ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

পারিবারিক কলহের জেরে পিতৃহত্যা, কিশোরগঞ্জে ছেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, খালাস ৩।


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

পারিবারিক কলহের জেরে পিতৃহত্যা, কিশোরগঞ্জে ছেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, খালাস ৩।
কিশোরগঞ্জে পিতা হত্যায় ছেলের যাবজ্জীবন কারাদন্ড, ৩ জন খালাস।

পারিবারিক কলহের জেরে নিজ জন্মদাতা পিতাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার দায় প্রমাণ হওয়ায় ছেলে মো. সেলিমকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে; যা অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ায় একই মামলায় অভিযুক্ত নিহতের স্ত্রী, অপর এক ছেলে ও এক পুত্রবধূকে বিচারক সম্পূর্ণ খালাস প্রদান করেছেন।

​সোমবার (১৭ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক সুপ্রিয়া রহমান আসামিদের উপস্থিতে ও অনুপস্থিতিতে জনাকীর্ণ আদালতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ​রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. সেলিম আদালতে অনুপস্থিত (পলাতক) ছিলেন। অন্যদিকে, মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া তিন আসামি—নিহতের স্ত্রী মোছা. আছিয়া খাতুন, ছেলে মো. জাবেদ এবং পুত্রবধূ মোছা. ময়না খাতুন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিচারক রায় পড়া শেষ করলে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের আদালত কক্ষ থেকেই মুক্তি দেওয়া হয়।

​মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ১০ নম্বর যশোদল ইউনিয়নের স্বল্পযশোদল ভুরিরচর গ্রামে এই মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। নিহতের নাম আবু বাক্কার সিদ্দিক। ​২০১৫ সালের ২৪ জুলাই আবু বাক্কার সিদ্দিকের সঙ্গে তার স্ত্রী আছিয়া খাতুনের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পারিবারিক বিরোধের সৃষ্টি হয়। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে আবু বাক্কার সিদ্দিক তার স্ত্রী আছিয়া খাতুনকে শারীরিক প্রহার ও মারধর করেন। নিজ চোখের সামনে মাকে মারধরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই ছেলে মো. সেলিম ও মো. জাবেদ এবং পুত্রবধূ মোছা. ময়না খাতুনের সাথে গৃহকর্তা আবু বাক্কারের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। গৃহের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় এক গুমোট ও অশান্ত পরিবেশ। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই রাতে প্রতিদিনের মতোই রাতের খাবার পর্ব শেষ করে নিজের বসতঘরে একা ঘুমাতে যান আবু বাক্কার সিদ্দিক। পরবর্তীতে মামলার অনুসন্ধানে উঠে আসে, ওই দিন রাত ১১টা থেকে পরদিন (৩১ জুলাই) সকাল ৬টার মধ্যে কোনো একসময় ঘাতক অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বসতঘরে প্রবেশ করে। ঘুমন্ত ও অসতর্ক অবস্থায় থাকা আবু বাক্কার সিদ্দিকের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। হত্যাকাণ্ড ঢাকার উদ্দেশ্যে ঘাতক বা ঘাতকরা তার রক্তাক্ত নিথর দেহটি একটি কম্বল দিয়ে ঢেকে রেখে স্থান ত্যাগ করে। ৩১ জুলাই ভোরের আলো ফুটতেই ভুরিরচর গ্রামের মানুষ এক অভূতপূর্ব ও গা শিউরে ওঠা দৃশ্যের সাক্ষী হয়। সকালে হঠাৎ নিহতের বড় ছেলে মো. সেলিম নিজ ঘরের উঠানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্রকাশ্যে বলতে থাকেন, “আমি আমার বাবাকে হত্যা করেছি!” ​সেলিমের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ও অস্বাভাবিক আচরণে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন আশপাশের মানুষ ও স্বজনরা। নিজের অপরাধ স্বীকারের পর তীব্র অনুশোচনা কিংবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সেলিম সঙ্গে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। এ সময় উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে আটক করেন এবং তার হাত থেকে রক্তাক্ত ছুরিটি কেড়ে নেন। ​ঘটনার পর পরই ঘরের ভেতর গিয়ে কম্বল সরোতেই চোখ কপালে ওঠে নিহতের ছোট ভাই ও প্রতিবেশীদের। তারা দেখতে পান বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে এবং আবু বাক্কার সিদ্দিকের মাথার ডান পাশে রয়েছে গভীর ও মারাত্মক জখম। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে দ্রুত কিশোরগঞ্জ ২৫০শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আবু বাক্কার সিদ্দিককে মৃত ঘোষণা করেন। ​অন্যদিকে, নিজের পেটে আঘাত করে গুরুতর আহত হওয়া ছেলে সেলিমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুলিশি পাহাড়ায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

​পারিবারিক এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই মো. আবু হানিফ বাদী হয়ে ঘটনার দিনই (৩১ জুলাই ২০১৫) কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় নিহতের ছেলে সেলিম, অপর ছেলে জাবেদ, স্ত্রী আছিয়া খাতুন ও পুত্রবধূ ময়না খাতুনকে আসামি করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

​মামলা দায়েরের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আলামত সংগ্রহ করেন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করেন। দীর্ঘ ১১ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও দীর্ঘ শুনানি সম্পন্ন করেন। ​সাক্ষ্য-প্রমাণ ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা শেষে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পারিবারিক ক্ষোভ থেকেই ছেলে মো. সেলিম এককভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তার পিতা আবু বাক্কার সিদ্দিককে হত্যা করেছেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। অপরদিকে, নিহত আবু বাক্কার সিদ্দিকের স্ত্রী আছিয়া খাতুন, ছেলে জাবেদ ও পুত্রবধূ ময়না খাতুনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ততার কোনো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

​রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই রায় একটি বার্তা দেবে। পারিবারিক বিরোধ যে পর্যায়ই যাক না কেন, জন্মদাতা পিতাকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তি থেকে কেউ পার পায় না। আমরা আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছি।”

​খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষের আইনজীবী জানান, “আমার মক্কেলরা নির্দোষ ছিলেন। কেবল পারিবারিক বিরোধের সূত্র ধরে এজাহারে তাদের নাম যুক্ত করা হয়েছিল। বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ বিচার বিশ্লেষণ শেষে তাদের খালাস দেওয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” ​এদিকে, রায়ের সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামি সেলিম পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে সাজা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর ঘোষিত এই রায়ে ভুরিরচর গ্রামসহ পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের মতে, রায়ের মধ্য দিয়ে নিহত আবু বাক্কার সিদ্দিকের আত্মা শান্তি পেল, তবে একটি পরিবারের এমন ট্র্যাজিক পরিণতি স্থানীয়দের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


পারিবারিক কলহের জেরে পিতৃহত্যা, কিশোরগঞ্জে ছেলের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, খালাস ৩।

প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

পারিবারিক কলহের জেরে নিজ জন্মদাতা পিতাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার দায় প্রমাণ হওয়ায় ছেলে মো. সেলিমকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে; যা অনাদায়ে তাকে অতিরিক্ত আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ায় একই মামলায় অভিযুক্ত নিহতের স্ত্রী, অপর এক ছেলে ও এক পুত্রবধূকে বিচারক সম্পূর্ণ খালাস প্রদান করেছেন।


​সোমবার (১৭ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক সুপ্রিয়া রহমান আসামিদের উপস্থিতে ও অনুপস্থিতিতে জনাকীর্ণ আদালতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। ​রায় ঘোষণার সময় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. সেলিম আদালতে অনুপস্থিত (পলাতক) ছিলেন। অন্যদিকে, মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া তিন আসামি—নিহতের স্ত্রী মোছা. আছিয়া খাতুন, ছেলে মো. জাবেদ এবং পুত্রবধূ মোছা. ময়না খাতুন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বিচারক রায় পড়া শেষ করলে খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের আদালত কক্ষ থেকেই মুক্তি দেওয়া হয়।


​মামলার এজাহার ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ১০ নম্বর যশোদল ইউনিয়নের স্বল্পযশোদল ভুরিরচর গ্রামে এই মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। নিহতের নাম আবু বাক্কার সিদ্দিক। ​২০১৫ সালের ২৪ জুলাই আবু বাক্কার সিদ্দিকের সঙ্গে তার স্ত্রী আছিয়া খাতুনের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে পারিবারিক বিরোধের সৃষ্টি হয়। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে আবু বাক্কার সিদ্দিক তার স্ত্রী আছিয়া খাতুনকে শারীরিক প্রহার ও মারধর করেন। নিজ চোখের সামনে মাকে মারধরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই ছেলে মো. সেলিম ও মো. জাবেদ এবং পুত্রবধূ মোছা. ময়না খাতুনের সাথে গৃহকর্তা আবু বাক্কারের বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। গৃহের অভ্যন্তরে সৃষ্টি হয় এক গুমোট ও অশান্ত পরিবেশ। ঘটনার দিন অর্থাৎ ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই রাতে প্রতিদিনের মতোই রাতের খাবার পর্ব শেষ করে নিজের বসতঘরে একা ঘুমাতে যান আবু বাক্কার সিদ্দিক। পরবর্তীতে মামলার অনুসন্ধানে উঠে আসে, ওই দিন রাত ১১টা থেকে পরদিন (৩১ জুলাই) সকাল ৬টার মধ্যে কোনো একসময় ঘাতক অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বসতঘরে প্রবেশ করে। ঘুমন্ত ও অসতর্ক অবস্থায় থাকা আবু বাক্কার সিদ্দিকের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। হত্যাকাণ্ড ঢাকার উদ্দেশ্যে ঘাতক বা ঘাতকরা তার রক্তাক্ত নিথর দেহটি একটি কম্বল দিয়ে ঢেকে রেখে স্থান ত্যাগ করে। ৩১ জুলাই ভোরের আলো ফুটতেই ভুরিরচর গ্রামের মানুষ এক অভূতপূর্ব ও গা শিউরে ওঠা দৃশ্যের সাক্ষী হয়। সকালে হঠাৎ নিহতের বড় ছেলে মো. সেলিম নিজ ঘরের উঠানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে প্রকাশ্যে বলতে থাকেন, “আমি আমার বাবাকে হত্যা করেছি!” ​সেলিমের এই প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি ও অস্বাভাবিক আচরণে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন আশপাশের মানুষ ও স্বজনরা। নিজের অপরাধ স্বীকারের পর তীব্র অনুশোচনা কিংবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে সেলিম সঙ্গে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান। এ সময় উপস্থিত স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে আটক করেন এবং তার হাত থেকে রক্তাক্ত ছুরিটি কেড়ে নেন। ​ঘটনার পর পরই ঘরের ভেতর গিয়ে কম্বল সরোতেই চোখ কপালে ওঠে নিহতের ছোট ভাই ও প্রতিবেশীদের। তারা দেখতে পান বিছানা রক্তে ভেসে যাচ্ছে এবং আবু বাক্কার সিদ্দিকের মাথার ডান পাশে রয়েছে গভীর ও মারাত্মক জখম। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে দ্রুত কিশোরগঞ্জ ২৫০শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আবু বাক্কার সিদ্দিককে মৃত ঘোষণা করেন। ​অন্যদিকে, নিজের পেটে আঘাত করে গুরুতর আহত হওয়া ছেলে সেলিমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুলিশি পাহাড়ায় সুস্থ হওয়ার পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।


​পারিবারিক এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই মো. আবু হানিফ বাদী হয়ে ঘটনার দিনই (৩১ জুলাই ২০১৫) কিশোরগঞ্জ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় নিহতের ছেলে সেলিম, অপর ছেলে জাবেদ, স্ত্রী আছিয়া খাতুন ও পুত্রবধূ ময়না খাতুনকে আসামি করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২-৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।


​মামলা দায়েরের পর তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আলামত সংগ্রহ করেন এবং আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করেন। দীর্ঘ ১১ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও দীর্ঘ শুনানি সম্পন্ন করেন। ​সাক্ষ্য-প্রমাণ ও রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি পর্যালোচনা শেষে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পারিবারিক ক্ষোভ থেকেই ছেলে মো. সেলিম এককভাবে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তার পিতা আবু বাক্কার সিদ্দিককে হত্যা করেছেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। অপরদিকে, নিহত আবু বাক্কার সিদ্দিকের স্ত্রী আছিয়া খাতুন, ছেলে জাবেদ ও পুত্রবধূ ময়না খাতুনের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ততার কোনো সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।


​রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই রায় একটি বার্তা দেবে। পারিবারিক বিরোধ যে পর্যায়ই যাক না কেন, জন্মদাতা পিতাকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শাস্তি থেকে কেউ পার পায় না। আমরা আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে পেরেছি।”


​খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষের আইনজীবী জানান, “আমার মক্কেলরা নির্দোষ ছিলেন। কেবল পারিবারিক বিরোধের সূত্র ধরে এজাহারে তাদের নাম যুক্ত করা হয়েছিল। বিজ্ঞ আদালত দীর্ঘ বিচার বিশ্লেষণ শেষে তাদের খালাস দেওয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” ​এদিকে, রায়ের সময় সাজাপ্রাপ্ত আসামি সেলিম পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে সাজা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর পর ঘোষিত এই রায়ে ভুরিরচর গ্রামসহ পুরো কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের মতে, রায়ের মধ্য দিয়ে নিহত আবু বাক্কার সিদ্দিকের আত্মা শান্তি পেল, তবে একটি পরিবারের এমন ট্র্যাজিক পরিণতি স্থানীয়দের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ