ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

তিন বছর পরপর বিয়ে–ডিভোর্স, পদবি রক্ষায় জাপানি দম্পতির নীরব প্রতিবাদ



তিন বছর পরপর বিয়ে–ডিভোর্স, পদবি রক্ষায় জাপানি দম্পতির নীরব প্রতিবাদ
ছবি: সংগৃহীত

জাপানে বিবাহের পর স্বামী–স্ত্রীর একই পারিবারিক নাম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নিয়ে যে দম্পতির অভিনব পন্থা আলোচনায় এসেছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত আইনি ও সামাজিক বাস্তবতা। দেশটির দেওয়ানি আইনের ৭৫০ ধারা অনুযায়ী বিয়ের সময় দম্পতিকে স্বামী বা স্ত্রীর যেকোনো একজনের পদবি গ্রহণ করে একই নামে পরিবার নিবন্ধন (কোসেকি) করতে হয় এবং এই নিবন্ধন ছাড়া বিয়ে আইনি স্বীকৃতি পায় না। ফলে আইনত ভিন্ন পদবি রেখে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার কোনো সুযোগ নেই, যদিও অনেকে পেশাগত বা সামাজিক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজের জন্মগত নাম ব্যবহার করে থাকেন।

হাচিওজি শহরের ওই দম্পতির প্রতি তিন বছর অন্তর বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনরায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত মূলত এই আইনি কাঠামোর মধ্যেই ব্যক্তিগত পরিচয় রক্ষার একটি ব্যতিক্রমী উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০১৬ সাল থেকে পালাক্রমে একে অপরের পদবি গ্রহণ করে বিয়ে নিবন্ধন করছেন—প্রথম দফায় স্বামীর পদবি, পরবর্তী দফায় স্ত্রীর পদবি- এভাবে চক্রাকারে আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে নিজেদের জন্মগত নাম স্থায়ীভাবে ত্যাগ না করার চেষ্টা করছেন। এই পদ্ধতি আইন লঙ্ঘন না করলেও প্রশাসনিকভাবে প্রতিবার নতুন পরিবার নিবন্ধন, নথিপত্র পরিবর্তন এবং সামাজিক পরিচয়ের জটিলতা তৈরি করে, যা তাদের প্রতিবাদের প্রতীকী দিকটিকেই বেশি তুলে ধরে।

জাপান বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে বৈধভাবে বিবাহিত দম্পতির জন্য একই পদবি গ্রহণ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে আন্তর্জাতিক মহলে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে প্রায় ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীকে স্বামীর পদবি নিতে হয়, যা লিঙ্গসমতার প্রশ্নে সমালোচিত। ২০২২ ও ২০২৩ সালের বিয়ের পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, স্ত্রীর পদবি গ্রহণের ঘটনা অত্যন্ত সীমিত।

এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিকবার মামলা হলেও জাপানের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ ও ২০২১ সালে রায় দিয়ে বলেছে, একই পদবি ব্যবহারের ব্যবস্থা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সাংবিধানিকভাবে বৈধ; আইন পরিবর্তনের বিষয়টি পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবুও ২০২৪ সালে নতুন করে কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে বিয়ের জন্য নিজের পারিবারিক নাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা ব্যক্তিগত মর্যাদা ও বিবাহের স্বাধীনতার পরিপন্থী।

আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে চাপ বাড়ছে। জাতিসংঘের নারী বৈষম্যবিরোধী কমিটি একাধিকবার জাপানকে ঐচ্ছিক পৃথক পদবি ব্যবস্থার অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং ২০২৪ সালের পর্যালোচনাতেও একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ জনমতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে; সাম্প্রতিক জরিপে ঐচ্ছিক দ্বৈত পদবি ব্যবস্থার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন দেখা গেছে।

ঐতিহাসিকভাবে জাপানে স্বামী–স্ত্রীর ভিন্ন পদবি থাকা অস্বাভাবিক ছিল না; মেইজি যুগে আধুনিক পরিবার নিবন্ধন ও ‘এক পরিবার এক নাম’ ধারণা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান ব্যবস্থার সূচনা হয়। এই কাঠামো পুরোনো ‘ইয়ে’ পারিবারিক ব্যবস্থার প্রভাব বহন করে, যেখানে পরিবারের প্রধান পুরুষের নামেই সব সদস্য নিবন্ধিত হতেন। ফলে সমালোচকদের মতে, বর্তমান আইন কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে হাচিওজির দম্পতির পদক্ষেপ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গণ্ডি পেরিয়ে জাপানের পারিবারিক আইন, লিঙ্গসমতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। আইন সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক অচলাবস্থা থাকলেও নাগরিক সমাজ, কর্পোরেট খাতের কিছু অংশ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পৃথক পদবি ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকায় বিষয়টি ভবিষ্যতে জাপানের সামাজিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬


তিন বছর পরপর বিয়ে–ডিভোর্স, পদবি রক্ষায় জাপানি দম্পতির নীরব প্রতিবাদ

প্রকাশের তারিখ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

জাপানে বিবাহের পর স্বামী–স্ত্রীর একই পারিবারিক নাম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা নিয়ে যে দম্পতির অভিনব পন্থা আলোচনায় এসেছে, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত আইনি ও সামাজিক বাস্তবতা। দেশটির দেওয়ানি আইনের ৭৫০ ধারা অনুযায়ী বিয়ের সময় দম্পতিকে স্বামী বা স্ত্রীর যেকোনো একজনের পদবি গ্রহণ করে একই নামে পরিবার নিবন্ধন (কোসেকি) করতে হয় এবং এই নিবন্ধন ছাড়া বিয়ে আইনি স্বীকৃতি পায় না। ফলে আইনত ভিন্ন পদবি রেখে বৈবাহিক সম্পর্ক বজায় রাখার কোনো সুযোগ নেই, যদিও অনেকে পেশাগত বা সামাজিক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজের জন্মগত নাম ব্যবহার করে থাকেন।

হাচিওজি শহরের ওই দম্পতির প্রতি তিন বছর অন্তর বিবাহবিচ্ছেদ ও পুনরায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত মূলত এই আইনি কাঠামোর মধ্যেই ব্যক্তিগত পরিচয় রক্ষার একটি ব্যতিক্রমী উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। জাপানি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তারা ২০১৬ সাল থেকে পালাক্রমে একে অপরের পদবি গ্রহণ করে বিয়ে নিবন্ধন করছেন—প্রথম দফায় স্বামীর পদবি, পরবর্তী দফায় স্ত্রীর পদবি- এভাবে চক্রাকারে আইনের বাধ্যবাধকতা মেনে নিজেদের জন্মগত নাম স্থায়ীভাবে ত্যাগ না করার চেষ্টা করছেন। এই পদ্ধতি আইন লঙ্ঘন না করলেও প্রশাসনিকভাবে প্রতিবার নতুন পরিবার নিবন্ধন, নথিপত্র পরিবর্তন এবং সামাজিক পরিচয়ের জটিলতা তৈরি করে, যা তাদের প্রতিবাদের প্রতীকী দিকটিকেই বেশি তুলে ধরে।

জাপান বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ যেখানে বৈধভাবে বিবাহিত দম্পতির জন্য একই পদবি গ্রহণ আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক বলে আন্তর্জাতিক মহলে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার ফলে প্রায় ৯৫ থেকে ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীকে স্বামীর পদবি নিতে হয়, যা লিঙ্গসমতার প্রশ্নে সমালোচিত। ২০২২ ও ২০২৩ সালের বিয়ের পরিসংখ্যানেও দেখা যায়, স্ত্রীর পদবি গ্রহণের ঘটনা অত্যন্ত সীমিত।

এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিকবার মামলা হলেও জাপানের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ ও ২০২১ সালে রায় দিয়ে বলেছে, একই পদবি ব্যবহারের ব্যবস্থা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সাংবিধানিকভাবে বৈধ; আইন পরিবর্তনের বিষয়টি পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তবুও ২০২৪ সালে নতুন করে কয়েকটি মামলা দায়ের হয়েছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে বিয়ের জন্য নিজের পারিবারিক নাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা ব্যক্তিগত মর্যাদা ও বিবাহের স্বাধীনতার পরিপন্থী।

আন্তর্জাতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে চাপ বাড়ছে। জাতিসংঘের নারী বৈষম্যবিরোধী কমিটি একাধিকবার জাপানকে ঐচ্ছিক পৃথক পদবি ব্যবস্থার অনুমতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং ২০২৪ সালের পর্যালোচনাতেও একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ জনমতেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে; সাম্প্রতিক জরিপে ঐচ্ছিক দ্বৈত পদবি ব্যবস্থার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন দেখা গেছে।

ঐতিহাসিকভাবে জাপানে স্বামী–স্ত্রীর ভিন্ন পদবি থাকা অস্বাভাবিক ছিল না; মেইজি যুগে আধুনিক পরিবার নিবন্ধন ও ‘এক পরিবার এক নাম’ ধারণা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান ব্যবস্থার সূচনা হয়। এই কাঠামো পুরোনো ‘ইয়ে’ পারিবারিক ব্যবস্থার প্রভাব বহন করে, যেখানে পরিবারের প্রধান পুরুষের নামেই সব সদস্য নিবন্ধিত হতেন। ফলে সমালোচকদের মতে, বর্তমান আইন কেবল প্রশাসনিক নয়, বরং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত।

এই প্রেক্ষাপটে হাচিওজির দম্পতির পদক্ষেপ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের গণ্ডি পেরিয়ে জাপানের পারিবারিক আইন, লিঙ্গসমতা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে চলমান বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে। আইন সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক অচলাবস্থা থাকলেও নাগরিক সমাজ, কর্পোরেট খাতের কিছু অংশ এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে পৃথক পদবি ব্যবস্থার পক্ষে সমর্থন বাড়তে থাকায় বিষয়টি ভবিষ্যতে জাপানের সামাজিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ