দুবাই, ২১ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য নতুন দফার আলোচনা ঘিরে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যদি শুধু হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সীমিত নিয়ন্ত্রণে আটকে যায়, তাহলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সম্ভাব্য পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিষয় পর্যাপ্ত গুরুত্ব নাও পেতে পারে। বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েই বেশি জোর দেওয়া হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়ে।
উপসাগরীয় সূত্রগুলোর মতে, আগে হরমুজ প্রণালি ছিল সামরিক উত্তেজনার একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র। এখন তা আলোচনার প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এতে ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করার সুযোগ পাচ্ছে।
একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, শেষ পর্যন্ত হরমুজই এখন ‘রেড লাইন’। আগে এটি ছিল পার্শ্ববর্তী ইস্যু, এখন সেটিই মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এতে আলোচনার লক্ষ্যই বদলে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগ হলো— ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা সরাসরি তাদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। একই সঙ্গে ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাও দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সম্ভাব্য আলোচনায় এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রধান এবতিসাম আল-কেতবি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো ঐতিহাসিক সমাধানের ইঙ্গিত দেয় না, বরং দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের কাঠামো তৈরি করছে। তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি গোষ্ঠী এবং হরমুজ—সব ইস্যুকে একসঙ্গে বিবেচনায় না আনলে কোনো চুক্তিই টেকসই হবে না।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে পড়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের অতিরিক্ত খরচে দেশগুলো চাপের মুখে পড়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বদলে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মত হলো, ইরানের আচরণ পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ ছাড়া বড় ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।
এদিকে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় নেতারা স্বীকার করছেন, মার্কিন সামরিক সক্ষমতা এখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ। থাড ও প্যাট্রিয়টের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসন্তোষও বাড়ছে।
দুবাইভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বহুথ-এর পরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি মাত্র বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
উপসাগরীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক ঝুঁকিও তৈরি করবে। কারণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
#আর
বিষয় : ইরান যুক্তরাষ্ট্র

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
দুবাই, ২১ এপ্রিল: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য নতুন দফার আলোচনা ঘিরে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু যদি শুধু হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সীমিত নিয়ন্ত্রণে আটকে যায়, তাহলে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে সম্ভাব্য পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিষয় পর্যাপ্ত গুরুত্ব নাও পেতে পারে। বরং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়েই বেশি জোর দেওয়া হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথগুলোর একটি। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব পড়ে।
উপসাগরীয় সূত্রগুলোর মতে, আগে হরমুজ প্রণালি ছিল সামরিক উত্তেজনার একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র। এখন তা আলোচনার প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এতে ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করার সুযোগ পাচ্ছে।
একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, শেষ পর্যন্ত হরমুজই এখন ‘রেড লাইন’। আগে এটি ছিল পার্শ্ববর্তী ইস্যু, এখন সেটিই মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এতে আলোচনার লক্ষ্যই বদলে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগ হলো— ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা সরাসরি তাদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। একই সঙ্গে ইয়েমেন, ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাও দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সম্ভাব্য আলোচনায় এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছে।
এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রধান এবতিসাম আল-কেতবি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো ঐতিহাসিক সমাধানের ইঙ্গিত দেয় না, বরং দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রিত সংঘাতের কাঠামো তৈরি করছে। তার মতে, ক্ষেপণাস্ত্র, প্রক্সি গোষ্ঠী এবং হরমুজ—সব ইস্যুকে একসঙ্গে বিবেচনায় না আনলে কোনো চুক্তিই টেকসই হবে না।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অর্থনীতিতে পড়েছে। জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কা, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি ব্যাহত হওয়া এবং বিকল্প রুট ব্যবহারের অতিরিক্ত খরচে দেশগুলো চাপের মুখে পড়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বদলে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মত হলো, ইরানের আচরণ পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ ছাড়া বড় ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত হবে না।
এদিকে অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় নেতারা স্বীকার করছেন, মার্কিন সামরিক সক্ষমতা এখনো আঞ্চলিক নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ। থাড ও প্যাট্রিয়টের মতো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করেছে। তবে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসন্তোষও বাড়ছে।
দুবাইভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বহুথ-এর পরিচালক মোহাম্মদ বাহারুন বলেন, সাম্প্রতিক সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে একটি মাত্র বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে।
উপসাগরীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত হলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক ঝুঁকিও তৈরি করবে। কারণ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এখন পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
#আর

আপনার মতামত লিখুন