসেবেই এসব মামলা পরিচালিত হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দি সেনা, সীমান্ত হামলা এবং পাল্টা অভিযানের ঘটনা বাড়ছে। কুর্স্ক অঞ্চলের এই রায় দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি আদালত, প্রচারযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক চাপ এখন এই সংঘাতের নতুন মাত্রা হয়ে উঠেছে। আন্দ্রি হ্রিনচিশিনের দণ্ডাদেশ সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ।
#আর

আপনার মতামত লিখুন