দেওয়ালের ওপারে বন্দি জীবন, কিন্তু মানবতা তো সীমানায় আটকে থাকে না। “রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ”—কারাগারের এই মূলমন্ত্রকে শুধু দেওয়ালে খোদাই করা বাক্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে রূপ দিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেল কিশোরগঞ্জে। কারা ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিকতার স্পর্শ পৌঁছে দিতে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন। আজ সোমবার ( ২০ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনে তিনি বন্দিদের সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত স্বচক্ষে খতিয়ে দেখেন।
আজ সকালে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জেলা কারাগার প্রাঙ্গণে পৌঁছালে কারা কর্তৃপক্ষের একটি সুসজ্জিত ও চৌকস দল তাঁকে প্রথাগত ও সম্মানজনক 'গার্ড অব অনার' প্রদান করে। সালাম গ্রহণ ও আনুষ্ঠানিকতার পর তিনি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ এরশাদুল আহমেদ এবং জেলা ও কারা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরীণ চত্বরে প্রবেশ করেন।
কারাগারের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক প্রতিটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। বন্দিদের থাকার পরিবেশ, আলো-বাতাসের সুযোগ, শৌচাগার ও আশপাশের পরিবেশ কতটা পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে—তা তিনি খুটিয়ে খতিয়ে দেখেন।
কেবল পরিদর্শনেই ক্ষান্ত হননি তিনি; সাধারণ ও অসুস্থ বন্দিদের একদম কাছে গিয়ে তাঁদের সাথে খোলামেলা কথা বলেন। তাঁদের কোনো অভাব-অভিযোগ রয়েছে কি না, কিংবা নিয়মতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা পেতে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে তিনি মনোযোগ দিয়ে খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, "কারাগার কেবল শাস্তির নিগড় নয়, বরং এটি একজন পথভ্রষ্ট মানুষকে সংশোধন করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার এক সম্ভাবনাময় আলোর দিশারী।"
একজন মানুষের সুস্থ থাকার অন্যতম শর্ত সঠিক পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা। এ বিষয়টি অনুধাবন করে জেলা প্রশাসক সরাসরি বন্দিদের খাদ্য প্রস্তুতের স্থান অর্থাৎ বিশাল রান্নাঘরে (পাকশালা) চলে যান। সেখানে রান্নার সার্বিক স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রস্তুতকৃত খাবারের পুষ্টি ও গুণগত মান নিজ হাতে পরীক্ষা করেন।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছু কঠোর ও জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, বন্দিদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যতালিকায় ক্যালরি ও গুণগত মান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। বন্দি ও তাঁদের স্বজনদের সুবিধার্থে কারা ক্যান্টিনে বিক্রি হওয়া পণ্যের দাম যেন বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ন্যায্য থাকে এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি বন্ধ থাকে। তাছাড়া অসুস্থ বন্দিরা যেন সামান্যতম অবহেলার শিকার না হন। দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ কারাগারের ফার্মাসিতে জরুরি ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রাখার তাগিদ দেন।
পরিদর্শনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জেলা প্রশাসক কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে এক আবেগঘন অথচ দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আইনি বিচারে অপরাধের সাজা নিশ্চিত হওয়া আদালতের বিষয়, কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত কিংবা বিচারাধীন বন্দিরাও মানুষ। তাঁদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে সমাজে পুনর্বাসিত করাই কারা প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি কারাগারের প্রতিটি সেবাকে আরও বেশি গতিশীল, স্বচ্ছ, সেবামুখী ও মানবিক করার জন্য কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। জেলা প্রশাসকের এই ঝটিকা ও গঠনমূলক পরিদর্শনে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
দেওয়ালের ওপারে বন্দি জীবন, কিন্তু মানবতা তো সীমানায় আটকে থাকে না। “রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ”—কারাগারের এই মূলমন্ত্রকে শুধু দেওয়ালে খোদাই করা বাক্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে রূপ দিতে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেল কিশোরগঞ্জে। কারা ব্যবস্থাপনায় শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও মানবিকতার স্পর্শ পৌঁছে দিতে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার নিবিড়ভাবে পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন। আজ সোমবার ( ২০ জুলাই) অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের পরিদর্শনে তিনি বন্দিদের সুযোগ-সুবিধা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আদ্যোপান্ত স্বচক্ষে খতিয়ে দেখেন।
আজ সকালে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জেলা কারাগার প্রাঙ্গণে পৌঁছালে কারা কর্তৃপক্ষের একটি সুসজ্জিত ও চৌকস দল তাঁকে প্রথাগত ও সম্মানজনক 'গার্ড অব অনার' প্রদান করে। সালাম গ্রহণ ও আনুষ্ঠানিকতার পর তিনি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ এরশাদুল আহমেদ এবং জেলা ও কারা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে কারাগারের অভ্যন্তরীণ চত্বরে প্রবেশ করেন।
কারাগারের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি জেলা প্রশাসক প্রতিটি ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন। বন্দিদের থাকার পরিবেশ, আলো-বাতাসের সুযোগ, শৌচাগার ও আশপাশের পরিবেশ কতটা পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে—তা তিনি খুটিয়ে খতিয়ে দেখেন।
কেবল পরিদর্শনেই ক্ষান্ত হননি তিনি; সাধারণ ও অসুস্থ বন্দিদের একদম কাছে গিয়ে তাঁদের সাথে খোলামেলা কথা বলেন। তাঁদের কোনো অভাব-অভিযোগ রয়েছে কি না, কিংবা নিয়মতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা পেতে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে কি না—সে বিষয়ে তিনি মনোযোগ দিয়ে খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, "কারাগার কেবল শাস্তির নিগড় নয়, বরং এটি একজন পথভ্রষ্ট মানুষকে সংশোধন করে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার এক সম্ভাবনাময় আলোর দিশারী।"
একজন মানুষের সুস্থ থাকার অন্যতম শর্ত সঠিক পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা। এ বিষয়টি অনুধাবন করে জেলা প্রশাসক সরাসরি বন্দিদের খাদ্য প্রস্তুতের স্থান অর্থাৎ বিশাল রান্নাঘরে (পাকশালা) চলে যান। সেখানে রান্নার সার্বিক স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং প্রস্তুতকৃত খাবারের পুষ্টি ও গুণগত মান নিজ হাতে পরীক্ষা করেন।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছু কঠোর ও জরুরি নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি বলেন, বন্দিদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যতালিকায় ক্যালরি ও গুণগত মান যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়। বন্দি ও তাঁদের স্বজনদের সুবিধার্থে কারা ক্যান্টিনে বিক্রি হওয়া পণ্যের দাম যেন বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও ন্যায্য থাকে এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি বন্ধ থাকে। তাছাড়া অসুস্থ বন্দিরা যেন সামান্যতম অবহেলার শিকার না হন। দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদানসহ কারাগারের ফার্মাসিতে জরুরি ওষুধের পর্যাপ্ত মজুত রাখার তাগিদ দেন।
পরিদর্শনের চূড়ান্ত পর্যায়ে জেলা প্রশাসক কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উদ্দেশে এক আবেগঘন অথচ দায়িত্বশীল বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আইনি বিচারে অপরাধের সাজা নিশ্চিত হওয়া আদালতের বিষয়, কিন্তু সাজাপ্রাপ্ত কিংবা বিচারাধীন বন্দিরাও মানুষ। তাঁদের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে সমাজে পুনর্বাসিত করাই কারা প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি কারাগারের প্রতিটি সেবাকে আরও বেশি গতিশীল, স্বচ্ছ, সেবামুখী ও মানবিক করার জন্য কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। জেলা প্রশাসকের এই ঝটিকা ও গঠনমূলক পরিদর্শনে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।

আপনার মতামত লিখুন