শত শত বছর ধরে সমাজের সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করে এলেও আজও তারা রয়ে গেছে সামাজিক স্বীকৃতি, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও মানবিক মর্যাদার বাইরে।
ডোম সম্প্রদায় মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী একটি দল, যারা ঐতিহ্যগতভাবে শ্মশান ব্যবস্থাপনা, লাশ দাহ, ময়লা পরিষ্কার, ঝাড়ুদার বা মৃত পশু অপসারণের মতো কাজ করে থাকে। শহরের কোলাহলের আড়ালে, শ্মশানের ধোঁয়ার পাশে কিংবা নদীর তীরে গড়ে ওঠা অচেনা পল্লীগুলোতে বাস করে একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী ডোম সম্প্রদায়। সমাজের সবচেয়ে কঠিন ও অপছন্দনীয় কাজগুলো করেই যাদের জীবন চলে, অথচ সেই সমাজেই তারা সবচেয়ে অবহেলিত।
ডোম সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একই পেশা শ্মশান ব্যবস্থাপনা, লাশ দাহ, ঝাড়ুদারি ও ময়লা পরিষ্কারের কাজ। এই পেশা তাদের কাছে কোনো পছন্দের বিষয় নয়, বরং জন্মগত এক বাধ্যবাধকতা। রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশান এলাকার বাসিন্দা শ্রীবাস ডোম বলেন, আমরা এই কাজ না করলে কেউ আমাদের অন্য কাজ দেয় না। আমাদের পরিচয়টাই আমাদের সবচেয়ে বড় শাস্তি। তবে এই ডোমপল্লীগুলোর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে দারিদ্র্য আর অব্যবস্থাপনার চিত্র। ছোট ছোট টিনের ঘর, খোলা নালা, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস আর নিরাপদ পানির সংকট এখানকার নিত্যদিনের সঙ্গী। বর্ষা এলেই অনেক ঘর পানিতে তলিয়ে যায়।
ডোম সম্প্রদায়ের শিশুরা জন্ম থেকেই পিছিয়ে পড়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অনেক পরিবারে অভাবের কারণে শিশুদের ছোট বয়সেই কাজে নামতে হয়। যারা স্কুলে যায়, তারাও বৈষম্যের শিকার হয়। একজন মা লতা ডোম আক্ষেপ করে বলেন, স্কুলে গেলে অন্য বাচ্চারা আমার ছেলেকে নিয়ে হাসাহাসি করে। তাই সে আর যেতে চায় না। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং একই পেশার চক্র ভাঙতে পারছে না।
লাশ দাহ ও ময়লা পরিষ্কারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করতে গিয়ে ডোম সম্প্রদায়ের মানুষদের কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় না। এতে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও সংক্রমণের এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিত্যসঙ্গী। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা কলছেন এই জনগোষ্ঠীর মানুষ নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পায় না। অসুস্থ হলেও হাসপাতালে যেতে ভয় পায়।
এই ডোম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সংকট সামাজিক বৈষম্য। অনেক এলাকায় তাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়া, একই নলকূপ ব্যবহার কিংবা বাসা ভাড়া দেওয়াও অনেকে এড়িয়ে চলে। বিশেষ করে নারীরা দ্বিগুণ বৈষম্যের শিকার। বিয়ে, কর্মসংস্থান কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই তাদের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় বড় বাধা।
এদিকে কিছু বেসরকারি সংগঠন ডোম সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের চেষ্টাও চলছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনও খুব সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোম সম্প্রদায়কে মূলধারায় আনতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষাবৃত্তি ও বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, অত্যন্ত জরুরি।
ডোম সম্প্রদায়ের মানুষরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের শ্রম ছাড়া শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেমে যাবে। তবু তারা আজও অদৃশ্য, অবহেলিত। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই পারে এই জনগোষ্ঠীকে বেঁচে থাকার নয়, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দিতে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
শত শত বছর ধরে সমাজের সবচেয়ে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করে এলেও আজও তারা রয়ে গেছে সামাজিক স্বীকৃতি, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও মানবিক মর্যাদার বাইরে।
ডোম সম্প্রদায় মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী একটি দল, যারা ঐতিহ্যগতভাবে শ্মশান ব্যবস্থাপনা, লাশ দাহ, ময়লা পরিষ্কার, ঝাড়ুদার বা মৃত পশু অপসারণের মতো কাজ করে থাকে। শহরের কোলাহলের আড়ালে, শ্মশানের ধোঁয়ার পাশে কিংবা নদীর তীরে গড়ে ওঠা অচেনা পল্লীগুলোতে বাস করে একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠী ডোম সম্প্রদায়। সমাজের সবচেয়ে কঠিন ও অপছন্দনীয় কাজগুলো করেই যাদের জীবন চলে, অথচ সেই সমাজেই তারা সবচেয়ে অবহেলিত।
ডোম সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একই পেশা শ্মশান ব্যবস্থাপনা, লাশ দাহ, ঝাড়ুদারি ও ময়লা পরিষ্কারের কাজ। এই পেশা তাদের কাছে কোনো পছন্দের বিষয় নয়, বরং জন্মগত এক বাধ্যবাধকতা। রাজধানীর পোস্তগোলা শ্মশান এলাকার বাসিন্দা শ্রীবাস ডোম বলেন, আমরা এই কাজ না করলে কেউ আমাদের অন্য কাজ দেয় না। আমাদের পরিচয়টাই আমাদের সবচেয়ে বড় শাস্তি। তবে এই ডোমপল্লীগুলোর দিকে তাকালেই চোখে পড়ে দারিদ্র্য আর অব্যবস্থাপনার চিত্র। ছোট ছোট টিনের ঘর, খোলা নালা, অপর্যাপ্ত আলো-বাতাস আর নিরাপদ পানির সংকট এখানকার নিত্যদিনের সঙ্গী। বর্ষা এলেই অনেক ঘর পানিতে তলিয়ে যায়।
ডোম সম্প্রদায়ের শিশুরা জন্ম থেকেই পিছিয়ে পড়ে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অনেক পরিবারে অভাবের কারণে শিশুদের ছোট বয়সেই কাজে নামতে হয়। যারা স্কুলে যায়, তারাও বৈষম্যের শিকার হয়। একজন মা লতা ডোম আক্ষেপ করে বলেন, স্কুলে গেলে অন্য বাচ্চারা আমার ছেলেকে নিয়ে হাসাহাসি করে। তাই সে আর যেতে চায় না। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অশিক্ষিত থেকে যাচ্ছে এবং একই পেশার চক্র ভাঙতে পারছে না।
লাশ দাহ ও ময়লা পরিষ্কারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করতে গিয়ে ডোম সম্প্রদায়ের মানুষদের কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় না। এতে চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট ও সংক্রমণের এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিত্যসঙ্গী। তবে স্বাস্থ্যকর্মীরা কলছেন এই জনগোষ্ঠীর মানুষ নিয়মিত চিকিৎসাসেবা পায় না। অসুস্থ হলেও হাসপাতালে যেতে ভয় পায়।
এই ডোম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সংকট সামাজিক বৈষম্য। অনেক এলাকায় তাদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়া, একই নলকূপ ব্যবহার কিংবা বাসা ভাড়া দেওয়াও অনেকে এড়িয়ে চলে। বিশেষ করে নারীরা দ্বিগুণ বৈষম্যের শিকার। বিয়ে, কর্মসংস্থান কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই তাদের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় বড় বাধা।
এদিকে কিছু বেসরকারি সংগঠন ডোম সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিয়েছে। কোথাও কোথাও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থানের চেষ্টাও চলছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনও খুব সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডোম সম্প্রদায়কে মূলধারায় আনতে হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষাবৃত্তি ও বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচি বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, অত্যন্ত জরুরি।
ডোম সম্প্রদায়ের মানুষরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের শ্রম ছাড়া শহরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম থেমে যাবে। তবু তারা আজও অদৃশ্য, অবহেলিত। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগই পারে এই জনগোষ্ঠীকে বেঁচে থাকার নয়, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দিতে।

আপনার মতামত লিখুন