ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ফাঁসির দড়ি নয়, যাবজ্জীবনের শিকল:

কিশোরগঞ্জের আলোচিত শিক্ষিকা ‘মৌ’ হত্যায় রিফাতের দণ্ড, ৪ জন বেকসুর খালাস


সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬

কিশোরগঞ্জের আলোচিত শিক্ষিকা ‘মৌ’ হত্যায় রিফাতের দণ্ড, ৪ জন বেকসুর খালাস
কিশোরগঞ্জে আলোচিত স্কুল শিক্ষিকা মৌ হত্যা মামলার রায়ে এক জনের যাবজ্জীবন ও ৪ জন বেকসুর খালাস।

টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বয়ে চলা দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটল অবশেষে। কিশোরগঞ্জের সেই বত্রিশ এলাকার বাতাস যেন আজও একটি ছিমছাম তরুণী মেয়ের আকুল আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে। অবশেষে আলোর মুখ দেখল কিশোরগঞ্জের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও বহুল আলোচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আতিয়া জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ (২২) হত্যা মামলার বিচার। প্রধান আসামির ভাগ্যে জুটেছে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। একই সঙ্গে দুই লক্ষ টাকার জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।


​আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ) দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক সুপ্রিয়া রহমান কানায় কানায় পূর্ণ এজলাসে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মামলার একমাত্র সাজাপ্রাপ্ত আসামি ইউসুফ হায়দার রিফাতকে (৩৬) দৃশ্যত বিমর্ষ ও নির্বাক দেখায়। অন্যদিকে মামলা থেকে অপর চার আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।


​কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বত্রিশ এলাকায় ২০১৫ সালের ৬ ও ৭ নভেম্বরের মধ্যবর্তী কালরাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন গোপদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আতিয়া জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ। ঘটনার দীর্ঘ এক দশক পর কিশোরগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সুপ্রিয়া রহমান এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি, খরমপট্টি এলাকার নাসির উদ্দিন হারুনের ছেলে ইউসুফ হায়দার রিফাতকে (৩৬) যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে; অনাদায়ে তাকে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ না পাওয়ায় বাকি চার আসামিকে আদালত বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন। মামলাটির সফল তদন্ত সম্পন্ন করেছিল পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কিশোরগঞ্জ।

​সালটা ছিল ২০১৫। দিনটি ছিল ৬ নভেম্বর। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বত্রিশ এলাকার নিজ বাসায় পরিবারের সাথে থাকতেন স্বপ্নবাজ তরুণী আতিয়া জাহান মৌ। তিনি পার্শ্ববর্তী মিঠামইন উপজেলার গোপদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও স্নেহভীষণ সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। তাঁর মিষ্টি ব্যবহার ও শিশুদের প্রতি অপরিসীম মমতা তাঁকে অল্প দিনেই সকলের ভালোবাসার পাত্রে পরিণত করেছিল। ​কিন্তু মানুষের অবয়বে লুকিয়ে থাকা কিছু হিংস্র নেকড়ের কুৎসিত লালসা আর ত্রিভুজ প্রেমের জটিল বেড়াজালে বন্দি হতে হয়েছিল এই প্রাণোচ্ছল মেয়েটিকে। মামলার নথি এবং পরবর্তীতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতের কোনো এক সময়ে প্রেমঘটিত কলহ ও বিরোধের জেরে মৌ-এর ঘরে প্রবেশ করে মূল ঘাতক ইউসুফ হায়দার রিফাত। ​কথা কাটাকাটি এবং তীব্র বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে রিফাত ক্ষিপ্ত হয়ে মৌ-এর ওপর চড়াও হয়। নিজের শারীরিক শক্তির দাপটে শ্বাসরোধ করে ও নৃশংসভাবে নির্যাতন চালিয়ে ঘরের মেঝেতেই হত্যা করা হয় মৌকে। যে কণ্ঠ দিয়ে প্রতিদিন সকালে কোমলমতি শিশুরা ‘আমার পণ’ কবিতা আবৃত্তি শুনত, সেই কণ্ঠকে চিরদিনের জন্য নীরব করে দেওয়া হয়েছিল সেই কালরাতেই।

​নিজের অপরাধ ঢাকতে অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নিয়েছিল ঘাতক রিফাত ও তার সহযোগীরা। হত্যার পর মৌ-এর নিথর দেহটিকে ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সবাই একে একটি সাধারণ ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে ধরে নেয়। এরপর ঘরের মূল দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে যায় খুনি। ​পরদিন অর্থাৎ ৭ নভেম্বর দুপুর আড়াইটা নাগাদ ঘরের তালা ভেঙে পুলিশ যখন ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় মৌ-এর লাশ উদ্ধার করে, তখন ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে ছিল। খাটের উপর ছড়ানো ছিল ধস্তাধস্তির চিহ্ন। এই দৃশ্য দেখে বুক ফেটে আর্তনাদ করে ওঠেন মৌ-এর মা রওশন আরা কবিতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর আদরের মেয়ে কোনোভাবেই নিজে থেকে আত্মহত্যা করতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

​তৎক্ষণাৎ এই ঘটনায় কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় নিহতের মা রওশন আরা কবিতা বাদী হয়ে ইউসুফ হায়দার রিফাত, বত্রিশ এলাকার টিটু এবং রাজিবসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে একটি পরিকল্পিত হত্যা মামলা দায়ের করেন। ​মামলা দায়েরের পর থেকেই এক অদ্ভুত নাটকীয়তার সৃষ্টি হয় কিশোরগঞ্জজুড়ে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ ছিল, আসামিরা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য পরিবারকে অবিরত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে। থানা পুলিশ ও স্থানীয় কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও প্রাথমিক তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার নানামুখী অপচেষ্টাও চালানো হয়। ​আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যখন কোনো বিচার মিলছিলো না, তখন মৌ-এর মা রওশন আরা কবিতা এবং তাঁর বোনেরা জেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে সংবাদ সম্মেলন ও রাজপথে তীব্র মানববন্ধনের ডাক দেন। মায়ের বুকফাটা কান্না আর বোনদের আহাজারিতে কেঁপে ওঠে পুরো কিশোরগঞ্জ শহর। অবশেষে বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে মামলার দায়িত্বভার ন্যস্ত করা হয় পুলিশের বিশেষ অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ওপর। ​দায়িত্ব পেয়েই সিআইডির তৎকালীন চৌকস পরিদর্শক মো. শহিদুল ইসলাম খান প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তদন্তে অভাবনীয় মোড় এনে দেন। ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে সদর উপজেলার বৌলাই এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আত্মগোপনে থাকা প্রধান ঘাতক ইউসুফ হায়দার রিফাতকে। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দাদের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে রিফাত। পরের দিন ৪ ফেব্রুয়ারি সে বিজ্ঞ আদালতে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে অত্যন্ত রোমহর্ষক ও হূদয়বিদারক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সে জানায়, কীভাবে সামান্য ক্ষোভ আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের জের ধরে সে মৌকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিল। ​দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি পরিক্রমায় একের পর এক সাক্ষীর জেরা ও আইনি যুক্তিতর্কের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে আজ আদালত এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন। তদন্ত কর্মকর্তা রিফাতসহ মোট ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছিলেন।


​রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের দীর্ঘ আইনি বিতর্ক এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যবেক্ষণ করে বিচারক সুপ্রিয়া রহমান জানান, প্রধান আসামি ইউসুফ হায়দার রিফাতের বিরুদ্ধে মৌকে সরাসরি হত্যার অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে মামলার বাকি ৪ আসামির বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধে জড়িত থাকার অকাট্য কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদেরকে বেকসুর খালাস দেওয়া হলো।


​রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) স্বস্তি প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন, ​"যদিও আমরা আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড আশা করেছিলাম, তবুও দীর্ঘ প্রায় এক দশক পরে হলেও এই রায়ের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে। আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি যে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে, তা অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।"


​রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে তৈরি হয় এক হূদয়বিদারক দৃশ্য। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ও মেয়ের শোকে পাথর হয়ে যাওয়া রওশন আরা কবিতা যখন এজলাস থেকে বের হয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অবিরত অশ্রুধারা। ​সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ​"আমার মেয়েকে ওরা পশুর মতো শ্বাসরোধ করে মেরে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল। দশটি বছর আমি ঘুমাতে পারিনি। প্রতি রাতে মনে হয় মৌ আমাকে ডাকছে। বিচারক রিফাতকে সাজা দিয়েছেন, কিন্তু আমার বুক যে আজীবন খালিই থেকে গেল! যারা খালাস পেল, তাদের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, স্রষ্টার আদালতে তাদের বিচার হবে। আমি শুধু এটুকুই চাই, আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।" ​মৌ-এর বোনদের কণ্ঠেও ছিল একই সাথে স্বস্তি ও বেদনার সুর। তাঁরা বলেন, লড়াইটা খুব সহজ ছিল না। প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, প্রতি পদে পদে হুমকি মাথায় নিয়ে তাঁরা এই লড়াই চালিয়ে গেছেন শুধু তাঁদের প্রিয় বোনের আত্মাকে শান্তি দিতে।


​কিশোরগঞ্জের এই মৌ হত্যা মামলার রায়টি আমাদের সমাজকে একটি চিরন্তন সত্য মনে করিয়ে দেয়—অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন, আইনের দীর্ঘ হাত থেকে তার নিস্তার নেই। হয়তো আজ রিফাতের ফাঁসি হয়নি, তবে কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তার প্রতিটি দিন কাটবে অনুশোচনা আর বন্দিত্বের গ্লানি নিয়ে। স্কুল শিক্ষিকা আতিয়া জাহান মৌ আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না তাঁর স্কুলে, তাঁর শিক্ষার্থীদের মাঝে কিংবা মায়ের স্নেহের আঁচলে। কিন্তু এই রায়ের মাধ্যমে তিনি যে অন্তত ওপারে শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন, সেটাই আজ কিশোরগঞ্জবাসীর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


কিশোরগঞ্জের আলোচিত শিক্ষিকা ‘মৌ’ হত্যায় রিফাতের দণ্ড, ৪ জন বেকসুর খালাস

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬

featured Image

টানা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বয়ে চলা দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটল অবশেষে। কিশোরগঞ্জের সেই বত্রিশ এলাকার বাতাস যেন আজও একটি ছিমছাম তরুণী মেয়ের আকুল আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে। অবশেষে আলোর মুখ দেখল কিশোরগঞ্জের আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও বহুল আলোচিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আতিয়া জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ (২২) হত্যা মামলার বিচার। প্রধান আসামির ভাগ্যে জুটেছে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। একই সঙ্গে দুই লক্ষ টাকার জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।


​আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই ) দুপুরে কিশোরগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিচারক সুপ্রিয়া রহমান কানায় কানায় পূর্ণ এজলাসে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা মামলার একমাত্র সাজাপ্রাপ্ত আসামি ইউসুফ হায়দার রিফাতকে (৩৬) দৃশ্যত বিমর্ষ ও নির্বাক দেখায়। অন্যদিকে মামলা থেকে অপর চার আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।


​কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বত্রিশ এলাকায় ২০১৫ সালের ৬ ও ৭ নভেম্বরের মধ্যবর্তী কালরাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন গোপদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আতিয়া জাহান মৌসুমী ওরফে মৌ। ঘটনার দীর্ঘ এক দশক পর কিশোরগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ ১ম আদালতের বিজ্ঞ বিচারক সুপ্রিয়া রহমান এই মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি, খরমপট্টি এলাকার নাসির উদ্দিন হারুনের ছেলে ইউসুফ হায়দার রিফাতকে (৩৬) যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে; অনাদায়ে তাকে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে অপরাধে সরাসরি জড়িত থাকার অকাট্য প্রমাণ না পাওয়ায় বাকি চার আসামিকে আদালত বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন। মামলাটির সফল তদন্ত সম্পন্ন করেছিল পুলিশ অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), কিশোরগঞ্জ।

​সালটা ছিল ২০১৫। দিনটি ছিল ৬ নভেম্বর। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের বত্রিশ এলাকার নিজ বাসায় পরিবারের সাথে থাকতেন স্বপ্নবাজ তরুণী আতিয়া জাহান মৌ। তিনি পার্শ্ববর্তী মিঠামইন উপজেলার গোপদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও স্নেহভীষণ সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন। তাঁর মিষ্টি ব্যবহার ও শিশুদের প্রতি অপরিসীম মমতা তাঁকে অল্প দিনেই সকলের ভালোবাসার পাত্রে পরিণত করেছিল। ​কিন্তু মানুষের অবয়বে লুকিয়ে থাকা কিছু হিংস্র নেকড়ের কুৎসিত লালসা আর ত্রিভুজ প্রেমের জটিল বেড়াজালে বন্দি হতে হয়েছিল এই প্রাণোচ্ছল মেয়েটিকে। মামলার নথি এবং পরবর্তীতে আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতের কোনো এক সময়ে প্রেমঘটিত কলহ ও বিরোধের জেরে মৌ-এর ঘরে প্রবেশ করে মূল ঘাতক ইউসুফ হায়দার রিফাত। ​কথা কাটাকাটি এবং তীব্র বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে রিফাত ক্ষিপ্ত হয়ে মৌ-এর ওপর চড়াও হয়। নিজের শারীরিক শক্তির দাপটে শ্বাসরোধ করে ও নৃশংসভাবে নির্যাতন চালিয়ে ঘরের মেঝেতেই হত্যা করা হয় মৌকে। যে কণ্ঠ দিয়ে প্রতিদিন সকালে কোমলমতি শিশুরা ‘আমার পণ’ কবিতা আবৃত্তি শুনত, সেই কণ্ঠকে চিরদিনের জন্য নীরব করে দেওয়া হয়েছিল সেই কালরাতেই।

​নিজের অপরাধ ঢাকতে অত্যন্ত চতুরতার আশ্রয় নিয়েছিল ঘাতক রিফাত ও তার সহযোগীরা। হত্যার পর মৌ-এর নিথর দেহটিকে ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সবাই একে একটি সাধারণ ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে ধরে নেয়। এরপর ঘরের মূল দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে রাতের অন্ধকারের সাথে মিশে যায় খুনি। ​পরদিন অর্থাৎ ৭ নভেম্বর দুপুর আড়াইটা নাগাদ ঘরের তালা ভেঙে পুলিশ যখন ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় মৌ-এর লাশ উদ্ধার করে, তখন ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পড়ে ছিল। খাটের উপর ছড়ানো ছিল ধস্তাধস্তির চিহ্ন। এই দৃশ্য দেখে বুক ফেটে আর্তনাদ করে ওঠেন মৌ-এর মা রওশন আরা কবিতা। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর আদরের মেয়ে কোনোভাবেই নিজে থেকে আত্মহত্যা করতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথার, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

​তৎক্ষণাৎ এই ঘটনায় কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় নিহতের মা রওশন আরা কবিতা বাদী হয়ে ইউসুফ হায়দার রিফাত, বত্রিশ এলাকার টিটু এবং রাজিবসহ অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে একটি পরিকল্পিত হত্যা মামলা দায়ের করেন। ​মামলা দায়েরের পর থেকেই এক অদ্ভুত নাটকীয়তার সৃষ্টি হয় কিশোরগঞ্জজুড়ে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ ছিল, আসামিরা স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য পরিবারকে অবিরত প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে। থানা পুলিশ ও স্থানীয় কতিপয় দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তার যোগসাজশে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও প্রাথমিক তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার নানামুখী অপচেষ্টাও চালানো হয়। ​আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যখন কোনো বিচার মিলছিলো না, তখন মৌ-এর মা রওশন আরা কবিতা এবং তাঁর বোনেরা জেলা পাবলিক লাইব্রেরিতে সংবাদ সম্মেলন ও রাজপথে তীব্র মানববন্ধনের ডাক দেন। মায়ের বুকফাটা কান্না আর বোনদের আহাজারিতে কেঁপে ওঠে পুরো কিশোরগঞ্জ শহর। অবশেষে বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে মামলার দায়িত্বভার ন্যস্ত করা হয় পুলিশের বিশেষ অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ওপর। ​দায়িত্ব পেয়েই সিআইডির তৎকালীন চৌকস পরিদর্শক মো. শহিদুল ইসলাম খান প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তদন্তে অভাবনীয় মোড় এনে দেন। ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে সদর উপজেলার বৌলাই এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আত্মগোপনে থাকা প্রধান ঘাতক ইউসুফ হায়দার রিফাতকে। গ্রেপ্তারের পর গোয়েন্দাদের জেরার মুখে ভেঙে পড়ে রিফাত। পরের দিন ৪ ফেব্রুয়ারি সে বিজ্ঞ আদালতে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে অত্যন্ত রোমহর্ষক ও হূদয়বিদারক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সে জানায়, কীভাবে সামান্য ক্ষোভ আর সম্পর্কের টানাপোড়েনের জের ধরে সে মৌকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছিল। ​দীর্ঘ ১০ বছরের আইনি পরিক্রমায় একের পর এক সাক্ষীর জেরা ও আইনি যুক্তিতর্কের চুলচেরা বিশ্লেষণ শেষে আজ আদালত এই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করলেন। তদন্ত কর্মকর্তা রিফাতসহ মোট ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছিলেন।


​রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের দীর্ঘ আইনি বিতর্ক এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যবেক্ষণ করে বিচারক সুপ্রিয়া রহমান জানান, প্রধান আসামি ইউসুফ হায়দার রিফাতের বিরুদ্ধে মৌকে সরাসরি হত্যার অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে মামলার বাকি ৪ আসামির বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধে জড়িত থাকার অকাট্য কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তাঁদেরকে বেকসুর খালাস দেওয়া হলো।


​রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) স্বস্তি প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন, ​"যদিও আমরা আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড আশা করেছিলাম, তবুও দীর্ঘ প্রায় এক দশক পরে হলেও এই রায়ের মাধ্যমে সত্যের জয় হয়েছে। আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি যে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে, তা অপরাধীদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।"


​রায় ঘোষণার পর আদালত চত্বরে তৈরি হয় এক হূদয়বিদারক দৃশ্য। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া ও মেয়ের শোকে পাথর হয়ে যাওয়া রওশন আরা কবিতা যখন এজলাস থেকে বের হয়ে আসছিলেন, তখন তাঁর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অবিরত অশ্রুধারা। ​সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভাঙা গলায় তিনি বলেন, ​"আমার মেয়েকে ওরা পশুর মতো শ্বাসরোধ করে মেরে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল। দশটি বছর আমি ঘুমাতে পারিনি। প্রতি রাতে মনে হয় মৌ আমাকে ডাকছে। বিচারক রিফাতকে সাজা দিয়েছেন, কিন্তু আমার বুক যে আজীবন খালিই থেকে গেল! যারা খালাস পেল, তাদের প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, স্রষ্টার আদালতে তাদের বিচার হবে। আমি শুধু এটুকুই চাই, আর কোনো মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।" ​মৌ-এর বোনদের কণ্ঠেও ছিল একই সাথে স্বস্তি ও বেদনার সুর। তাঁরা বলেন, লড়াইটা খুব সহজ ছিল না। প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, প্রতি পদে পদে হুমকি মাথায় নিয়ে তাঁরা এই লড়াই চালিয়ে গেছেন শুধু তাঁদের প্রিয় বোনের আত্মাকে শান্তি দিতে।


​কিশোরগঞ্জের এই মৌ হত্যা মামলার রায়টি আমাদের সমাজকে একটি চিরন্তন সত্য মনে করিয়ে দেয়—অপরাধী যত চতুরই হোক না কেন, আইনের দীর্ঘ হাত থেকে তার নিস্তার নেই। হয়তো আজ রিফাতের ফাঁসি হয়নি, তবে কারাগারের চার দেয়ালের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তার প্রতিটি দিন কাটবে অনুশোচনা আর বন্দিত্বের গ্লানি নিয়ে। স্কুল শিক্ষিকা আতিয়া জাহান মৌ আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না তাঁর স্কুলে, তাঁর শিক্ষার্থীদের মাঝে কিংবা মায়ের স্নেহের আঁচলে। কিন্তু এই রায়ের মাধ্যমে তিনি যে অন্তত ওপারে শান্তিতে ঘুমোতে পারবেন, সেটাই আজ কিশোরগঞ্জবাসীর সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।



দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ