ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

নির্বাচনী সহিংসতা রোধে ৩ হাজার অপরাধীর তালিকা: কঠোর নজরদারিতে ৩৫২ ‘শুটার’ ও ১২৪ জঙ্গি


নিজস্ব সংবাদদাতা
নিজস্ব সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নির্বাচনী সহিংসতা রোধে ৩ হাজার অপরাধীর তালিকা: কঠোর নজরদারিতে ৩৫২ ‘শুটার’ ও ১২৪ জঙ্গি
মুন্সিগঞ্জের মুন্সিকান্দিতে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অস্ত্রধারী দুই ব্যক্তির মহড়ার চিত্র

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে এবং সম্ভাব্য নাশকতার ঝুঁকি এড়াতে সারা দেশে তিন হাজার চিহ্নিত অপরাধীর একটি বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। এই তালিকায় ৩৫২ জন পেশাদার ‘শুটার’ এবং ১২৪ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় জনমনে উদ্বেগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এই তালিকাটি ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এবং আটটি মহানগর পুলিশের কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে পুলিশ প্রশাসন।


অপরাধ জগতের ‘শীর্ষ’ নাম ও সাম্প্রতিক সহিংসতা

গোয়েন্দা তালিকায় নাম আসা অপরাধীদের মধ্যে অনেক আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামও রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় দুই দশক কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মুন্সিকান্দি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত শনিবারের ওই সংঘর্ষে একরাম দেওয়ানসহ চারজন অবৈধ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ, যাদের নাম গোয়েন্দা সংস্থার ‘শুটার’ তালিকায় আগে থেকেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সোমবার পর্যন্ত তাঁদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় সন্ত্রাসী রনির হাতে তারিক সাইফ মামুনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে আনে; রনিও বর্তমানে পুলিশের পলাতক তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।


জঙ্গি দমনে বিশেষ তৎপরতা

নির্বাচনের প্রাক্কালে পুলিশ প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জেল পালানো ও জামিনে মুক্ত হওয়া ১২৪ জন জঙ্গি সদস্য। চলতি মাসের শুরুতেই শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে জেএমবি সদস্য আহসান জহীর খান, বেলায়েত হোসেন ও তোফায়েল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিটিটিসি-এর তথ্যমতে, এই জঙ্গিরা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম এই পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি বলেন:

“ধাপে ধাপে অবৈধ অস্ত্রধারী ও অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। সাধারণ সন্ত্রাসীরা হুমকি হলেও, পলাতক ১২৪ জেএমবি সদস্য নির্বাচনের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে। তাঁদের গ্রেপ্তারে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”


পরিসংখ্যান ও আঞ্চলিক চিত্র

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সারা দেশের অপরাধীদের একটি আঞ্চলিক চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী:

  • ঢাকা মহানগর: ১১৫ জন অস্ত্রধারী ও অপরাধী।

  • চট্টগ্রাম মহানগর: ১৮০ জন (এখানে গত ৩৬ দিনে ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে)।

  • সিলেট মহানগর: ৯০ জন।

  • অন্যান্য মহানগর: খুলনা (৪২), রাজশাহী (৪০), গাজীপুর (২০) ও বরিশাল (১২)।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় আড়াই হাজার অপরাধীর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে গত জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যারা চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলে লিপ্ত, তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।


পুলিশের অবস্থান: রাজনৈতিক নয়, আইনসিদ্ধ ব্যবস্থা

তালিকায় থাকা অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই সম্প্রতি নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের (ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ) নেতা-কর্মী। বাকি একজন ছাত্রদলের সদস্যসচিব পদমর্যাদার। তবে পুলিশ প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, এই অভিযান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদত হোসাইন বলেন, “নির্বাচনে সহিংসতা ঠেকাতে পূর্ব অপরাধ রেকর্ডের ভিত্তিতে এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার একটি আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়া।”

নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে এই বিশাল তালিকা ও প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একদিকে স্বস্তি দিলেও, পলাতক অপরাধীদের তৎপরতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


নির্বাচনী সহিংসতা রোধে ৩ হাজার অপরাধীর তালিকা: কঠোর নজরদারিতে ৩৫২ ‘শুটার’ ও ১২৪ জঙ্গি

প্রকাশের তারিখ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে এবং সম্ভাব্য নাশকতার ঝুঁকি এড়াতে সারা দেশে তিন হাজার চিহ্নিত অপরাধীর একটি বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করেছে দুটি গোয়েন্দা সংস্থা। এই তালিকায় ৩৫২ জন পেশাদার ‘শুটার’ এবং ১২৪ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গির নাম অন্তর্ভুক্ত থাকায় জনমনে উদ্বেগ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এই তালিকাটি ইতোমধ্যে দেশের ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) এবং আটটি মহানগর পুলিশের কমিশনারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তালিকাভুক্ত এসব সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেছে পুলিশ প্রশাসন।


অপরাধ জগতের ‘শীর্ষ’ নাম ও সাম্প্রতিক সহিংসতা

গোয়েন্দা তালিকায় নাম আসা অপরাধীদের মধ্যে অনেক আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামও রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার কুখ্যাত সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামের নাম নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রায় দুই দশক কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মুন্সিকান্দি এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। গত শনিবারের ওই সংঘর্ষে একরাম দেওয়ানসহ চারজন অবৈধ অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ, যাদের নাম গোয়েন্দা সংস্থার ‘শুটার’ তালিকায় আগে থেকেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে সোমবার পর্যন্ত তাঁদের কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় সন্ত্রাসী রনির হাতে তারিক সাইফ মামুনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে আনে; রনিও বর্তমানে পুলিশের পলাতক তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।


জঙ্গি দমনে বিশেষ তৎপরতা

নির্বাচনের প্রাক্কালে পুলিশ প্রশাসনের কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জেল পালানো ও জামিনে মুক্ত হওয়া ১২৪ জন জঙ্গি সদস্য। চলতি মাসের শুরুতেই শেরেবাংলা নগর থানা এলাকায় ধারাবাহিক অভিযানে জেএমবি সদস্য আহসান জহীর খান, বেলায়েত হোসেন ও তোফায়েল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিটিটিসি-এর তথ্যমতে, এই জঙ্গিরা হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম এই পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি বলেন:

“ধাপে ধাপে অবৈধ অস্ত্রধারী ও অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। সাধারণ সন্ত্রাসীরা হুমকি হলেও, পলাতক ১২৪ জেএমবি সদস্য নির্বাচনের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে। তাঁদের গ্রেপ্তারে আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।”


পরিসংখ্যান ও আঞ্চলিক চিত্র

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সারা দেশের অপরাধীদের একটি আঞ্চলিক চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্য অনুযায়ী:

  • ঢাকা মহানগর: ১১৫ জন অস্ত্রধারী ও অপরাধী।

  • চট্টগ্রাম মহানগর: ১৮০ জন (এখানে গত ৩৬ দিনে ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে)।

  • সিলেট মহানগর: ৯০ জন।

  • অন্যান্য মহানগর: খুলনা (৪২), রাজশাহী (৪০), গাজীপুর (২০) ও বরিশাল (১২)।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় আড়াই হাজার অপরাধীর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে গত জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যারা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় যারা চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলে লিপ্ত, তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।


পুলিশের অবস্থান: রাজনৈতিক নয়, আইনসিদ্ধ ব্যবস্থা

তালিকায় থাকা অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০ জনের মধ্যে ১৯ জনই সম্প্রতি নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের (ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ) নেতা-কর্মী। বাকি একজন ছাত্রদলের সদস্যসচিব পদমর্যাদার। তবে পুলিশ প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, এই অভিযান সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।

পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদত হোসাইন বলেন, “নির্বাচনে সহিংসতা ঠেকাতে পূর্ব অপরাধ রেকর্ডের ভিত্তিতে এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার একটি আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়া।”

নির্বাচনী ডামাডোলের মধ্যে এই বিশাল তালিকা ও প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযান সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একদিকে স্বস্তি দিলেও, পলাতক অপরাধীদের তৎপরতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ