সংবাদ প্রকাশের পর শোকজ পরে মান্দায় বদলি সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সাংবাদিককে আর্থিক সুবিধা দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টাসহ নানা অভিযোগ নিয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর তাঁকে মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়েছে। এরই মধ্যে এসব অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় দুই সাংবাদিককে লক্ষ্য করে ফেক ফেসবুক আইডি থেকে মানহানিকর ও আপত্তিকর পোস্ট, এআই ব্যবহার করে তৈরি আপত্তিকর কনটেন্ট প্রকাশ এবং হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, ভূমি অফিসের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার শুরু হয়। সাংবাদিক কামরুল হাসান জীবন ও মো. সবুজ হোসেনকে লক্ষ্য করে একাধিক ফেক ফেসবুক আইডি থেকে মানহানিকর ও আপত্তিকর পোস্ট করা হয়েছে। এমনকি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
তাঁদের দাবি, অপপ্রচার শুধু পেশাগত কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় টেনে এনে হেয়প্রতিপন্ন করা, ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে মানসিক চাপ সৃষ্টি এবং সাংবাদিকতার কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।এ ঘটনায় নওগাঁ সদর থানায় প্রাথমিকভাবে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা। তবে তাঁদের অভিযোগ, জিডির পরও এখন পর্যন্ত ফেক আইডিগুলোর নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা শনাক্ত করে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে দাবি তাঁদের।এর আগে আহসানগঞ্জ-শাহাগোলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী তহশিলদার মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, সরকারি সেবার বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দালালদের দৌরাত্ম্য ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ নিয়ে জাতীয় দৈনিক মুক্ত খবর ও মাল্টিমিডিয়া উন্নয়নে বাংলাদেশে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁকে শোকজ করা হয় এবং আত্রাই থেকে মান্দা উপজেলার নুরুল্লাবাদ ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে নওগাঁ, একাধিক বাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ জমির মালিকানার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের পরিমাণ, সম্পদের উৎস এবং বৈধ আয়ের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সম্পদের দলিল, আয়কর নথি, চাকরিসংক্রান্ত কাগজপত্র ও আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক মো. সবুজ হোসেন। এ বিষয়ে তিনি নওগাঁ জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, কর্মকর্তার পক্ষে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য তাঁকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন এবং আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ-সংক্রান্ত ফোনকল, বার্তা ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষিত রয়েছে বলেও দাবি করেছেন অভিযোগকারী।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমানের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফেক আইডি থেকে অপপ্রচার ও হুমকির নেপথ্যে কারা রয়েছেন, সেটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে তদন্তের আগে কোনো ব্যক্তি বা পক্ষকে এসব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করার সুযোগ নেই।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের ভাষ্য, ভয়ভীতি, হুমকি ও ব্যক্তিগত আক্রমণের কারণে তাঁরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকলেও পেশাগত দায়িত্ব থেকে সরে যাবেন না। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান এবং সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখবেন তাঁরা।
তাঁদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত সংশ্লিষ্ট ফেক ফেসবুক আইডিগুলো শনাক্ত করে নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় বের করুক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কাউকে হুমকি, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা মানহানিকর ও আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা উদ্বেগজনক। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ নাগরিকও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অন্যদিকে, মোস্তাফিজুর রহমানকে অন্য একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিভাগীয় তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা কী, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শুধু বদলিকে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ কিংবা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে সেটিও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ, সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাই, দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফেক আইডি ব্যবহার করে হুমকি ও অপপ্রচারের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হোক।
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং বিভাগীয় তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি জানা গেলে প্রতিবেদনে তা সংযোজন করা হবে।








