ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

পাকা দালান থেকে ভাড়া বাসা, তারপর কবরের নীরবতা: অনলাইন জুয়া- শুধু টাকা নয়, জীবনও খায়


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

পাকা দালান থেকে ভাড়া বাসা, তারপর কবরের নীরবতা: অনলাইন জুয়া- শুধু টাকা নয়, জীবনও খায়
ছবি : সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার হাজীপাড়ার হামিদুল ইসলামকে দেখলে মনে হতো তিনি একজন সাধারণ মানুষ। রিকশা চালিয়ে সংসার টেনেছেন, কষ্ট করে পৈতৃক জায়গায় একটি পাকা দালান তুলেছিলেন। বড়লোকি জীবন না, কিন্তু সম্মান ছিল, নিজের ঠিকানা ছিল।

সমস্যা শুরু হয় চুপচাপ, চোখের সামনে নয়- মোবাইলের ভেতরে। অনলাইন জুয়োর গল্পগুলো প্রায় একইরকম। প্রথমে কৌতূহল, তারপর ছোটখাটো জেতা, ধীরে ধীরে আসক্তি। এই অ্যাপগুলো কাউকে জেতানোর জন্য নয়, আটকে রাখার জন্য তৈরি। রঙিন স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো থাকে গাণিতিক ফাঁদ।

একটি গাণিতিক সত্য থাকে- ১:৯ বা ৯:১ এর হিসেব। মাঝে মাঝে জেতানো হয়, যাতে বিশ্বাস জন্মায় ভাগ্য আপনার পক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার নিশ্চিত। মনে হয় আপনি খেলছেন, আসলে খেলানো হচ্ছে আপনাকেই।

হামিদুলের জন্য পরিস্থিতি এত কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যে নিজের পাকা দালানও বেচে দিতে হয়। ১৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে পরিবার নিয়ে উঠেন ভাড়া বাসায়। রিকশা ছেড়ে দিয়ে দিনরাত মোবাইলে ডুবে থাকা সেই মানুষটি বেঁচে ছিলেন, কিন্তু জীবনের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে।

শেষ দৃশ্যটা আরও ভেঙে দেয়। পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাওয়ার পর, নিজের ছেলে-বাবার কাছে বাইরে যাবেন বলে জানান। মনে হতে পারে, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেনার চাপ, হারানোর লজ্জা, মানুষের চোখ, নিজের কাছে হেরে যাওয়া- সব মিলিয়ে তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরার রাস্তা থাকে না।

মাগরিবের আগে খবর আসে- হামিদুল নিজের জীবন শেষ করেছেন। এরপর শুরু হয় পরিবারের ভাঙন: বৃদ্ধা মায়ের কান্না, স্ত্রীর নিঃশব্দ ভেঙে পড়া, সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অনলাইন জুয়া একজনকে মারা দেয় না, পুরো পরিবারকে শাস্তি দেয়।

আমরা কী করি? বলি, “লোকটা ভুল করেছে।” আর সব শেষ। কিন্তু এই ডিজিটাল জুয়ার বাজার কে তৈরি করেছে? কে চালায়? কেন সহজে মানুষের হাতে পৌঁছায়? এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাই, কারণ দায় নিতে হয়।

বাস্তবতা হলো, এই অ্যাপগুলো শুধু টাকা নেয় না। মানুষের বিচারবোধ, ঘুম, সম্পর্ক- সবকিছু ধ্বংস করে। একদিন খবর আসে, মানুষ নেই। আমরা দু মিনিট থামি, তারপর আবার স্ক্রল করি।

হামিদুল হয়তো পালিয়ে গেছেন। কিন্তু তার পরিবার? তারা কোথায় দাঁড়াবে?

এটা কি শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা, নাকি আমাদের নীরব সমাজের ব্যর্থতা? কতজন নিজের ঘর বেচে, জীবন শেষ করে দিলেও আমরা এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত নই।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


পাকা দালান থেকে ভাড়া বাসা, তারপর কবরের নীরবতা: অনলাইন জুয়া- শুধু টাকা নয়, জীবনও খায়

প্রকাশের তারিখ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ঠাকুরগাঁও পৌরসভার হাজীপাড়ার হামিদুল ইসলামকে দেখলে মনে হতো তিনি একজন সাধারণ মানুষ। রিকশা চালিয়ে সংসার টেনেছেন, কষ্ট করে পৈতৃক জায়গায় একটি পাকা দালান তুলেছিলেন। বড়লোকি জীবন না, কিন্তু সম্মান ছিল, নিজের ঠিকানা ছিল।

সমস্যা শুরু হয় চুপচাপ, চোখের সামনে নয়- মোবাইলের ভেতরে। অনলাইন জুয়োর গল্পগুলো প্রায় একইরকম। প্রথমে কৌতূহল, তারপর ছোটখাটো জেতা, ধীরে ধীরে আসক্তি। এই অ্যাপগুলো কাউকে জেতানোর জন্য নয়, আটকে রাখার জন্য তৈরি। রঙিন স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো থাকে গাণিতিক ফাঁদ।

একটি গাণিতিক সত্য থাকে- ১:৯ বা ৯:১ এর হিসেব। মাঝে মাঝে জেতানো হয়, যাতে বিশ্বাস জন্মায় ভাগ্য আপনার পক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার নিশ্চিত। মনে হয় আপনি খেলছেন, আসলে খেলানো হচ্ছে আপনাকেই।

হামিদুলের জন্য পরিস্থিতি এত কঠিন হয়ে দাঁড়ায় যে নিজের পাকা দালানও বেচে দিতে হয়। ১৪ লাখ টাকায় বিক্রি করে পরিবার নিয়ে উঠেন ভাড়া বাসায়। রিকশা ছেড়ে দিয়ে দিনরাত মোবাইলে ডুবে থাকা সেই মানুষটি বেঁচে ছিলেন, কিন্তু জীবনের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে।

শেষ দৃশ্যটা আরও ভেঙে দেয়। পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাওয়ার পর, নিজের ছেলে-বাবার কাছে বাইরে যাবেন বলে জানান। মনে হতে পারে, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেনার চাপ, হারানোর লজ্জা, মানুষের চোখ, নিজের কাছে হেরে যাওয়া- সব মিলিয়ে তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফেরার রাস্তা থাকে না।

মাগরিবের আগে খবর আসে- হামিদুল নিজের জীবন শেষ করেছেন। এরপর শুরু হয় পরিবারের ভাঙন: বৃদ্ধা মায়ের কান্না, স্ত্রীর নিঃশব্দ ভেঙে পড়া, সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। অনলাইন জুয়া একজনকে মারা দেয় না, পুরো পরিবারকে শাস্তি দেয়।

আমরা কী করি? বলি, “লোকটা ভুল করেছে।” আর সব শেষ। কিন্তু এই ডিজিটাল জুয়ার বাজার কে তৈরি করেছে? কে চালায়? কেন সহজে মানুষের হাতে পৌঁছায়? এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাই, কারণ দায় নিতে হয়।

বাস্তবতা হলো, এই অ্যাপগুলো শুধু টাকা নেয় না। মানুষের বিচারবোধ, ঘুম, সম্পর্ক- সবকিছু ধ্বংস করে। একদিন খবর আসে, মানুষ নেই। আমরা দু মিনিট থামি, তারপর আবার স্ক্রল করি।

হামিদুল হয়তো পালিয়ে গেছেন। কিন্তু তার পরিবার? তারা কোথায় দাঁড়াবে?

এটা কি শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা, নাকি আমাদের নীরব সমাজের ব্যর্থতা? কতজন নিজের ঘর বেচে, জীবন শেষ করে দিলেও আমরা এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে প্রস্তুত নই।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ