ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

খামেনির নেতৃত্ব ও ইরানের ইসলামি বিপ্লব চরম চ্যালেঞ্জের মুখে


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

খামেনির নেতৃত্ব ও ইরানের ইসলামি বিপ্লব চরম চ্যালেঞ্জের মুখে

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশটির ইসলামপন্থি সরকার টিকে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে সরকার পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজ ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড রণতরীও পথে রয়েছে। অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর যুদ্ধ এড়িয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থাপনায় সীমিত হামলার কৌশল বিবেচনা করতে পারে। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ ইরানের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের শীর্ষ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছেন। ইসলামি শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক চাপের ভারসাম্য রক্ষা করা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও উত্তপ্ত। অর্থনৈতিক সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। এসব আন্দোলন দমনে সহিংস পন্থা নেওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এসব বিষয়কে সামনে এনে পারমাণবিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও ইরানের প্রভাব দুর্বল হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন, গাজায় হামাসের সংকট এবং ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের চাপে পড়ার ফলে তেহরানের আঞ্চলিক জোট কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর জুন মাসে ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও জানা গেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্ষা করতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন খামেনি। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩৬ বছর ধরে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। আইআরজিসি, বাসিজ বাহিনী এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে তিনি ক্ষমতা সুসংহত করেছেন। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এসব বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মার্কিন হুমকির জবাবে খামেনি পাল্টা কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনার দ্বিতীয় দফা শুরুর দিন তেহরানে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরান চাইলে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম।

অন্যদিকে, ইসরাইলও সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৮ ফেব্রুয়ারি সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হোম ফ্রন্ট কমান্ড ও উদ্ধার সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে তেল আবিব।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে খামেনির নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ধারাবাহিকতা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


খামেনির নেতৃত্ব ও ইরানের ইসলামি বিপ্লব চরম চ্যালেঞ্জের মুখে

প্রকাশের তারিখ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

ইরানে ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বিপ্লবের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও দেশটির ইসলামপন্থি সরকার টিকে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে খামেনির নেতৃত্ব ও ইসলামি শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ইস্যুতে সরকার পরিবর্তনের হুমকি দিয়েছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক হামলার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধ প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইতোমধ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজ ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড রণতরীও পথে রয়েছে। অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান মোতায়েনের পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর যুদ্ধ এড়িয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও স্থাপনায় সীমিত হামলার কৌশল বিবেচনা করতে পারে। এমনকি সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ ইরানের ধর্মীয় ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের শীর্ষ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অন্যতম লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ৮৬ বছর বয়সী খামেনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছেন। ইসলামি শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক চাপের ভারসাম্য রক্ষা করা তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও উত্তপ্ত। অর্থনৈতিক সংকট ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে দেশজুড়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। এসব আন্দোলন দমনে সহিংস পন্থা নেওয়ায় কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এসব বিষয়কে সামনে এনে পারমাণবিক ইস্যুর সঙ্গে যুক্ত করে সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও ইরানের প্রভাব দুর্বল হয়েছে। লেবাননের হিজবুল্লাহ, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন, গাজায় হামাসের সংকট এবং ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের চাপে পড়ার ফলে তেহরানের আঞ্চলিক জোট কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বছর জুন মাসে ইসরাইলি ও মার্কিন হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলেও জানা গেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনীতি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্ষা করতে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন খামেনি। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩৬ বছর ধরে তিনি দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। আইআরজিসি, বাসিজ বাহিনী এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে তিনি ক্ষমতা সুসংহত করেছেন। ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে এসব বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মার্কিন হুমকির জবাবে খামেনি পাল্টা কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। জেনেভায় পারমাণবিক আলোচনার দ্বিতীয় দফা শুরুর দিন তেহরানে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরান চাইলে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম।

অন্যদিকে, ইসরাইলও সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ১৮ ফেব্রুয়ারি সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি মোকাবিলায় হোম ফ্রন্ট কমান্ড ও উদ্ধার সংস্থাগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেন। ইসরাইলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে তেল আবিব।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে খামেনির নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবের ধারাবাহিকতা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ