হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা আসার পরও শেষ পর্যন্ত ইরানি বাহিনীর বাধায় আটকে গেল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। শুক্রবার রাতে প্রণালিতে প্রবেশের পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নির্দেশে জাহাজটি অগ্রসর হতে না পেরে পুনরায় পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যাচ্ছে। এতে জাহাজটির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উত্তরণের তৃতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলো।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলে ইরান সরকার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ঘোষণার পরপরই পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বহু বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করে। সেই বহরের সামনের সারিতে ছিল বাংলাদেশের পতাকাবাহী ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, শুক্রবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটে জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে। পরিকল্পনা ছিল ভোররাতের মধ্যে ওমান সাগরে পৌঁছে যাওয়ার। তবে রাত সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ ইরানি নৌবাহিনী ও আইআরজিসি রেডিও বার্তার মাধ্যমে সব জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। নির্দেশনায় বলা হয়, আইআরজিসির বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।
এই আকস্মিক নির্দেশের ফলে প্রণালিতে প্রবেশ করা অন্তত ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ একসঙ্গে আটকে পড়ে। পরে নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজগুলোকে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে বলা হয়। ‘বাংলার জয়যাত্রা’ও সেই নির্দেশ অনুসরণ করে পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যাচ্ছে।
ঘটনাটিকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা পাওয়ার পর কোনো নেতিবাচক বার্তা না থাকায় জাহাজগুলো স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতায় পরিস্থিতি বদলে যায়।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম খান জানান, নির্দেশ পাওয়ার পর জাহাজটি আর অগ্রসর হতে পারেনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে বাধ্য হয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু নির্দেশ মেনে ফিরে আসতে হচ্ছে।”
‘বাংলার জয়যাত্রা’ বর্তমানে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বহন করছে, যা সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে লোড করা হয়েছিল। কার্গোর গন্তব্য দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দর। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জাহাজটি পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে। এর আগে মার্চ ও এপ্রিল মাসে দুই দফায় প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, যা ছিল তৃতীয় ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
জাহাজে বর্তমানে ৩১ জন নাবিক রয়েছেন। বিএসসি জানিয়েছে, সবাই সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে দৈনিক ভাতা ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসিক বেতনের সমপরিমাণ ‘ওয়ার অ্যালাউন্স’ প্রদান করা হচ্ছে।
জাহাজটিতে খাদ্য ও পানির পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও রেশনিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জাহাজটি পারস্য উপসাগরেই অবস্থান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হওয়ায় এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ ধরনের অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটে ঝুঁকি বাড়ায় এবং জাহাজ চলাচলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র গন্তব্য ও পরবর্তী চলাচল ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতির ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বিষয় : হরমুজ প্রণালী

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার ঘোষণা আসার পরও শেষ পর্যন্ত ইরানি বাহিনীর বাধায় আটকে গেল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। শুক্রবার রাতে প্রণালিতে প্রবেশের পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নির্দেশে জাহাজটি অগ্রসর হতে না পেরে পুনরায় পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যাচ্ছে। এতে জাহাজটির দীর্ঘ প্রতীক্ষিত উত্তরণের তৃতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলো।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলে ইরান সরকার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ঘোষণার পরপরই পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা বহু বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালির দিকে যাত্রা শুরু করে। সেই বহরের সামনের সারিতে ছিল বাংলাদেশের পতাকাবাহী ‘বাংলার জয়যাত্রা’।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, শুক্রবার রাত ১১টা ৫০ মিনিটে জাহাজটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে। পরিকল্পনা ছিল ভোররাতের মধ্যে ওমান সাগরে পৌঁছে যাওয়ার। তবে রাত সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ ইরানি নৌবাহিনী ও আইআরজিসি রেডিও বার্তার মাধ্যমে সব জাহাজের ইঞ্জিন বন্ধ করার নির্দেশ দেয়। নির্দেশনায় বলা হয়, আইআরজিসির বিশেষ অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না।
এই আকস্মিক নির্দেশের ফলে প্রণালিতে প্রবেশ করা অন্তত ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ একসঙ্গে আটকে পড়ে। পরে নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজগুলোকে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে বলা হয়। ‘বাংলার জয়যাত্রা’ও সেই নির্দেশ অনুসরণ করে পারস্য উপসাগরের দিকে ফিরে যাচ্ছে।
ঘটনাটিকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেন বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তিনি বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা পাওয়ার পর কোনো নেতিবাচক বার্তা না থাকায় জাহাজগুলো স্বাভাবিকভাবে অগ্রসর হচ্ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অনুমতি সংক্রান্ত জটিলতায় পরিস্থিতি বদলে যায়।
জাহাজটির ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম খান জানান, নির্দেশ পাওয়ার পর জাহাজটি আর অগ্রসর হতে পারেনি। নিরাপত্তাজনিত কারণে বাধ্য হয়ে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রণালি পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, কিন্তু নির্দেশ মেনে ফিরে আসতে হচ্ছে।”
‘বাংলার জয়যাত্রা’ বর্তমানে প্রায় ৩৭ হাজার টন সার বহন করছে, যা সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে লোড করা হয়েছিল। কার্গোর গন্তব্য দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন বন্দর। গত ফেব্রুয়ারি থেকে জাহাজটি পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে। এর আগে মার্চ ও এপ্রিল মাসে দুই দফায় প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, যা ছিল তৃতীয় ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
জাহাজে বর্তমানে ৩১ জন নাবিক রয়েছেন। বিএসসি জানিয়েছে, সবাই সুস্থ ও নিরাপদ আছেন। দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে নাবিকদের মনোবল ধরে রাখতে দৈনিক ভাতা ৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১২ ডলার করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসিক বেতনের সমপরিমাণ ‘ওয়ার অ্যালাউন্স’ প্রদান করা হচ্ছে।
জাহাজটিতে খাদ্য ও পানির পর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও রেশনিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জাহাজটি পারস্য উপসাগরেই অবস্থান করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হওয়ায় এখানে যেকোনো ধরনের সামরিক বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক শিপিং ব্যবস্থায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। এ ধরনের অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটে ঝুঁকি বাড়ায় এবং জাহাজ চলাচলে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র গন্তব্য ও পরবর্তী চলাচল ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতির ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আপনার মতামত লিখুন