প্রায় দুই মাসের সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও একাধিক মৌলিক ইস্যুতে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণসহ কয়েকটি কঠোর শর্ত সামনে এনে তেহরান আলোচনার গতি ধীর করে দিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করুক। ওয়াশিংটনের দাবি, ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে সীমিত করতে হবে। তবে ইরান এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছে।
তেহরান বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ থাকলে তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতে পারে, স্থায়ীভাবে নয়। ইরানের মতে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে এবং তা পুরোপুরি ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না।
আরেকটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযোগ, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চাইছে, এই মজুত যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে দেওয়া হোক বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হোক।
কিন্তু তেহরান এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেছে। ইরান বলছে, জাতীয় সম্পদ বা কৌশলগত উপাদান বিদেশি শক্তির কাছে হস্তান্তর করা হবে না। ফলে এ ইস্যুতেও আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও বন্দর অবরোধ প্রশ্নেও দুই পক্ষের অবস্থান বিপরীতমুখী। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সমঝোতার আগে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না। ফলে অর্থনৈতিক চাপ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
ইরান আলোচনায় বিদেশে আটকে থাকা নিজেদের সম্পদ ফেরতের দাবিও তুলেছে। তেহরানের দাবি, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার দ্রুত ফেরত দিতে হবে। তারা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দ অর্থ মুক্ত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত দাবি এসেছে যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য দুই দেশকে মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই অঙ্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এসব শর্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তাও বহন করছে। তেহরান আলোচনায় দুর্বল অবস্থানে নেই—এটি দেখাতে চাইছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো ছাড় না দিতে।
ফলে আলোচনা শুরু হলেও দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। দুই পক্ষের অবস্থান নরম না হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
#আর
বিষয় : ইরান যুক্তরাষ্ট্র

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রায় দুই মাসের সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও একাধিক মৌলিক ইস্যুতে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। পারমাণবিক কর্মসূচি, অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ সম্পদ ফেরত এবং যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণসহ কয়েকটি কঠোর শর্ত সামনে এনে তেহরান আলোচনার গতি ধীর করে দিয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করুক। ওয়াশিংটনের দাবি, ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা স্থায়ীভাবে সীমিত করতে হবে। তবে ইরান এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছে।
তেহরান বলছে, পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধে কোনো ধরনের বিধিনিষেধ থাকলে তা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হতে পারে, স্থায়ীভাবে নয়। ইরানের মতে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে এবং তা পুরোপুরি ত্যাগ করার প্রশ্নই আসে না।
আরেকটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অভিযোগ, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন চাইছে, এই মজুত যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে দেওয়া হোক বা আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হোক।
কিন্তু তেহরান এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করেছে। ইরান বলছে, জাতীয় সম্পদ বা কৌশলগত উপাদান বিদেশি শক্তির কাছে হস্তান্তর করা হবে না। ফলে এ ইস্যুতেও আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও বন্দর অবরোধ প্রশ্নেও দুই পক্ষের অবস্থান বিপরীতমুখী। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ বহাল থাকবে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি সরবরাহ হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সমঝোতার আগে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে না। ফলে অর্থনৈতিক চাপ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা—দুই দিক থেকেই উত্তেজনা বজায় রয়েছে।
ইরান আলোচনায় বিদেশে আটকে থাকা নিজেদের সম্পদ ফেরতের দাবিও তুলেছে। তেহরানের দাবি, বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আটকে থাকা প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার দ্রুত ফেরত দিতে হবে। তারা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তির অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দ অর্থ মুক্ত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত দাবি এসেছে যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে। ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় দেশটির যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য দুই দেশকে মোট ২৭০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই অঙ্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এসব শর্ত কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তাও বহন করছে। তেহরান আলোচনায় দুর্বল অবস্থানে নেই—এটি দেখাতে চাইছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো ছাড় না দিতে।
ফলে আলোচনা শুরু হলেও দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। দুই পক্ষের অবস্থান নরম না হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
#আর

আপনার মতামত লিখুন