কর্মমুখী ব্যস্ত সকাল, ঘড়ির কাঁটায় তখন ছুটছে গন্তব্যের তাগিদ, আর ঠিক তখনই আকস্মিক এক অচলাবস্থা থমকে দিল হাজারো মানুষের স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ। সড়ক আছে, টার্মিনালে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে চার চাকার চকচকে যানবাহন, অথচ চালকের আসনে কেউ নেই, নেই চাকা ঘোরার কোনো তাড়া। পরিবহন মালিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মতানৈক্য আর চাঁদাবাজির অভিযোগের বলিকাঁঠামায় পরিণত হয়ে পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে পড়েছে কিশোরগঞ্জ-মহাখালী রুট। আজ রবিবার সকাল থেকে এই দূরপাল্লার রুটে হুট করে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী, প্রতিদিনের কর্মজীবী মানুষ, রোগী এবং রাজধানীমুখী শিক্ষার্থীরা। কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকার মহাখালীগামী কোনো বাস যেমন ছেড়ে যায়নি, তেমনি মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকেও কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে কোনো পরিবহন যাত্রা করেনি। এতে করে কিশোরগঞ্জ ও মহাখালী—উভয় প্রান্তের বাস টার্মিনালে তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, যেখানে ক্ষোভ, হতাশা আর অপেক্ষার এক করুণ সুর বাজছে।
সাধারণত ভোর থেকেই কিশোরগঞ্জ বাস টার্মিনাল এবং কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া বা পার্শ্ববর্তী স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকে। কেউ জরুরি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কাজে রাজধানী ছোটেন, কেউবা স্বজন নিয়ে ছোটেন ঢাকার কোনো হাসপাতালের উদ্দেশ্যে, আবার কেউ সপ্তাহের শুরুতে কর্মস্থলে ফেরার তাড়ায় বাস টার্মিনালমুখী হন। কিন্তু আজ রবিবার সকালে টার্মিনালে পা রাখতেই যাত্রীদের মুখোমুখি হতে হয় এক চরম বাস্তবতার। দূরপাল্লার কাউন্টারগুলোর ঝাঁপ বন্ধ, মাইকে নেই কোনো রুটের হাকডাক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাগ-ল্যাগেজ হাতে নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণতে দেখা গেছে শত শত অসহায় মানুষকে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। তীব্র গরমের মাঝে দীর্ঘ সময় টার্মিনালে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকে অসুস্থ বোধ করছেন। চিকিৎসার প্রয়োজনে যেসব পরিবার ঢাকার হাসপাতালে পৌঁছানোর জরুরি তাগিদ নিয়ে বেরিয়েছিলেন, বাস না পেয়ে তাদের চোখে মুখে ফুটে উঠেছে চরম ব্যাকুলতা ও অসহায়ত্বের ছাপ। পরিবহন ধর্মঘট বা আকস্মিক বাস বন্ধের কোনো পূর্বঘোষণা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা টার্মিনালে এসে পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন।
হঠাৎ করেই বৃহৎ এই রুটে গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণীর ছোট ছোট যানবাহনের চালক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের পোয়াবারো অবস্থা তৈরি হয়েছে। মূল সড়কের এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে না পেরে নিরুপায় যাত্রীরা এখন বাধ্য হয়ে ছুটছেন বিকল্প যানবাহনের খোঁজে। সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা ও ছোটখাটো বিভিন্ন হিউম্যান হলারে করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন অনেকে। আর এই সুযোগে সিএনজি ও ছোট যানবাহনের চালকরা গুণছেন বাড়তি ভাড়ার আনন্দ। স্বাভাবিক সময়ের ভাড়ার চেয়ে দ্বিগুণ, এমনকি তিনগুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ হাঁকানো হচ্ছে। সামান্য পথ পাড়ি দিতেই সাধারণ মানুষের পকেট খালি হওয়ার উপক্রম। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েও মিলছে না বিকল্প কোনো যান। ফলে রাজপথের পাশে ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা একটু জায়গার জন্য ছোট যানগুলোর পেছনে ছোটাছুটি করা মানুষের লাইন ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। যা কেবল ভৌত কোনো সমস্যা নয়, বরং খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামকে আরও বেশি অনিশ্চিত ও কষ্টকর করে তুলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ-মহাখালী রুটের এই পরিবহন সংকট হুট করে একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে পরিবহন মালিক সমিতিগুলোর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং নিয়ন্ত্রণ দখলের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। এই জনপ্রিয় রুটে নিয়মিতভাবে জলসিঁড়ি, অনন্যা, অনন্যা ক্লাসিক ও উজানভাটিসহ মোট পাঁচটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির শতাধিক দূরপাল্লার বাস প্রতিদিন যাতায়াত করে। কিশোরগঞ্জ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই বাসগুলোতে চেপে রাজধানীতে যাতায়াত করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রীসেবা মান উন্নয়ন, নতুন বাস নামানো এবং পুরাতন বাস চালানোকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সাথে ঢাকার মহাখালী টার্মিনাল মালিক সমিতির অভ্যন্তরীণ চরম মতানৈক্য চলছিল। কিশোরগঞ্জের মালিকপক্ষ চাচ্ছিল প্রতিযোগিতামূলক বাজারে যাত্রীদের উন্নত, দ্রুত ও আরামদায়ক সেবা নিশ্চিত করতে নতুন আধুনিক প্রযুক্তির বাস বহরে যুক্ত করতে। কিন্তু মহাখালী টার্মিনালের প্রভাবশালী একটি পক্ষ জোরপূর্বক তাদের পুরোনো, জরাজীর্ণ বাসগুলো এই সুনির্দিষ্ট পরিবহনে সংযোজন করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। এই মতানৈক্য ও অনড় অবস্থান শেষ পর্যন্ত সংঘাতমূলক পর্যায়ে রূপ নেয় এবং শনিবার সন্ধ্যা থেকেই এই রুটে বাস চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জ পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এই কোন্দল ও অচলাবস্থার পেছনের থলের বেড়াল বেরিয়ে আসে। কিশোরগঞ্জ পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মুরাদ রেজা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কিশোরগঞ্জ থেকে মহাখালী রুটে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর শতাধিক বাস নিয়ম মেনে চলাচল করে আসছিল। কিন্তু মহাখালী বাস টার্মিনালে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সক্রিয় থেকে নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে অবাধে চাঁদাবাজি চালিয়ে আসছে। প্রতিটি গাড়ির গন্তব্য ও রুট নিয়ন্ত্রণের নামে সাধারণ পরিবহন মালিকদের ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যার চরম পরিণতিতেই আজ বাধ্য হয়ে সকল বাস চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। একই সুরে সুর মিলিয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক মো. আনিছুজ্জামান বাবুল বলেন, যাত্রীদের উন্নত সেবা নিশ্চিত করার মহান লক্ষ্য নিয়ে আমরা কিশোরগঞ্জের অনন্যা পরিবহনে বেশ কিছু একদম নতুন, মানসম্মত ও আধুনিক সুবিধা সংবলিত গাড়ি সংযোজন করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু মহাখালী টার্মিনালে অবস্থানরত কতিপয় প্রভাবশালী লোক জোর জবরদস্তি করে তাদের মেয়াদোত্তীর্ণ ও পুরোনো জরাজীর্ণ গাড়িগুলো আমাদের সুনির্দিষ্ট পরিবহনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসছিল। শুধু তাই নয়, অন্যায্য শর্ত না মানলে প্রতিটি গাড়িতে অতিরিক্ত টাকা দাবি বা চাঁদাবাজি করা হতো এবং সামান্যতম কোনো অজুহাত পেলেই মনগড়া সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউন্টার বন্ধ করে দিয়ে আমাদের হয়রানি করা হতো। এই অন্যায্য হস্তক্ষেপ এবং যাত্রীসেবা ব্যাহত করার চক্রান্তের প্রতিবাদেই সাময়িকভাবে বাস চলাচল বন্ধ রাখা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না।
অচলাবস্থার গভীরতা এবং সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় কষ্ট অনুধাবন করে স্থানীয় রাজনৈতিক অভিভাবক ও জনপ্রতিনিধিরা ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিরসনে উদ্যোগী হয়েছেন। পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর এই টানাপোড়েনে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে পুরো জেলাবাসী। উদ্ভূত এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি ও সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম আশার আলো ছড়িয়ে জানিয়েছেন, যাত্রী ভোগান্তি কমানো এবং এই সংকটময় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে দুই পক্ষের মালিক সমিতি ও শ্রমিক নেতাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। একটি ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব ধরনের ভেদাভেদ ও দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে মহাখালী রুটে আগের মতো বাস চলাচল স্বাভাবিক করার জোরালো চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
যেকোনো গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রাণ হলো তার সাধারণ যাত্রীরা। কিন্তু পরিবহন মালিকদের ক্ষমতার দাপট, টার্মিনালভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার আর অন্যায্য চাঁদাবাজির রেষারেষিতে যদি বারবার এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি হতে হয়, তবে তা একটি সুস্থ ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। দীর্ঘদিনের এই রুটভিত্তিক কোন্দল সাময়িক আপস-রফায় শেষ না করে স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটা এখন সময়ের দাবি। যাত্রীসাধারণের ভোগান্তি লাঘবে অবিলম্বে প্রশাসন, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতাদের ত্রিপক্ষীয় কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে এই অচলাবস্থা নিরসন করে দ্রুত রাজপথে চাকা সচল করার কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের একটাই আকুল দাবি—ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে দ্রুত চালু হোক কিশোরগঞ্জ-মহাখালী রুটের দূরপাল্লার বাস, ফিরে আসুক স্বাভাবিক জনজীবন।








