রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যশোর জেলায় ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর কাছে পরাজিত হওয়ার পেছনে প্রার্থী পরিবর্তন, মনোনয়ন বিতর্ক ও দলীয় অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরে এবারের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিএনপি। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী, আর মাত্র একটি আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। যশোর সদর আসনে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জয়লাভ করেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মনোনয়ন পরিবর্তন, জনপ্রিয় নেতাদের বাদ দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৃণমূলে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা নির্বাচনের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যশোর-১ (শার্শা): মনোনয়ন পরিবর্তনে বিভক্তি
যশোর-১ আসনে শুরুতে বিএনপির সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি প্রায় দেড় মাস ধরে ভোটারদের কাছে প্রচার চালান। পরে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন এবং সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধুর সমর্থকেরা মাঠে নামেন। শেষ পর্যন্ত নুরুজ্জামান লিটনকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হলে মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও হাসান জহিরের সমর্থকেরা অভিমানী হয়ে পড়েন।
দলীয় বিভক্তির সুযোগ নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী নিজের অবস্থান শক্ত করেন এবং বিএনপির নিশ্চিত মনে করা আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায়। খায়রুজ্জামান মধু দাবি করেন, তিনি নিজ সমর্থকদের ধানের শীষে ভোট দিতে বলেছেন এবং প্রার্থীর পক্ষে ভোটও করেছেন।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা): বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব
এই আসনে বিএনপির পাঁচজন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শুরুতে সাবিরা সুলতানাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও অন্য নেতারা পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল হক বিদ্রোহী প্রার্থী হন। পরে সংবাদ সম্মেলন করে সরে দাঁড়ালেও তার নাম ব্যালটে থেকে যায়।
দলীয় নেতাদের মতে, মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা সাবিরা সুলতানার পক্ষে কার্যকরভাবে মাঠে ছিলেন না, ফলে ভোটের মাঠে দলীয় সংগঠনের ঘাটতি দেখা যায় এবং আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইউনুস আলী বলেন, মনোনয়ন নিয়ে পূর্বের দ্বন্দ্ব ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর): মনোনয়ন বাতিল ও ভোট বিভাজন
যশোর-৪ আসনে শুরুতে তৃণমূলের আস্থাভাজন নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে তার ব্যবসায়িক ঋণের বিষয়টি সামনে এনে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় এবং বিকল্প হিসেবে মতিয়ার রহমান ফারাজী মনোনয়ন পান।
ভোটের দিন দেখা যায়, টিএস আইয়ুবের সমর্থকেরা বাঘারপাড়ার সন্তান হিসেবে জামায়াত নেতা গোলাম রছুলকে ভোট দেন। ফলে ফারাজী নিজের কেন্দ্রেও বিজয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন এবং আসনটি জামায়াতের দখলে চলে যায়।
যশোর-৫ (মনিরামপুর): জোট সিদ্ধান্তে অসন্তোষ
মনিরামপুর আসনে বিএনপি প্রথমে একক প্রার্থী হিসেবে শহীদ ইকবালকে ঘোষণা করে। পরে জোট সিদ্ধান্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি আব্দুর রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে শহীদ ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তবে দলের অনেক নেতাকর্মী তার সঙ্গে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলাফলে ধানের শীষ তৃতীয় স্থানে থাকে এবং জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক বিজয়ী হন।
যশোর-৬ (কেশবপুর): শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন
কেশবপুর আসনে শুরুতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে গত ২৪ ডিসেম্বর তাকে বাদ দিয়ে আবুল হোসেন আজাদকে প্রার্থী করা হলে তৃণমূলে ক্ষোভ তৈরি হয়। যদিও শ্রাবণ দলের পক্ষে মাঠে থাকেন, তবে সংগঠিত প্রচারণার অভাবে বিজয় নিশ্চিত করা যায়নি।
দলীয় প্রতিক্রিয়া
যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, জেলার পাঁচটি আসনে পরাজয়ের কারণ জানতে দলের পক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরে মন্তব্য করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যশোরে বিএনপির পরাজয়ের পেছনে দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন বিতর্ক এবং জোট রাজনীতির সিদ্ধান্তে তৃণমূলের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা সংগঠিত ভোটব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ যশোর জেলায় ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর কাছে পরাজিত হওয়ার পেছনে প্রার্থী পরিবর্তন, মনোনয়ন বিতর্ক ও দলীয় অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বড় ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা যশোরে এবারের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে বিএনপি। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী, আর মাত্র একটি আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। যশোর সদর আসনে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জয়লাভ করেন।
দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, মনোনয়ন পরিবর্তন, জনপ্রিয় নেতাদের বাদ দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৃণমূলে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা নির্বাচনের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যশোর-১ (শার্শা): মনোনয়ন পরিবর্তনে বিভক্তি
যশোর-১ আসনে শুরুতে বিএনপির সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। তিনি প্রায় দেড় মাস ধরে ভোটারদের কাছে প্রচার চালান। পরে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন এবং সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধুর সমর্থকেরা মাঠে নামেন। শেষ পর্যন্ত নুরুজ্জামান লিটনকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হলে মফিকুল হাসান তৃপ্তি ও হাসান জহিরের সমর্থকেরা অভিমানী হয়ে পড়েন।
দলীয় বিভক্তির সুযোগ নিয়ে জামায়াতের প্রার্থী নিজের অবস্থান শক্ত করেন এবং বিএনপির নিশ্চিত মনে করা আসনটি হাতছাড়া হয়ে যায়। খায়রুজ্জামান মধু দাবি করেন, তিনি নিজ সমর্থকদের ধানের শীষে ভোট দিতে বলেছেন এবং প্রার্থীর পক্ষে ভোটও করেছেন।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা): বিদ্রোহী প্রার্থীর প্রভাব
এই আসনে বিএনপির পাঁচজন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। শুরুতে সাবিরা সুলতানাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও অন্য নেতারা পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন করেন। শেষ পর্যন্ত চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল হক বিদ্রোহী প্রার্থী হন। পরে সংবাদ সম্মেলন করে সরে দাঁড়ালেও তার নাম ব্যালটে থেকে যায়।
দলীয় নেতাদের মতে, মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা সাবিরা সুলতানার পক্ষে কার্যকরভাবে মাঠে ছিলেন না, ফলে ভোটের মাঠে দলীয় সংগঠনের ঘাটতি দেখা যায় এবং আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়। চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইউনুস আলী বলেন, মনোনয়ন নিয়ে পূর্বের দ্বন্দ্ব ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর): মনোনয়ন বাতিল ও ভোট বিভাজন
যশোর-৪ আসনে শুরুতে তৃণমূলের আস্থাভাজন নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ুবকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। পরে তার ব্যবসায়িক ঋণের বিষয়টি সামনে এনে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় এবং বিকল্প হিসেবে মতিয়ার রহমান ফারাজী মনোনয়ন পান।
ভোটের দিন দেখা যায়, টিএস আইয়ুবের সমর্থকেরা বাঘারপাড়ার সন্তান হিসেবে জামায়াত নেতা গোলাম রছুলকে ভোট দেন। ফলে ফারাজী নিজের কেন্দ্রেও বিজয় নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন এবং আসনটি জামায়াতের দখলে চলে যায়।
যশোর-৫ (মনিরামপুর): জোট সিদ্ধান্তে অসন্তোষ
মনিরামপুর আসনে বিএনপি প্রথমে একক প্রার্থী হিসেবে শহীদ ইকবালকে ঘোষণা করে। পরে জোট সিদ্ধান্তে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি আব্দুর রশিদ বিন ওয়াক্কাসকে ধানের শীষের প্রার্থী করা হয়। এতে অসন্তুষ্ট হয়ে শহীদ ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
তবে দলের অনেক নেতাকর্মী তার সঙ্গে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলাফলে ধানের শীষ তৃতীয় স্থানে থাকে এবং জামায়াতের প্রার্থী গাজী এনামুল হক বিজয়ী হন।
যশোর-৬ (কেশবপুর): শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন
কেশবপুর আসনে শুরুতে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। পরে গত ২৪ ডিসেম্বর তাকে বাদ দিয়ে আবুল হোসেন আজাদকে প্রার্থী করা হলে তৃণমূলে ক্ষোভ তৈরি হয়। যদিও শ্রাবণ দলের পক্ষে মাঠে থাকেন, তবে সংগঠিত প্রচারণার অভাবে বিজয় নিশ্চিত করা যায়নি।
দলীয় প্রতিক্রিয়া
যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, জেলার পাঁচটি আসনে পরাজয়ের কারণ জানতে দলের পক্ষ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরে মন্তব্য করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যশোরে বিএনপির পরাজয়ের পেছনে দলীয় কোন্দল, মনোনয়ন বিতর্ক এবং জোট রাজনীতির সিদ্ধান্তে তৃণমূলের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, যা সংগঠিত ভোটব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে।

আপনার মতামত লিখুন