ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশু–নারী–বৃদ্ধ, ধ্বংসের মুখে ফসল ও বনভূমি

আজগরকাঠীতে অবৈধ কাঠের চুল্লিতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়



আজগরকাঠীতে অবৈধ কাঠের চুল্লিতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়
চুল্লির স্থান থেকে সংগ্রহীত

বরগুনার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠী এলাকায় অবৈধ কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদনের চুল্লিকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে প্রশাসন তিনটি অবৈধ চুল্লি ভেঙে দিলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় সেগুলো আবার চালু হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় অন্তত ১০টি চুল্লি সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো স্থানীয়রা ‘মৃত্যু কারখানা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়লা উৎপাদনের নামে দিনরাত শতশত মন কাঠ পুড়িয়ে বন ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। চুল্লিগুলো থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘন কালো ধোঁয়া বের হয়ে পুরো গ্রামকে বিষাক্ত করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।

চুল্লির ধোঁয়ায় ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৌসুমি আমসহ বিভিন্ন ফলজ গাছে মুকুল ঝরে যাচ্ছে, ফল ধরছে না। শাকসবজি ধূসর হয়ে পুড়ে যাচ্ছে এবং ধানের দানা কমে যাচ্ছে বলে জানান কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষক আবুল কালাম বলেন, “চুল্লি থাকলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব না। ধোঁয়া এসে পাতাসহ গাছ পুড়ে মারা যাচ্ছে।”

চুল্লির ধোঁয়ায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা, বমি ও অ্যালার্জির মতো রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। রাতে ঘরে থাকা পর্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

গৃহবধূ শিরিন আক্তার ময়না বলেন, “রাতে বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে থাকা যায় না। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। অভিযোগ করলেই হুমকি আসে।”

স্থানীয় প্রবাসী সবুজ (মালয়েশিয়া) বলেন, “আগে তিনটা চুল্লি ভেঙে দেওয়ায় শান্তি পাবো ভেবেছিলাম। এখন দশটা। প্রতিবাদ করলেই চাঁদাবাজির মামলা আর প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছিল।”

বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল ফাতাহ বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির চুল্লির ধোঁয়া অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে থাকা কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই–অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও কালো কার্বন শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। দ্রুত এসব চুল্লি বন্ধ করা জরুরি।

চুল্লির মালিক কবির মৃধা স্বীকার করেন, এসব চুল্লির কোনো অনুমোদন নেই। আরেক মালিক মাসুদ ফিটার দাবি করেন, “এটি না একদম বৈধ, না একদম অবৈধ।” তবে পরিবেশবিদরা এ বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও আইনবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্রের মদদে রাতারাতি এসব চুল্লি গড়ে ওঠে। কেউ প্রতিবাদ করলেই ধাওয়া, হুমকি ও মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়।

বরগুনা সদর থানার ওসি মো. আবদুল আলীম বলেন, বিষয়টি তদন্তে বাবুগঞ্জ ফাঁড়িকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব জানান, আগামী ৩–৫ দিনের মধ্যে সব অবৈধ চুল্লি ভেঙে ফেলা হবে। পুনরায় নির্মাণ করলে মামলা করা হবে। আগের একটি মামলাও চলমান রয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল বলেন, যত ক্ষমতাবানই হোক, অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে অভিযান হবেই।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন দণ্ডনীয় অপরাধ। আজগরকাঠীর চুল্লিগুলো সরাসরি আইন লঙ্ঘন করছে।

সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এলাকাটি স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। স্থানীয়রা অবিলম্বে সব চুল্লি বন্ধ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬


আজগরকাঠীতে অবৈধ কাঠের চুল্লিতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়

প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

বরগুনার ১০নং নলটোনা ইউনিয়নের আজগরকাঠী এলাকায় অবৈধ কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদনের চুল্লিকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে প্রশাসন তিনটি অবৈধ চুল্লি ভেঙে দিলেও প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় সেগুলো আবার চালু হয়। বর্তমানে ওই এলাকায় অন্তত ১০টি চুল্লি সক্রিয় রয়েছে, যেগুলো স্থানীয়রা ‘মৃত্যু কারখানা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়লা উৎপাদনের নামে দিনরাত শতশত মন কাঠ পুড়িয়ে বন ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। চুল্লিগুলো থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে ঘন কালো ধোঁয়া বের হয়ে পুরো গ্রামকে বিষাক্ত করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর।

চুল্লির ধোঁয়ায় ফসল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মৌসুমি আমসহ বিভিন্ন ফলজ গাছে মুকুল ঝরে যাচ্ছে, ফল ধরছে না। শাকসবজি ধূসর হয়ে পুড়ে যাচ্ছে এবং ধানের দানা কমে যাচ্ছে বলে জানান কৃষকেরা।

স্থানীয় কৃষক আবুল কালাম বলেন, “চুল্লি থাকলে ফসল ঘরে তোলা সম্ভব না। ধোঁয়া এসে পাতাসহ গাছ পুড়ে মারা যাচ্ছে।”

চুল্লির ধোঁয়ায় শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথা, বমি ও অ্যালার্জির মতো রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। রাতে ঘরে থাকা পর্যন্ত কষ্টকর হয়ে উঠেছে বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।

গৃহবধূ শিরিন আক্তার ময়না বলেন, “রাতে বাচ্চাদের নিয়ে ঘরে থাকা যায় না। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। অভিযোগ করলেই হুমকি আসে।”

স্থানীয় প্রবাসী সবুজ (মালয়েশিয়া) বলেন, “আগে তিনটা চুল্লি ভেঙে দেওয়ায় শান্তি পাবো ভেবেছিলাম। এখন দশটা। প্রতিবাদ করলেই চাঁদাবাজির মামলা আর প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরিবার নিয়ে এলাকা ছাড়তে হয়েছিল।”

বরগুনা জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. আবুল ফাতাহ বলেন, কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির চুল্লির ধোঁয়া অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে থাকা কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই–অক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও কালো কার্বন শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদে অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, ফুসফুস প্রদাহ, উচ্চ রক্তচাপ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। দ্রুত এসব চুল্লি বন্ধ করা জরুরি।

চুল্লির মালিক কবির মৃধা স্বীকার করেন, এসব চুল্লির কোনো অনুমোদন নেই। আরেক মালিক মাসুদ ফিটার দাবি করেন, “এটি না একদম বৈধ, না একদম অবৈধ।” তবে পরিবেশবিদরা এ বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও আইনবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্রের মদদে রাতারাতি এসব চুল্লি গড়ে ওঠে। কেউ প্রতিবাদ করলেই ধাওয়া, হুমকি ও মিথ্যা মামলার শিকার হতে হয়।

বরগুনা সদর থানার ওসি মো. আবদুল আলীম বলেন, বিষয়টি তদন্তে বাবুগঞ্জ ফাঁড়িকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইউএনওর সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হায়াত মাহমুদ রকিব জানান, আগামী ৩–৫ দিনের মধ্যে সব অবৈধ চুল্লি ভেঙে ফেলা হবে। পুনরায় নির্মাণ করলে মামলা করা হবে। আগের একটি মামলাও চলমান রয়েছে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) অনিমেষ বিশ্বাস বলেন, দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সজল চন্দ্র শীল বলেন, যত ক্ষমতাবানই হোক, অবৈধ চুল্লির বিরুদ্ধে অভিযান হবেই।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন দণ্ডনীয় অপরাধ। আজগরকাঠীর চুল্লিগুলো সরাসরি আইন লঙ্ঘন করছে।

সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এলাকাটি স্থায়ী পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। স্থানীয়রা অবিলম্বে সব চুল্লি বন্ধ এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ