ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কক্সবাজারের ইয়াবা সংকট: নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

কক্সবাজারের ইয়াবা সংকট: নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত ইয়াবা পাচার রোধ করতে পারাই হবে নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত পথে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশ করছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দৈনিক গড়ে এক লাখেরও বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দের পরিমাণ বাড়লেও বাজারে ইয়াবার সহজলভ্যতা কমেনি, বরং স্থানীয়ভাবে এটি সরবরাহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজারের ওই আসনের সংসদ সদস্য হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি জানেন কোথায় সমস্যার গোড়া এবং কারা এই নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রক। ফলে ব্যর্থ হলে তার দায়ভার শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যায়েও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল জানান, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলায় মোট ১৪৪টি ইয়াবা মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ১০৩ জন আসামির সাজা হয়েছে এবং ২৪টি মামলায় ৩০ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে একটি শক্তিশালী পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার স্থানীয় লিংকগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোহিঙ্গা চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, আর কক্সবাজারের একশ্রেণির মানুষ টাকার প্রলোভনে এই চক্রকে সহায়তা করছে।

পাচারকারীরা নৌপথ ও পাহাড়ি রুটের পাশাপাশি এখন কক্সবাজার রেল সংযোগ চালুর পর নতুন রেললাইনও ব্যবহার করছে বলে জানান ডিএনসির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বড় চালান শনাক্ত করতে হলে পর্যাপ্ত ড্রাগ ডিটেকশন ডগ, আধুনিক স্ক্যানার এবং কার্যকর সোর্স নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক ডগ স্কোয়াড দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।

কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি জানান, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরের প্রায় ২৮ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর্থিক সংকটে রয়েছে। বেকারত্বের কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সহজেই মাদক নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়ছে। তার মতে, একজন যুবক যদি প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বৈধভাবে আয় করতে পারেন, তাহলে তিনি ইয়াবা চক্রে যোগ দেওয়ার কথা ভাববেন না। কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারলে পাচার নেটওয়ার্ক এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়বে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কক্সবাজার সীমান্তে নতুন অপারেশনাল মডেল চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ড্রোন নজরদারি, ১২টি প্রধান সীমান্ত রুটে বিশেষ মোবাইল ইউনিট মোতায়েন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র উপস্থিতি বাড়ানো এবং সিআইডি, মাদক অধিদপ্তর ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়গুলো এখন আলোচনায় রয়েছে।

মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের পদ্ধতিতে কার্যকর ফল না আসায় এবার কৌশল বদল জরুরি। তাদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দীর্ঘদিনের এই মাদক সাম্রাজ্য ভাঙতে কতটুকু সক্ষম।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


কক্সবাজারের ইয়াবা সংকট: নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে অব্যাহত ইয়াবা পাচার রোধ করতে পারাই হবে নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

দীর্ঘদিন ধরে টেকনাফ-উখিয়া সীমান্ত পথে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইয়াবার চালান দেশে প্রবেশ করছে। গত দুই বছরে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দৈনিক গড়ে এক লাখেরও বেশি ইয়াবা বড়ি জব্দ হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জব্দের পরিমাণ বাড়লেও বাজারে ইয়াবার সহজলভ্যতা কমেনি, বরং স্থানীয়ভাবে এটি সরবরাহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কক্সবাজারের ওই আসনের সংসদ সদস্য হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি জানেন কোথায় সমস্যার গোড়া এবং কারা এই নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রক। ফলে ব্যর্থ হলে তার দায়ভার শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যায়েও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কক্সবাজারের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল জানান, ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেলায় মোট ১৪৪টি ইয়াবা মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে ১০৩ জন আসামির সাজা হয়েছে এবং ২৪টি মামলায় ৩০ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে একটি শক্তিশালী পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার স্থানীয় লিংকগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোহিঙ্গা চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, আর কক্সবাজারের একশ্রেণির মানুষ টাকার প্রলোভনে এই চক্রকে সহায়তা করছে।

পাচারকারীরা নৌপথ ও পাহাড়ি রুটের পাশাপাশি এখন কক্সবাজার রেল সংযোগ চালুর পর নতুন রেললাইনও ব্যবহার করছে বলে জানান ডিএনসির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বড় চালান শনাক্ত করতে হলে পর্যাপ্ত ড্রাগ ডিটেকশন ডগ, আধুনিক স্ক্যানার এবং কার্যকর সোর্স নেটওয়ার্ক অপরিহার্য। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক ডগ স্কোয়াড দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত।

কক্সবাজারের জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি জানান, উখিয়া, টেকনাফ ও কক্সবাজার শহরের প্রায় ২৮ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আর্থিক সংকটে রয়েছে। বেকারত্বের কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ সহজেই মাদক নেটওয়ার্কের ফাঁদে পড়ছে। তার মতে, একজন যুবক যদি প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা বৈধভাবে আয় করতে পারেন, তাহলে তিনি ইয়াবা চক্রে যোগ দেওয়ার কথা ভাববেন না। কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারলে পাচার নেটওয়ার্ক এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়বে।

প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই কক্সবাজার সীমান্তে নতুন অপারেশনাল মডেল চালুর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। ড্রোন নজরদারি, ১২টি প্রধান সীমান্ত রুটে বিশেষ মোবাইল ইউনিট মোতায়েন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র উপস্থিতি বাড়ানো এবং সিআইডি, মাদক অধিদপ্তর ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের বিষয়গুলো এখন আলোচনায় রয়েছে।

মাদকবিরোধী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের পদ্ধতিতে কার্যকর ফল না আসায় এবার কৌশল বদল জরুরি। তাদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দীর্ঘদিনের এই মাদক সাম্রাজ্য ভাঙতে কতটুকু সক্ষম।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ