ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

রাজশাহীতে বৈশাখের আগেই ইলিশে ‘দাম আতঙ্ক’


আলামিন হক বিজয়
আলামিন হক বিজয়
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬

রাজশাহীতে বৈশাখের আগেই ইলিশে ‘দাম আতঙ্ক’
ছবি : সংগৃহীত

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে যখন ঘরে ঘরে প্রস্তুতির আমেজ, ঠিক সেই সময় রাজশাহীর মাছের বাজারে দেখা দিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ ইলিশ মাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাহিদার চাপ, আর সেই সুযোগে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে দাম। নববর্ষ আসতে এখনো প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও এরই মধ্যে কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই বৈশাখকে কেন্দ্র করে ইলিশের চাহিদা বাড়ে, তবে এবার আগেভাগেই দাম বাড়ার প্রবণতা চোখে পড়ছে। এতে করে উৎসবের আগে থেকেই বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ছে বলে দাবি করছেন বিক্রেতারা। তারা বলছেন, আড়তে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার, নিউমার্কেট, কোর্ট বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশের দামে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। সপ্তাহখানেক আগেও ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ যেখানে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে সেই একই মাছের দাম দাঁড়িয়েছে ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা কেজি। মাঝারি আকারের প্রায় ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়। আর বড় আকারের ইলিশ কিনতে হলে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৬০০ টাকা পর্যন্ত।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে ইলিশের উপস্থিতি থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা আগের তুলনায় কম। অনেকেই মাছের দিকে তাকিয়ে দাম জেনে ফিরে যাচ্ছেন। যারা কিনছেন, তারাও পরিমাণে কম নিচ্ছেন। ফলে বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে- দাম বেশি, কিন্তু বিক্রি কম।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ইলিশ তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকেই শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য বাজারে এলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরছেন। ক্রেতা হায়দার রহমান বলেন, “প্রতিদিনই মাছের দাম বাড়ছে। বিক্রেতারা যার কাছে যেমন পারছেন তেমন দাম নিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে এখন ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে গেছে। আমি নিজেও কিনতে এসে দাম শুনে ফিরে যাচ্ছি।”

আরেক ক্রেতা লিটন আলী বলেন, “অন্য মাছের দাম মোটামুটি সহনীয় থাকলেও ইলিশের দাম একেবারেই অস্বাভাবিক। আগে যে মাছ এক হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি ১৪০০ টাকার নিচে নেই। বৈশাখের আগে দাম বাড়বে—এটা স্বাভাবিক, কিন্তু এত আগে এমন বাড়তি দাম আগে দেখিনি।”

অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াচ্ছেন না। বাজার পরিস্থিতিই তাদের এমন অবস্থায় ফেলেছে। সাহেববাজারের বিক্রেতা নীরব আলী বলেন, “বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় মাছের দাম ১৬০০ টাকার বেশি। তবে বৈশাখের আগে দাম আরও বাড়বে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই আড়তে দাম বাড়ছে, তাই আমাদেরও বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।”

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, এবং আসন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে আগাম চাহিদা তৈরি হওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। এছাড়া অনেক ব্যবসায়ী ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মজুত করার প্রবণতাও দেখাচ্ছেন, যা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং দাম আরও বাড়াচ্ছে।

তারা আরও আশঙ্কা করছেন, যদি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে বৈশাখের ঠিক আগে দাম আরও বাড়তে পারে। এতে করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ইলিশ কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশের আয়োজন অনেক পরিবারের জন্য সীমিত বা প্রতীকী হয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ঘিরে যেখানে আনন্দের আবহ থাকার কথা, সেখানে ইলিশের ঊর্ধ্বমুখী দাম সেই আনন্দে কিছুটা ভাটা এনে দিয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


রাজশাহীতে বৈশাখের আগেই ইলিশে ‘দাম আতঙ্ক’

প্রকাশের তারিখ : ০২ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে যখন ঘরে ঘরে প্রস্তুতির আমেজ, ঠিক সেই সময় রাজশাহীর মাছের বাজারে দেখা দিয়েছে ভিন্ন এক চিত্র। উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ ইলিশ মাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চাহিদার চাপ, আর সেই সুযোগে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে দাম। নববর্ষ আসতে এখনো প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি থাকলেও এরই মধ্যে কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরই বৈশাখকে কেন্দ্র করে ইলিশের চাহিদা বাড়ে, তবে এবার আগেভাগেই দাম বাড়ার প্রবণতা চোখে পড়ছে। এতে করে উৎসবের আগে থেকেই বাজারে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি খুচরা বাজারে পড়ছে বলে দাবি করছেন বিক্রেতারা। তারা বলছেন, আড়তে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলেই খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রি ছাড়া তাদের কোনো উপায় নেই।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার, নিউমার্কেট, কোর্ট বাজারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশের দামে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে। সপ্তাহখানেক আগেও ৪০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ যেখানে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, বর্তমানে সেই একই মাছের দাম দাঁড়িয়েছে ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা কেজি। মাঝারি আকারের প্রায় ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকায়। আর বড় আকারের ইলিশ কিনতে হলে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৬০০ টাকা পর্যন্ত।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে ইলিশের উপস্থিতি থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা আগের তুলনায় কম। অনেকেই মাছের দিকে তাকিয়ে দাম জেনে ফিরে যাচ্ছেন। যারা কিনছেন, তারাও পরিমাণে কম নিচ্ছেন। ফলে বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে- দাম বেশি, কিন্তু বিক্রি কম।

ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ইলিশ তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকেই শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য বাজারে এলেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরছেন। ক্রেতা হায়দার রহমান বলেন, “প্রতিদিনই মাছের দাম বাড়ছে। বিক্রেতারা যার কাছে যেমন পারছেন তেমন দাম নিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে এখন ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে গেছে। আমি নিজেও কিনতে এসে দাম শুনে ফিরে যাচ্ছি।”

আরেক ক্রেতা লিটন আলী বলেন, “অন্য মাছের দাম মোটামুটি সহনীয় থাকলেও ইলিশের দাম একেবারেই অস্বাভাবিক। আগে যে মাছ এক হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি ১৪০০ টাকার নিচে নেই। বৈশাখের আগে দাম বাড়বে—এটা স্বাভাবিক, কিন্তু এত আগে এমন বাড়তি দাম আগে দেখিনি।”

অন্যদিকে বিক্রেতারা বলছেন, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে দাম বাড়াচ্ছেন না। বাজার পরিস্থিতিই তাদের এমন অবস্থায় ফেলেছে। সাহেববাজারের বিক্রেতা নীরব আলী বলেন, “বর্তমানে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় মাছের দাম ১৬০০ টাকার বেশি। তবে বৈশাখের আগে দাম আরও বাড়বে কিনা, সেটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই আড়তে দাম বাড়ছে, তাই আমাদেরও বাড়াতে হচ্ছে। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।”

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইলিশের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকা, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, এবং আসন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে আগাম চাহিদা তৈরি হওয়াই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ। এছাড়া অনেক ব্যবসায়ী ভবিষ্যতের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মজুত করার প্রবণতাও দেখাচ্ছেন, যা বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে এবং দাম আরও বাড়াচ্ছে।

তারা আরও আশঙ্কা করছেন, যদি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তবে বৈশাখের ঠিক আগে দাম আরও বাড়তে পারে। এতে করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ইলিশ কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে ঐতিহ্যবাহী পান্তা-ইলিশের আয়োজন অনেক পরিবারের জন্য সীমিত বা প্রতীকী হয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ঘিরে যেখানে আনন্দের আবহ থাকার কথা, সেখানে ইলিশের ঊর্ধ্বমুখী দাম সেই আনন্দে কিছুটা ভাটা এনে দিয়েছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ