বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যাদের নাম জড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে শ্রাবস্তি দত্ত তিন্নি অন্যতম। দুই হাজারের শুরুর দিকের নাট্যজগতে তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাভাবিক অভিনয়, সংযত আবেগ আর সাবলীল সংলাপে খুব অল্প সময়েই তিনি দর্শকের আস্থা অর্জন করেছিলেন। অথচ সেই জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছেও কেন তিনি হারিয়ে গেলেন, সেই প্রশ্ন আজও ঘুরে ফিরে আসে।
২০০২ সালে আনন্দধারা ফটোজনিক প্রতিযোগিতায় পঞ্চম রানারআপ হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথমবার গণমাধ্যমের আলোচনায় আসেন তিন্নি। শুরুটা ছিল মডেলিং দিয়ে, তবে অভিনয়ের দিকেই তার আগ্রহ দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পর্দার সামনে তার স্বাভাবিক উপস্থিতি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে শুরু করে।
২০০৪ সালে নির্মাতা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর ধারাবাহিক নাটক ৬৯-এ ‘দীপা’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি রাতারাতি পরিচিত মুখে পরিণত হন। নাটকটি তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বাস্তবধর্মী অভিনয়ের কারণে অল্প সময়েই তিনি তখনকার জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের কাতারে নিজের জায়গা করে নেন।
এরপর নিয়মিত নাটক, টেলিফিল্ম ও বিজ্ঞাপনে কাজ করতে থাকেন তিনি। টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তার উপস্থিতি ছিল। মেড ইন বাংলাদেশ, ডুব সাঁতার, সে আমার মন কেড়েছেসহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দাতেও নিজের অবস্থান জানান দেন তিন্নি। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল, দীর্ঘদিন তিনি বিনোদন জগতে শক্ত একটি অবস্থান তৈরি করবেন।
তবে ক্যারিয়ারের এই উত্থানের মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন ধীরে ধীরে তার পেশাগত পথকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। অভিনেতা হিল্লোলের সঙ্গে বিয়ে, পরবর্তীতে বিচ্ছেদ, সন্তানকে ঘিরে জটিলতা এবং পরপর সম্পর্ক ভাঙনের অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়। স্বামী হিল্লোলকে তিনি প্রবলভাবে ভালোবাসতেন। ২০১১ সালে সেই সম্পর্কের ভাঙন তার জীবনে বড় ধরনের মানসিক আঘাত হিসেবে আসে।
এই সময় থেকেই তার জীবনযাপনে অনিয়ম দেখা দিতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি মাদকাসক্তির সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন, যা তার ক্যারিয়ারকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে তাকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোর একটি।
চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে আবারও কিছু নাটকে কাজ করেন তিন্নি। তবে আগের মতো নিয়মিত থাকা সম্ভব হয়নি। শুটিংয়ে অনুপস্থিতি, অনিয়মিত কাজ এবং আচরণগত পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে নির্মাতাদের আস্থাও কমে যেতে থাকে। এর প্রভাব পড়ে তার ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতায়।
জীবনের নানা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে ২০১৭ সালের দিকে তিনি তার কন্যা ওয়ারিশাকে নিয়ে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখানেই শুরু হয় তার জীবনের সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। অভিনয়ের আলোঝলমলে জগত থেকে দূরে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনে তাকে কাজ করতে হয় কল সেন্টার, হাসপাতাল ও কসমেটিক স্টোরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
বর্তমানে শ্রাবস্তি দত্ত তিন্নি কানাডাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অভিনয় থেকে অনেক দূরে থাকলেও বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একটি সময়কে প্রতিনিধিত্বকারী অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম এখনো আলোচনায় আসে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা একজন শিল্পীর জীবন যে কতটা অনিশ্চিত মোড় নিতে পারে, তিন্নির গল্প তারই এক বাস্তব উদাহরণ।

রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যাদের নাম জড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে শ্রাবস্তি দত্ত তিন্নি অন্যতম। দুই হাজারের শুরুর দিকের নাট্যজগতে তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্বাভাবিক অভিনয়, সংযত আবেগ আর সাবলীল সংলাপে খুব অল্প সময়েই তিনি দর্শকের আস্থা অর্জন করেছিলেন। অথচ সেই জনপ্রিয়তার চূড়ায় পৌঁছেও কেন তিনি হারিয়ে গেলেন, সেই প্রশ্ন আজও ঘুরে ফিরে আসে।
২০০২ সালে আনন্দধারা ফটোজনিক প্রতিযোগিতায় পঞ্চম রানারআপ হওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথমবার গণমাধ্যমের আলোচনায় আসেন তিন্নি। শুরুটা ছিল মডেলিং দিয়ে, তবে অভিনয়ের দিকেই তার আগ্রহ দ্রুত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পর্দার সামনে তার স্বাভাবিক উপস্থিতি তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে চিনিয়ে দিতে শুরু করে।
২০০৪ সালে নির্মাতা মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর ধারাবাহিক নাটক ৬৯-এ ‘দীপা’ চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি রাতারাতি পরিচিত মুখে পরিণত হন। নাটকটি তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। বাস্তবধর্মী অভিনয়ের কারণে অল্প সময়েই তিনি তখনকার জনপ্রিয় অভিনেত্রীদের কাতারে নিজের জায়গা করে নেন।
এরপর নিয়মিত নাটক, টেলিফিল্ম ও বিজ্ঞাপনে কাজ করতে থাকেন তিনি। টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তার উপস্থিতি ছিল। মেড ইন বাংলাদেশ, ডুব সাঁতার, সে আমার মন কেড়েছেসহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দাতেও নিজের অবস্থান জানান দেন তিন্নি। সে সময় ধারণা করা হচ্ছিল, দীর্ঘদিন তিনি বিনোদন জগতে শক্ত একটি অবস্থান তৈরি করবেন।
তবে ক্যারিয়ারের এই উত্থানের মধ্যেই ব্যক্তিগত জীবনের টানাপড়েন ধীরে ধীরে তার পেশাগত পথকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। অভিনেতা হিল্লোলের সঙ্গে বিয়ে, পরবর্তীতে বিচ্ছেদ, সন্তানকে ঘিরে জটিলতা এবং পরপর সম্পর্ক ভাঙনের অভিজ্ঞতা তাকে মানসিকভাবে নাড়া দেয়। স্বামী হিল্লোলকে তিনি প্রবলভাবে ভালোবাসতেন। ২০১১ সালে সেই সম্পর্কের ভাঙন তার জীবনে বড় ধরনের মানসিক আঘাত হিসেবে আসে।
এই সময় থেকেই তার জীবনযাপনে অনিয়ম দেখা দিতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি মাদকাসক্তির সমস্যায় জড়িয়ে পড়েন, যা তার ক্যারিয়ারকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে তাকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এটি ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোর একটি।
চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে ফিরে এসে আবারও কিছু নাটকে কাজ করেন তিন্নি। তবে আগের মতো নিয়মিত থাকা সম্ভব হয়নি। শুটিংয়ে অনুপস্থিতি, অনিয়মিত কাজ এবং আচরণগত পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে নির্মাতাদের আস্থাও কমে যেতে থাকে। এর প্রভাব পড়ে তার ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতায়।
জীবনের নানা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে ২০১৭ সালের দিকে তিনি তার কন্যা ওয়ারিশাকে নিয়ে কানাডায় পাড়ি জমান। সেখানেই শুরু হয় তার জীবনের সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়। অভিনয়ের আলোঝলমলে জগত থেকে দূরে বাস্তব জীবনের প্রয়োজনে তাকে কাজ করতে হয় কল সেন্টার, হাসপাতাল ও কসমেটিক স্টোরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
বর্তমানে শ্রাবস্তি দত্ত তিন্নি কানাডাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অভিনয় থেকে অনেক দূরে থাকলেও বাংলাদেশের টেলিভিশন নাটকের একটি সময়কে প্রতিনিধিত্বকারী অভিনেত্রী হিসেবে তার নাম এখনো আলোচনায় আসে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা একজন শিল্পীর জীবন যে কতটা অনিশ্চিত মোড় নিতে পারে, তিন্নির গল্প তারই এক বাস্তব উদাহরণ।

আপনার মতামত লিখুন