বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আজ। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টর চুল্লিতে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি স্থাপন শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশের পথে বড় একটি মাইলফলক অতিক্রম করছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণ ও প্রস্তুতি পর্যায় অতিক্রম করেছে। নানা বৈশ্বিক সংকট, করোনা মহামারি, সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও প্রকল্পের অগ্রগতি থেমে থাকেনি। এখন কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে।
রূপপুর প্রকল্পে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে আজ জ্বালানি স্থাপন শুরু হলেও দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া চালুর জন্য মোট ১৬৩টি ইউরেনিয়াম ফুয়েল বান্ডেল প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ আগে থেকেই ১৬৮টি বান্ডেল সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে পাঁচটি সংরক্ষিত থাকবে। প্রতিটি বান্ডেলে একাধিক জ্বালানি রড রয়েছে, যেগুলো নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ধাপে ধাপে রিয়্যাক্টরে স্থাপন করা হবে।
ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক ফুয়েলিং শুরুর পর প্রাথমিক ধাপ শেষ করতে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরপর শুরু হবে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে রিয়্যাক্টর চালুর প্রস্তুতি।
চুল্লিতে ইউরেনিয়াম স্থাপনের পর নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে, আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর থেকে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। শুরুতে সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, পরে ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়া হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। আর আগামী আগস্টের মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক সরবরাহে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের অনুমতি পাওয়া মানে কেন্দ্রটির নন-নিউক্লিয়ার সব অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন থেকে মূল পারমাণবিক কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এর পরও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ধাপ বাকি রয়েছে।
রূপপুর কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে স্বয়ংক্রিয় কোর ক্যাচার, বহুমাত্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল নকশা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় সক্ষম।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, গ্যাস সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পূর্ণমাত্রায় চালু হলে কেন্দ্রটির দুই ইউনিট থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, যা দেশের শিল্প, কৃষি ও নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আজ। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের রিয়্যাক্টর চুল্লিতে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম জ্বালানি স্থাপন শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশের পথে বড় একটি মাইলফলক অতিক্রম করছে।
পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্মাণ ও প্রস্তুতি পর্যায় অতিক্রম করেছে। নানা বৈশ্বিক সংকট, করোনা মহামারি, সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও প্রকল্পের অগ্রগতি থেমে থাকেনি। এখন কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে।
রূপপুর প্রকল্পে তৃতীয় প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি ইউনিট নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে আজ জ্বালানি স্থাপন শুরু হলেও দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে পারমাণবিক বিক্রিয়া চালুর জন্য মোট ১৬৩টি ইউরেনিয়াম ফুয়েল বান্ডেল প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ আগে থেকেই ১৬৮টি বান্ডেল সংগ্রহ করেছে, যার মধ্যে পাঁচটি সংরক্ষিত থাকবে। প্রতিটি বান্ডেলে একাধিক জ্বালানি রড রয়েছে, যেগুলো নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ধাপে ধাপে রিয়্যাক্টরে স্থাপন করা হবে।
ফুয়েল লোডিং বা জ্বালানি স্থাপন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক ফুয়েলিং শুরুর পর প্রাথমিক ধাপ শেষ করতে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরপর শুরু হবে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং ধাপে ধাপে রিয়্যাক্টর চালুর প্রস্তুতি।
চুল্লিতে ইউরেনিয়াম স্থাপনের পর নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ উৎপন্ন হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরাবে, আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর থেকে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। শুরুতে সীমিত সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, পরে ধাপে ধাপে পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়া হবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হতে পারে। আর আগামী আগস্টের মধ্যে পরীক্ষামূলক উৎপাদন থেকে বাণিজ্যিক সরবরাহে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের অনুমতি পাওয়া মানে কেন্দ্রটির নন-নিউক্লিয়ার সব অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এখন থেকে মূল পারমাণবিক কার্যক্রম শুরু হবে। তবে এর পরও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ধাপ বাকি রয়েছে।
রূপপুর কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে স্বয়ংক্রিয় কোর ক্যাচার, বহুমাত্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনশীল নকশা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, এটি উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় সক্ষম।
বাংলাদেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, গ্যাস সংকট এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পূর্ণমাত্রায় চালু হলে কেন্দ্রটির দুই ইউনিট থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, যা দেশের শিল্প, কৃষি ও নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আপনার মতামত লিখুন