ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

খনিজ সম্পদের স্বর্গরাজ্য গ্রিনল্যান্ড: কেন এই দ্বীপ দখলে মরিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প?


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

খনিজ সম্পদের স্বর্গরাজ্য গ্রিনল্যান্ড: কেন এই দ্বীপ দখলে মরিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প?


ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড—বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি এখন আর কেবল বরফে ঢাকা নির্জন ভূখণ্ড নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ‘দখল’ হুমকির পর দ্বীপটির বিপুল খনিজ ভাণ্ডার ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ।

খনিজ সম্পদের ‘সোনার খনি’

২০২৩ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার ২৫টিই গ্রিনল্যান্ডে বিদ্যমান। ট্রাম্পের নজর মূলত এই অঢেল সম্পদের ওপর।

  • বিরল মৃত্তিকা (Rare Earth): গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকার ভাণ্ডার। বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), উইন্ড টারবাইন এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির জন্য এটি অপরিহার্য। বর্তমানে এই বাজারের ওপর চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। ট্রাম্প চাইছেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীনের ওপর আমেরিকার নির্ভরশীলতা কমাতে।

  • গ্রাফাইট, তামা ও নিকেল: ইভি ব্যাটারি এবং স্টিল শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাফাইটের বিশাল মজুত রয়েছে এখানে। এছাড়া দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিমে তামা, নিকেল, প্ল্যাটিনাম ও কোবাল্টের মতো মূল্যবান ধাতুর সন্ধান পাওয়া গেছে।

  • সোনা, হীরা ও জিংক: দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে সোনার খনি এবং পশ্চিমে হীরার মজুত দ্বীপটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তর গ্রিনল্যান্ডে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনুন্নত জিংক ও সিসার মজুত রয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ট্রাম্পের হুমকি

গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের হুমকির প্রতিবাদ করায় তিনি ইউরোপের ৮টি দেশের ওপর বিপুল শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, যদিও পরে তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেনমার্ক সরকার গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করেছে।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা রয়েছে। ওয়াশিংটনের এই অতি-তৎপরতা চীন ও রাশিয়ার নজর এড়ায়নি; তারাও আর্কটিক অঞ্চলের এই ক্ষমতার লড়াই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

উত্তোলনের পথে যত বাধা

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ আহরণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং: ১. আদিবাসীদের বিরোধ: স্থানীয় ইনুইট সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের ভূমি ও প্রকৃতির ওপর বহিরাগত হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধী। ২. পরিবেশগত উদ্বেগ: পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডে তেল ও গ্যাস উত্তোলন ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ। ২০২১ সাল থেকে ইউরেনিয়াম অনুসন্ধানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ৩. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: আইনি বিরোধ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কারণে অনেক খনি প্রকল্পের কাজ এখন স্থগিত।

কৌশলগত গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ

আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন শিপিং রুট (নৌপথ) উন্মোচিত হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, উত্তর গোলার্ধের বাণিজ্য ও সামরিক আধিপত্য তার হাতেই থাকবে।

গ্রিনল্যান্ড কি কেবল বড় দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র হবে, নাকি বিশ্বজুড়ে সবুজ প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি স্থিতিশীল খনিজ সরবরাহকারী হয়ে উঠবে? উত্তরটি নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর। তবে স্পষ্ট যে, বিরল মৃত্তিকা আর গ্রাফাইটের এই যুদ্ধ আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


খনিজ সম্পদের স্বর্গরাজ্য গ্রিনল্যান্ড: কেন এই দ্বীপ দখলে মরিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প?

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image


ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড—বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপটি এখন আর কেবল বরফে ঢাকা নির্জন ভূখণ্ড নয়; বরং এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ‘দখল’ হুমকির পর দ্বীপটির বিপুল খনিজ ভাণ্ডার ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ।

খনিজ সম্পদের ‘সোনার খনি’

২০২৩ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, ইউরোপীয় কমিশন যে ৩৪টি খনিজকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার ২৫টিই গ্রিনল্যান্ডে বিদ্যমান। ট্রাম্পের নজর মূলত এই অঢেল সম্পদের ওপর।

  • বিরল মৃত্তিকা (Rare Earth): গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল মৃত্তিকার ভাণ্ডার। বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), উইন্ড টারবাইন এবং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির জন্য এটি অপরিহার্য। বর্তমানে এই বাজারের ওপর চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। ট্রাম্প চাইছেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে চীনের ওপর আমেরিকার নির্ভরশীলতা কমাতে।

  • গ্রাফাইট, তামা ও নিকেল: ইভি ব্যাটারি এবং স্টিল শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় গ্রাফাইটের বিশাল মজুত রয়েছে এখানে। এছাড়া দ্বীপের উত্তর ও পশ্চিমে তামা, নিকেল, প্ল্যাটিনাম ও কোবাল্টের মতো মূল্যবান ধাতুর সন্ধান পাওয়া গেছে।

  • সোনা, হীরা ও জিংক: দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডে সোনার খনি এবং পশ্চিমে হীরার মজুত দ্বীপটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তর গ্রিনল্যান্ডে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অনুন্নত জিংক ও সিসার মজুত রয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ট্রাম্পের হুমকি

গ্রিনল্যান্ড দখল নিয়ে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের হুমকির প্রতিবাদ করায় তিনি ইউরোপের ৮টি দেশের ওপর বিপুল শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, যদিও পরে তা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ডেনমার্ক সরকার গ্রিনল্যান্ডে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করেছে।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ডেনিশ ও গ্রিনল্যান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা রয়েছে। ওয়াশিংটনের এই অতি-তৎপরতা চীন ও রাশিয়ার নজর এড়ায়নি; তারাও আর্কটিক অঞ্চলের এই ক্ষমতার লড়াই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

উত্তোলনের পথে যত বাধা

বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও গ্রিনল্যান্ডের সম্পদ আহরণ করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং: ১. আদিবাসীদের বিরোধ: স্থানীয় ইনুইট সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের ভূমি ও প্রকৃতির ওপর বহিরাগত হস্তক্ষেপের তীব্র বিরোধী। ২. পরিবেশগত উদ্বেগ: পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডে তেল ও গ্যাস উত্তোলন ইতিমধ্যে নিষিদ্ধ। ২০২১ সাল থেকে ইউরেনিয়াম অনুসন্ধানও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ৩. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা: আইনি বিরোধ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কারণে অনেক খনি প্রকল্পের কাজ এখন স্থগিত।

কৌশলগত গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ

আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়ার ফলে নতুন নতুন শিপিং রুট (নৌপথ) উন্মোচিত হচ্ছে। গ্রিনল্যান্ড যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, উত্তর গোলার্ধের বাণিজ্য ও সামরিক আধিপত্য তার হাতেই থাকবে।

গ্রিনল্যান্ড কি কেবল বড় দেশগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ের ক্ষেত্র হবে, নাকি বিশ্বজুড়ে সবুজ প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি স্থিতিশীল খনিজ সরবরাহকারী হয়ে উঠবে? উত্তরটি নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ও কোপেনহেগেনের আগামী কয়েক দিনের কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর। তবে স্পষ্ট যে, বিরল মৃত্তিকা আর গ্রাফাইটের এই যুদ্ধ আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ