চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্যের চেয়ে ঘাটতি ও ব্যর্থতার দিকই বেশি বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, জুলাই আন্দোলন থেকে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি, যার ফলে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মব সহিংসতা বেড়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ১৭ মাসে দেশে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত এবং সাত হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৩৬ দিনে ১৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিচারব্যবস্থা, সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনের যে দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ছিল, দেড় বছরেও সেসব ক্ষেত্র নাজুক অবস্থায় রয়ে গেছে। তিনি বলেন, সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও ঘাটতি ও পথভ্রষ্টতার দিকটাই তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব শুরু করলেও সরকার ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনা—এই চারটি খাতে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এসব ক্ষেত্রে কিছু অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এখনো পর্যাপ্ত শক্তিশালী ও কার্যকর নয়। প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধে জড়িত প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও খাত দখলকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সহিংসতা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত নিজস্ব নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে উপদলীয় কোন্দল ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নির্বাচনী পরিবেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতা, প্রার্থীদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক হেনস্তা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো ঘটনা বেড়েছে। একই সময়ে এক হাজারের বেশি অস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এ ছাড়া ডিপফেক ও ভুল তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কাও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও কৌঁসুলি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে ধীরগতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অনীহার কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কিছু উদ্যোগে অনুদান প্রদানে দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে সরকারি ক্রয়নীতিমালা অনুসরণে ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখাতে পারেনি। মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, সরকারের ভেতর থেকেই মব সংস্কৃতির সূচনা হওয়ায় শাসনব্যবস্থার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তরিক না হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করতে দৃঢ় অঙ্গীকার না করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়েও যে দ্বিধা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম, নারী সংস্কার কমিশন এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়েও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়। টিআইবির মতে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা সার্বিকভাবে সরকারের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সাফল্যের চেয়ে ঘাটতি ও ব্যর্থতার দিকই বেশি বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, জুলাই আন্দোলন থেকে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আমলাতন্ত্র কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি, যার ফলে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
গতকাল সোমবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে মব সহিংসতা বেড়েছে এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। গত ১৭ মাসে দেশে ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন নিহত এবং সাত হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৩৬ দিনে ১৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নতুন করে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিচারব্যবস্থা, সংস্কার ও নির্বাচন ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপনের যে দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ছিল, দেড় বছরেও সেসব ক্ষেত্র নাজুক অবস্থায় রয়ে গেছে। তিনি বলেন, সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও ঘাটতি ও পথভ্রষ্টতার দিকটাই তুলনামূলকভাবে বেশি চোখে পড়ছে। রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব শুরু করলেও সরকার ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গবেষণা প্রতিবেদনে বিচার, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনা—এই চারটি খাতে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে বলা হয়, এসব ক্ষেত্রে কিছু অবকাঠামো তৈরি হলেও তা এখনো পর্যাপ্ত শক্তিশালী ও কার্যকর নয়। প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধে জড়িত প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও খাত দখলকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সহিংসতা ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত নিজস্ব নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে উপদলীয় কোন্দল ও সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নির্বাচনী পরিবেশ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতা, প্রার্থীদের ওপর হামলা, রাজনৈতিক হেনস্তা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো ঘটনা বেড়েছে। একই সময়ে এক হাজারের বেশি অস্ত্র নিখোঁজ হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। এ ছাড়া ডিপফেক ও ভুল তথ্য ছড়ানোর আশঙ্কাও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়েও প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও কৌঁসুলি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে ধীরগতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংস্কার সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের অনীহার কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কিছু উদ্যোগে অনুদান প্রদানে দুর্নীতির অভিযোগ এবং স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে সরকারি ক্রয়নীতিমালা অনুসরণে ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকার শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় কঠোরতা দেখাতে পারেনি। মব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তাঁর মতে, সরকারের ভেতর থেকেই মব সংস্কৃতির সূচনা হওয়ায় শাসনব্যবস্থার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়নে আন্তরিক না হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করতে দৃঢ় অঙ্গীকার না করে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়েও যে দ্বিধা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সংস্কার প্রক্রিয়াকে আরও দুর্বল করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যম, নারী সংস্কার কমিশন এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিয়েও সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়। টিআইবির মতে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা সার্বিকভাবে সরকারের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

আপনার মতামত লিখুন