সারাদেশ

ইতালির পথে গিয়ে লিবিয়ায় নিখোঁজ সাইদুল, ৩৯ লাখ টাকা খরচে নিঃস্ব পরিবার

ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন মাদারীপুরের সাইদুল বেপারী। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানোর বদলে তিনি লিবিয়ায় আটকা পড়েন বলে অভিযোগ পরিবারের।

⎙ প্রিন্ট
ইতালির পথে গিয়ে লিবিয়ায় নিখোঁজ সাইদুল, ৩৯ লাখ টাকা খরচে নিঃস্ব পরিবার
ইতালির পথে গিয়ে লিবিয়ায় নিখোঁজ সাইদুল, ৩৯ লাখ টাকা খরচে নিঃস্ব পরিবার




ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন মাদারীপুরের সাইদুল বেপারী। কিন্তু ইউরোপে পৌঁছানোর বদলে তিনি লিবিয়ায় আটকা পড়েন বলে অভিযোগ পরিবারের। গত দুই মাস ধরে তার কোনো খোঁজ না থাকায় চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন স্বজনরা। অন্যদিকে বিদেশ পাঠানোর প্রক্রিয়ায় জমিজমা বিক্রি, ধারদেনা ও বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা হারিয়ে এখন আর্থিক সংকটে পড়েছে পরিবারটি।

মাদারীপুর সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ঘটকচর দত্তের হাট এলাকার বাসিন্দা সাইদুল বেপারীর বয়স ৩২ বছর। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়লেও শেষ পর্যন্ত তাকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। এরপর থেকে নানা পর্যায়ে অর্থ দাবি ও আদায়ের পর প্রায় দুই মাস ধরে তার সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সাইদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো পরিবারজুড়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার ছাপ। ছেলের অপেক্ষায় আছেন মা সূর্যবান বেগম। স্বামীর খোঁজে দিন গুনছেন স্ত্রী মেরি আক্তার। বাবার কথা জানতে চায় চার বছরের মেয়ে। আর কোলে রয়েছে ১১ মাস বয়সী আরেক সন্তান।

সাইদুলের মা সূর্যবান বেগম বলেন, তার ছেলে কোথায় আছেন বা কী অবস্থায় আছেন, সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। প্রতিদিনই তিনি ছেলের ফিরে আসার আশায় থাকেন এবং দ্রুত তাকে জীবিত ও নিরাপদ অবস্থায় দেশে ফেরত চান।

পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে পরিচিত আনোয়ার ফরাজীর মাধ্যমে সাইদুলকে ইতালিতে পাঠানোর কথা হয়। এ জন্য ২৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল বলে দাবি স্বজনদের। ২০২৫ সালের ৬ মে প্রথমে ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। পরে ৯ জুন শ্রীলঙ্কা ও দুবাই হয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সাইদুলকে লিবিয়ায় পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

স্বজনদের দাবি, লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সাইদুল একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যান। পরে ভয়ভীতি ও নির্যাতনের আশঙ্কা দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিবারের কাছ থেকে আরও অর্থ নেওয়া হয়। ব্যাংক হিসাবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর পর মোট ব্যয় প্রায় ৩৯ লাখ টাকায় পৌঁছায় বলে তাদের দাবি।

এরপর প্রায় দুই মাস ধরে সাইদুলের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই।

সাইদুলের স্ত্রী মেরি আক্তার বলেন, তাদের ছোট মেয়ে প্রায়ই বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কিন্তু এখন আর ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালানো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি গভীর অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, সাইদুলকে বিদেশে পাঠানোর জন্য জমি ও ঘরের বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি ধারদেনাও করতে হয়েছে। এখন সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেও তারা অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

সাইদুলের ভাই মাহিদুল বেপারী অভিযোগ করেন, ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে তার ভাইকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে একটি অপরাধী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। ভাইয়ের সন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান মাহিদুল।

এ ঘটনায় গত ১১ সেপ্টেম্বর সাইদুলের বড় ভাই সামাদ হোসেন বাদী হয়ে মাদারীপুরের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। মামলায় আনোয়ার ফরাজী, শিল্পী আক্তার, বাদল জমাদ্দার, সাহেব আলী জমাদ্দার, মামুন বেপারী, ইভা বেগম ও ছলে বেগমসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে আনোয়ার ফরাজী ওরফে আনো ফরাজী টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তিনি সাইদুলের পরিবারের কাছ থেকে কোনো অর্থ নেননি।

তবে আনোয়ার ফরাজীর স্ত্রী শিল্পী আক্তার পরিবারের কাছ থেকে ১৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল বলে স্বীকার করেছেন।

মাদারীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, সাইদুল নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে বলে তারা জেনেছেন। আদালতের নির্দেশনা থানায় পৌঁছালে নিয়ম অনুযায়ী মামলা নথিভুক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাইদুলের পরিবারের দাবি, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত তার অবস্থান শনাক্ত করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিক। একই সঙ্গে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সম্পর্কিত সংবাদ