ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

১১ নারী হত্যার পরও দেড় যুগ ধরে ঝুলে আছে রসু খাঁর বিচার


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২২ মে ২০২৬

১১ নারী হত্যার পরও দেড় যুগ ধরে ঝুলে আছে রসু খাঁর বিচার

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় যখন দেশজুড়ে ক্ষোভ ও শোক বিরাজ করছে, তখন আবারও সামনে এসেছে দেশে ধর্ষণ ও নারী হত্যার মামলাগুলোর দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে তদন্ত, বিচার ও সাজা কার্যকরে বছরের পর বছর বিলম্ব নিয়ে।

গত বছর আলোচিত আছিয়া হত্যা মামলারও এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আট বছর বয়সী শিশুটি ধর্ষণের শিকার হওয়ার আট দিন পর মারা যায়। পরে অভিযুক্ত হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হলেও মামলাটি এখনো আপিলে ঝুলে আছে।

এমন বাস্তবতায় আবার আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম আলোচিত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁর নাম। ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তারের প্রায় দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো তার বিচার পুরোপুরি শেষ হয়নি। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে রয়েছেন।

২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ টঙ্গিতে মসজিদের ফ্যান চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে তার বিরুদ্ধে ৯টি হত্যা মামলা ও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আরও একটি মামলাসহ মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নিহত নারীদের বেশিরভাগের পরিচয় নিশ্চিত করা না যাওয়ায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়। ২০০৯ সালে পোশাকশ্রমিক পারভীনকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ২০১৮ সালের ৬ মার্চ চাঁদপুর আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আপিলের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে এখনো সাজা কার্যকর হয়নি।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২০ জুলাই রাতে ফরিদগঞ্জের হাসা খালের দক্ষিণ পাশে পারভীনকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরদিন পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।

গ্রেপ্তারের পর রসু খাঁ পুলিশকে জানান, প্রেমে ব্যর্থতা থেকেই তিনি ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করতেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, ১০১ জন নারীকে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল তার।

রসু খাঁর দাবি অনুযায়ী, টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কের ঘটনায় গণপিটুনির শিকার হওয়ার পরই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর ২০০৭ সালে শ্যালকের স্ত্রী রীনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। পরে চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকায় আরও অন্তত ১০ নারীকে হত্যা করেন তিনি। নিহতদের সবাই ছিলেন পোশাকশ্রমিক এবং বয়স ছিল ১৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন চলতি বছরের শুরুতে জানান, রসু খাঁকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুরে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি ফাঁসির সেলে আছেন। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্বজন তাকে দেখতে আসেননি।

নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক গবেষক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুন বলেন, দ্রুত বিচার ও সাজা কার্যকর না হওয়াই এ ধরনের অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। তার মতে, অপরাধীরা যদি নিশ্চিত ও দ্রুত শাস্তির ভয় অনুভব করত, তাহলে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসত।

তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচারপ্রাপ্তির হার এখনো হতাশাজনক। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা আপসের মাধ্যমে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগী পরিবারকে আরও দুর্বল ও আতঙ্কিত করে তোলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, আলোচিত ঘটনার পর গণমাধ্যম ও সমাজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সেই চাপ কমে যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


১১ নারী হত্যার পরও দেড় যুগ ধরে ঝুলে আছে রসু খাঁর বিচার

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় যখন দেশজুড়ে ক্ষোভ ও শোক বিরাজ করছে, তখন আবারও সামনে এসেছে দেশে ধর্ষণ ও নারী হত্যার মামলাগুলোর দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে তদন্ত, বিচার ও সাজা কার্যকরে বছরের পর বছর বিলম্ব নিয়ে।

গত বছর আলোচিত আছিয়া হত্যা মামলারও এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আট বছর বয়সী শিশুটি ধর্ষণের শিকার হওয়ার আট দিন পর মারা যায়। পরে অভিযুক্ত হিটু শেখের মৃত্যুদণ্ড হলেও মামলাটি এখনো আপিলে ঝুলে আছে।

এমন বাস্তবতায় আবার আলোচনায় এসেছে দেশের অন্যতম আলোচিত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান ওরফে রসু খাঁর নাম। ১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তারের প্রায় দেড় যুগ পেরিয়ে গেলেও এখনো তার বিচার পুরোপুরি শেষ হয়নি। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির সেলে রয়েছেন।

২০০৯ সালের ৭ অক্টোবর চাঁদপুর সদরের মদনা গ্রামের বাসিন্দা রসু খাঁ টঙ্গিতে মসজিদের ফ্যান চুরির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি একে একে ১১ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেন। পরে তার বিরুদ্ধে ৯টি হত্যা মামলা ও নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আরও একটি মামলাসহ মোট ১০টি মামলা দায়ের করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, নিহত নারীদের বেশিরভাগের পরিচয় নিশ্চিত করা না যাওয়ায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়। ২০০৯ সালে পোশাকশ্রমিক পারভীনকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় ২০১৮ সালের ৬ মার্চ চাঁদপুর আদালত রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে আপিলের শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই হাইকোর্ট সেই মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে এখনো সাজা কার্যকর হয়নি।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২০ জুলাই রাতে ফরিদগঞ্জের হাসা খালের দক্ষিণ পাশে পারভীনকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরদিন পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।

গ্রেপ্তারের পর রসু খাঁ পুলিশকে জানান, প্রেমে ব্যর্থতা থেকেই তিনি ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। প্রেমের অভিনয় ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করতেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, ১০১ জন নারীকে হত্যার পরিকল্পনাও ছিল তার।

রসু খাঁর দাবি অনুযায়ী, টঙ্গীতে এক নারী পোশাকশ্রমিকের সঙ্গে সম্পর্কের ঘটনায় গণপিটুনির শিকার হওয়ার পরই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন তিনি। এরপর ২০০৭ সালে শ্যালকের স্ত্রী রীনাকে হত্যার মধ্য দিয়ে তার হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। পরে চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকায় আরও অন্তত ১০ নারীকে হত্যা করেন তিনি। নিহতদের সবাই ছিলেন পোশাকশ্রমিক এবং বয়স ছিল ১৬ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক আবদুল্লাহ আল মামুন চলতি বছরের শুরুতে জানান, রসু খাঁকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কাশিমপুরে আনা হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি ফাঁসির সেলে আছেন। কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শারীরিকভাবে সুস্থ রয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্বজন তাকে দেখতে আসেননি।

নারী ও শিশু নির্যাতনবিষয়ক গবেষক এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোছা. নুরজাহান খাতুন বলেন, দ্রুত বিচার ও সাজা কার্যকর না হওয়াই এ ধরনের অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ। তার মতে, অপরাধীরা যদি নিশ্চিত ও দ্রুত শাস্তির ভয় অনুভব করত, তাহলে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসত।

তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় বিচারপ্রাপ্তির হার এখনো হতাশাজনক। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ বা আপসের মাধ্যমে ঘটনাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়। বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা ভুক্তভোগী পরিবারকে আরও দুর্বল ও আতঙ্কিত করে তোলে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, আলোচিত ঘটনার পর গণমাধ্যম ও সমাজের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া থাকলেও বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সেই চাপ কমে যায়। ফলে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ