ঢাকা    রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ইটনার ধনু নদীর বুকে বৈঠার ঝংকার, হাওরাঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের মহা-উৎসব


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইটনার ধনু নদীর বুকে বৈঠার ঝংকার, হাওরাঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের মহা-উৎসব

শরতের সোনাঝরা রোদ যখন ধনু নদীর বিশাল রূপালী জলরাশিতে ঠিকরে পড়ছিল, তখন চারপাশের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে বাজছিল এক চিরন্তন ঐকতান—‘মার হেঁইও, হাঁর হেঁইও!’ পলিমাটির সুবাস আর গাঙচিলের ডানায় ভেসে আসা হিমেল বাতাসে ভেসে আসছিল মাঝিমাল্লাদের কণ্ঠের দরদী সারিগান। কিশোরগঞ্জের ইটনা থানার বুক চিরে বয়ে যাওয়া উত্তাল ধনু নদীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে জমকালো, রোমাঞ্চকর ও গ্রহণযোগ্য ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উৎসব। গ্রামবাংলার এই শতবর্ষী সংস্কৃতিকে ঘিরে হাওরের নিস্তরঙ্গ জীবনে নেমে এসেছিল আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ার।

​নদী আর হাওরের মানুষের জীবনসংগ্রামের অন্যতম অনুষঙ্গ এই নৌকা। তবে বর্ষা-শরতের মিলনমেলায় সেই নৌকাই যখন গতি, ছন্দ আর পেশিশক্তির লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তখন তা আর নিছক যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না—হয়ে ওঠে আস্ত এক লোকজ মহাকাব্য। নদীর দুই কূলে উপচে পড়া হাজার হাজার মানুষের করতালিতে কেঁপে উঠছিল ইটনার আকাশ-বাতাস। শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী থেকে পুরুষ—সকলেই যেন ঘরের দুয়ার ঠেলে এসে জমেছিলেন ধনু নদীর দুই তীরের ঘাটে, বাঁধের পাড়ে কিংবা নিজস্ব কোনো কোষা ও ট্রলারে।

​অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে হাওরের মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। ধনু নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে লাখো জনতার উদ্দেশে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমাদের হাওরের মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে এখানকার মাটির সংস্কৃতিতে। সারিগান গেয়েই নৌকা দৌড়াতে হবে। গানের এই সুর, বৈঠার এই ছন্দ আমাদের শেকড়কে মনে করিয়ে দেয়। গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যকে আমাদের হৃদয়ে ধরে রাখতে হবে।” তাঁর প্রতিটি বাক্যের সাথে সাথে নদীর বুকে করতালি ও উল্লাসের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

​উৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এক অদ্ভুত ও কাব্যিক অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল। নিজের স্মৃতির পাতা উল্টে তিনি যে অকপট সত্য উচ্চারণ করলেন, তা সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিগত ১৭টি বছর নৌকা দেখলেই আমরা ভয়ে পালাতাম। সেই ভীতি আর আতঙ্কের ছায়া আজ ধনু নদীর এই মুক্ত বাতাসে কেটে গেছে। জীবনে প্রথমবারের মতো নদীর বুকে লোকজ ঐতিহ্যের এই নৌকা বাইচ দেখে আমি সত্যি অভিভূত, বাকরুদ্ধ। এই হাওর আমাদের রূপসী বাংলার অহংকার, আর এই নৌকা বাইচ আমাদের প্রাণ। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে।”

​ধনু নদীর বুকেও তখন চলছিল গতির এক মহাকাব্যিক লড়াই। রঙ-বেসংয়ের বিশাল বিশাল ময়ূরপঙ্খী, ছিপ ও খেলা নৌকার গলুইগুলো যেন নদীর জলের বুক চিরে রূপালী রেখা এঁকে ছুটে চলছিল এক অদৃশ্য লক্ষ্যের পানে। নৌকার পেছনের কাঁশার ঝংকার, ছান্দিক ঢাকের শব্দ আর গায়েনদের দরদী সারিগান—সব মিলিয়ে ধনু নদী যেন হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত লোকজ ক্যানভাস। জলের ওপর বৈঠার তীব্র আঘাতে তৈরি হওয়া জলকণাগুলো রোদের আলোয় মুক্তোদানার মতো ঝলসে উঠছিল। মাঝিদের হাতের প্রতিটি টানে ফুটে উঠছিল হাওরবাসীর অদম্য সাহস আর ঐক্যের ছবি।

​নৌকা বাইচের চূড়ান্ত লড়াই শেষে নামল আনন্দের মহোৎসব। দিনশেষে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। বিজয়ী ও বিজিতদের হাসিমুখ আর গোধূলির লাল আলো যখন ধনু নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছিল, তখন পুরো ইটনা যেন এক অনন্য মেলবন্ধনের সাক্ষী হয়ে রইল। 

আধুনিকতার ভিড়ে ইটনার এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন প্রমাণ করে দিল—কালের আবর্তে নদী শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু হাওরবাসীর ধমনীতে প্রবাহিত লোকজ সংস্কৃতি ও ভালোবাসার নদী কোনোদিন শুকোবার নয়।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ইটনার ধনু নদীর বুকে বৈঠার ঝংকার, হাওরাঞ্চলে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের মহা-উৎসব

প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

শরতের সোনাঝরা রোদ যখন ধনু নদীর বিশাল রূপালী জলরাশিতে ঠিকরে পড়ছিল, তখন চারপাশের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে বাজছিল এক চিরন্তন ঐকতান—‘মার হেঁইও, হাঁর হেঁইও!’ পলিমাটির সুবাস আর গাঙচিলের ডানায় ভেসে আসা হিমেল বাতাসে ভেসে আসছিল মাঝিমাল্লাদের কণ্ঠের দরদী সারিগান। কিশোরগঞ্জের ইটনা থানার বুক চিরে বয়ে যাওয়া উত্তাল ধনু নদীতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল হাওরাঞ্চলের সবচেয়ে জমকালো, রোমাঞ্চকর ও গ্রহণযোগ্য ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ উৎসব। গ্রামবাংলার এই শতবর্ষী সংস্কৃতিকে ঘিরে হাওরের নিস্তরঙ্গ জীবনে নেমে এসেছিল আনন্দের বাঁধভাঙা জোয়ার।

​নদী আর হাওরের মানুষের জীবনসংগ্রামের অন্যতম অনুষঙ্গ এই নৌকা। তবে বর্ষা-শরতের মিলনমেলায় সেই নৌকাই যখন গতি, ছন্দ আর পেশিশক্তির লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তখন তা আর নিছক যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না—হয়ে ওঠে আস্ত এক লোকজ মহাকাব্য। নদীর দুই কূলে উপচে পড়া হাজার হাজার মানুষের করতালিতে কেঁপে উঠছিল ইটনার আকাশ-বাতাস। শিশু থেকে বৃদ্ধ, নারী থেকে পুরুষ—সকলেই যেন ঘরের দুয়ার ঠেলে এসে জমেছিলেন ধনু নদীর দুই তীরের ঘাটে, বাঁধের পাড়ে কিংবা নিজস্ব কোনো কোষা ও ট্রলারে।

​অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে হাওরের মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসকে আরও বাড়িয়ে দেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। ধনু নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে লাখো জনতার উদ্দেশে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমাদের হাওরের মূল প্রাণ লুকিয়ে আছে এখানকার মাটির সংস্কৃতিতে। সারিগান গেয়েই নৌকা দৌড়াতে হবে। গানের এই সুর, বৈঠার এই ছন্দ আমাদের শেকড়কে মনে করিয়ে দেয়। গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যকে আমাদের হৃদয়ে ধরে রাখতে হবে।” তাঁর প্রতিটি বাক্যের সাথে সাথে নদীর বুকে করতালি ও উল্লাসের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

​উৎসবে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এক অদ্ভুত ও কাব্যিক অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল। নিজের স্মৃতির পাতা উল্টে তিনি যে অকপট সত্য উচ্চারণ করলেন, তা সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বিগত ১৭টি বছর নৌকা দেখলেই আমরা ভয়ে পালাতাম। সেই ভীতি আর আতঙ্কের ছায়া আজ ধনু নদীর এই মুক্ত বাতাসে কেটে গেছে। জীবনে প্রথমবারের মতো নদীর বুকে লোকজ ঐতিহ্যের এই নৌকা বাইচ দেখে আমি সত্যি অভিভূত, বাকরুদ্ধ। এই হাওর আমাদের রূপসী বাংলার অহংকার, আর এই নৌকা বাইচ আমাদের প্রাণ। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হবে।”

​ধনু নদীর বুকেও তখন চলছিল গতির এক মহাকাব্যিক লড়াই। রঙ-বেসংয়ের বিশাল বিশাল ময়ূরপঙ্খী, ছিপ ও খেলা নৌকার গলুইগুলো যেন নদীর জলের বুক চিরে রূপালী রেখা এঁকে ছুটে চলছিল এক অদৃশ্য লক্ষ্যের পানে। নৌকার পেছনের কাঁশার ঝংকার, ছান্দিক ঢাকের শব্দ আর গায়েনদের দরদী সারিগান—সব মিলিয়ে ধনু নদী যেন হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত লোকজ ক্যানভাস। জলের ওপর বৈঠার তীব্র আঘাতে তৈরি হওয়া জলকণাগুলো রোদের আলোয় মুক্তোদানার মতো ঝলসে উঠছিল। মাঝিদের হাতের প্রতিটি টানে ফুটে উঠছিল হাওরবাসীর অদম্য সাহস আর ঐক্যের ছবি।

​নৌকা বাইচের চূড়ান্ত লড়াই শেষে নামল আনন্দের মহোৎসব। দিনশেষে বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও পুরস্কার তুলে দেন প্রধান অতিথি বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। বিজয়ী ও বিজিতদের হাসিমুখ আর গোধূলির লাল আলো যখন ধনু নদীর পানিতে মিশে যাচ্ছিল, তখন পুরো ইটনা যেন এক অনন্য মেলবন্ধনের সাক্ষী হয়ে রইল। 

আধুনিকতার ভিড়ে ইটনার এই ঐতিহ্যবাহী আয়োজন প্রমাণ করে দিল—কালের আবর্তে নদী শুকিয়ে যেতে পারে, কিন্তু হাওরবাসীর ধমনীতে প্রবাহিত লোকজ সংস্কৃতি ও ভালোবাসার নদী কোনোদিন শুকোবার নয়।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ