দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কের চোরগাছা মৌজায় অবস্থিত প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছরের সুলতানি আমলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন সুরা মসজিদ। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে আজ ক্ষয়প্রাপ্ত। মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, প্রাস্টার খসে পড়া এবং টেরাকোটা অলংকরণের ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ১৯৮৫-৮৬ সালে তালিকাভুক্ত হয় ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ। তবে চার দশক পেরিয়েও নিয়মিত সংরক্ষণের অভাব নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বারবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সুলতানি আমলে (১৪৯৩-১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত হয় বলে ধারণা করা হয়।
স্থানীয় বিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, শুধু সময়ের ক্ষয়ই নয়- পরিকল্পিত সংস্কারের চেষ্টাও ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বা প্রাচীন স্থাপনায় আধুনিক নির্মাণ উপকরণের যত্রতত্র ব্যবহার এর মৌলিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীনত্বকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।
সংকটের পাশাপাশি সুরা মসজিদকে ঘিরে রয়েছে বিশাল পর্যটন সম্ভাবনা। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০-৬০০ এবং ছুটির দিনে দেড় থেকে দুই হাজার দর্শনার্থী এখানে আসেন। স্থানীয়দের মতে, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ, তথ্যফলক ও যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুরা মসজিদ আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ঘোড়াঘাটের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
"একই জেলার কান্তজিউ মন্দির নিয়মিত সংরক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো ও কার্যকর প্রচারণার ফলে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অথচ সমান ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সুরা মসজিদ এখনো পর্যাপ্ত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত, ফলে এর বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ বলেন, "এটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও পরিচয় বহন করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন এর সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।" আরেকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বর্ষাকালে দেয়াল বেয়ে পানি ভেতরে ঢোকে, যা স্থাপত্যটির ভীষণ ক্ষতি করছে। কিন্তু এটি নিয়মিত দেখভালের কোনো উদ্যোগ নেই।"
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ রুবানা তানজিন জানান, "মসজিদটির পূর্বে স্থানীয়ভাবে যে কমিটি ছিল, মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বর্তমান সমস্যার মূল কারণ। বর্তমানে কমিটির দায়িত্বে আমরা (উপজেলা প্রশাসন) থাকলেও, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আদালতে মামলা করে রেখেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে আমার কথা হয়েছে, তারা চলতি অর্থবছর থেকেই এর উন্নয়ন কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।"
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভীরুল জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুরা মসজিদের সংরক্ষণ ও উন্নয়নকাজ শুরু হবে। এ প্রকল্পে বাউন্ডারি ওয়াল, সুপ্রেীয় পানির ব্যবস্থা, আধুনিক ওয়াশরুম, বসার স্থানসহ পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘোষিত পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ সংরক্ষণের পাশাপাশি ঘোড়াঘাটে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুলাই ২০২৬
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কের চোরগাছা মৌজায় অবস্থিত প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছরের সুলতানি আমলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন সুরা মসজিদ। ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে আজ ক্ষয়প্রাপ্ত। মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ফাটল, প্রাস্টার খসে পড়া এবং টেরাকোটা অলংকরণের ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ১৯৮৫-৮৬ সালে তালিকাভুক্ত হয় ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ। তবে চার দশক পেরিয়েও নিয়মিত সংরক্ষণের অভাব নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, বারবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সুলতানি আমলে (১৪৯৩-১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত হয় বলে ধারণা করা হয়।
স্থানীয় বিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে, শুধু সময়ের ক্ষয়ই নয়- পরিকল্পিত সংস্কারের চেষ্টাও ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটির জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বা প্রাচীন স্থাপনায় আধুনিক নির্মাণ উপকরণের যত্রতত্র ব্যবহার এর মৌলিক স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও প্রাচীনত্বকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে।
সংকটের পাশাপাশি সুরা মসজিদকে ঘিরে রয়েছে বিশাল পর্যটন সম্ভাবনা। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৫০০-৬০০ এবং ছুটির দিনে দেড় থেকে দুই হাজার দর্শনার্থী এখানে আসেন। স্থানীয়দের মতে, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো, উন্নত যোগাযোগ, তথ্যফলক ও যথাযথ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে সুরা মসজিদ আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়ে ঘোড়াঘাটের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
"একই জেলার কান্তজিউ মন্দির নিয়মিত সংরক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো ও কার্যকর প্রচারণার ফলে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অথচ সমান ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সুরা মসজিদ এখনো পর্যাপ্ত উন্নয়ন ও সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত, ফলে এর বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা পারভেজ বলেন, "এটি আমাদের এলাকার ঐতিহ্য ও পরিচয় বহন করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন এর সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।" আরেকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বর্ষাকালে দেয়াল বেয়ে পানি ভেতরে ঢোকে, যা স্থাপত্যটির ভীষণ ক্ষতি করছে। কিন্তু এটি নিয়মিত দেখভালের কোনো উদ্যোগ নেই।"
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজ রুবানা তানজিন জানান, "মসজিদটির পূর্বে স্থানীয়ভাবে যে কমিটি ছিল, মূলত তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই বর্তমান সমস্যার মূল কারণ। বর্তমানে কমিটির দায়িত্বে আমরা (উপজেলা প্রশাসন) থাকলেও, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা আদালতে মামলা করে রেখেছে বলে জানতে পেরেছি। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাথে আমার কথা হয়েছে, তারা চলতি অর্থবছর থেকেই এর উন্নয়ন কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।"
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভীরুল জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সুরা মসজিদের সংরক্ষণ ও উন্নয়নকাজ শুরু হবে। এ প্রকল্পে বাউন্ডারি ওয়াল, সুপ্রেীয় পানির ব্যবস্থা, আধুনিক ওয়াশরুম, বসার স্থানসহ পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঘোষিত পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়িত হলে ঐতিহাসিক সুরা মসজিদ সংরক্ষণের পাশাপাশি ঘোড়াঘাটে পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

আপনার মতামত লিখুন