ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ এক অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-কে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নিয়েছিলেন এবং উম্মতে মোহাম্মদির জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের তোহফা দিয়েছিলেন। মুসলিম মানসে তাই এই রাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে শবে মেরাজ বা ২৭ রজবকে কেন্দ্র করে শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা রোজার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এই রাত উদযাপনের কোনো নজির নেই। তবে একজন মুমিন হিসেবে এই ঘটনার স্মরণ ও সাধারণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। দালিলিকভিত্তিতে নিচে আলোচনা করা হলো—এ সময়ে একজন মুমিন কী ধরনের আমল করতে পারেন।
১. মেরাজের মূল শিক্ষা বাস্তবায়ন
মেরাজের রাতে উম্মতকে যে তিনটি মূল উপহার দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো আঁকড়ে ধরাই হলো এই রাতের প্রকৃত সম্মান।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ: মেরাজের প্রধান উপহার নামাজ। তাই এই দিনের প্রধান আমল হওয়া উচিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে তাকবিরে উলার সহিত আদায় করা এবং কাজা নামাজ আদায়ের পরিকল্পনা করা।
শিরক বর্জন: মেরাজে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে—এই উম্মতের যারা শিরক করবে না, তারা জান্নাত পাবে। তাই তাওহিদের ওপর অবিচল থাকার শপথ নেওয়াই অন্যতম ইবাদত।
২. সাধারণ নফল নামাজ ও তেলাওয়াত
শবে মেরাজ বা ২৭ রজব উপলক্ষে ‘বিশেষ পদ্ধতির’ কোনো নামাজ নেই। তবে রাতটি যেহেতু ফজিলতপূর্ণ হতে পারে, তাই সাধারণ নফল ইবাদত করা জায়েজ।
নফল নামাজ: দীর্ঘ সেজদা ও রুকুসহ ধীরস্থিরভাবে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করা যেতে পারে।
তাহাজ্জুদ: শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া মুমিনের নিয়মিত আমল, যা এই রাতেও করা যেতে পারে।
কোরআন তেলাওয়াত: পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং এর অর্থ-ব্যাখ্যা পাঠ করা উত্তম ইবাদত।
৩. নফল রোজা (শর্তসাপেক্ষে)
শবে মেরাজ বা ২৭ রজব উপলক্ষে নির্দিষ্ট রোজার বিধান হাদিসে নেই। তবে রজব একটি সম্মানিত মাস (আশহুরে হুরুম)। কেউ এই মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতে চাইলে তা রাখতে পারেন। ২৭ রজব যদি সোমবার, বৃহস্পতিবার বা আইয়ামে বিজের (১৩, ১৪, ১৫) মধ্যে পড়ে, তাহলে সুন্নাহর নিয়তে রোজা রাখা যাবে। তবে এটিকে ‘মেরাজের বিশেষ রোজা’ মনে করা সঠিক নয়।
৪. মেরাজের ঘটনা ও সিরাত পাঠ
পরিবার বা মসজিদে বসে সহিহ হাদিসের আলোকে মেরাজের ঘটনা পাঠ করা বড় ইবাদত হতে পারে। ভিত্তিহীন কিচ্ছা-কাহিনি পরিহার করে বিশুদ্ধ সিরাত গ্রন্থ—যেমন আর-রাহিকুল মাখতুম—থেকে মেরাজের অধ্যায় পাঠ করা যেতে পারে। এতে ঈমান মজবুত হবে।
৫. ইস্তেগফার ও দোয়া
রজব মাস ও মেরাজের ঘটনা আল্লাহর কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই এ সময়ে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত—যা মেরাজে নাজিল হয়েছিল—পাঠ করা ও সে অনুযায়ী আমল করা উত্তম।
সতর্কতা: যা বর্জনীয়
এই রাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, আলোকসজ্জা বা হালুয়া-রুটির আয়োজন শরিয়তসম্মত নয়।
‘সালাতুর রাগাইব’ বা বিশেষ নামের নামাজ সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে উৎসব পালন করা সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহর পরিপন্থী।
মেরাজের রাতে নতুন কোনো বিশেষ আমল আবিষ্কার না করে দৈনন্দিন ফরজ ও সুন্নাহ ইবাদতগুলো সুন্দরভাবে আদায় করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের বিদআত থেকে বেঁচে সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬
ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ এক অলৌকিক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই রাতে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিব (সা.)-কে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নিয়েছিলেন এবং উম্মতে মোহাম্মদির জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের তোহফা দিয়েছিলেন। মুসলিম মানসে তাই এই রাতের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে শবে মেরাজ বা ২৭ রজবকে কেন্দ্র করে শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা রোজার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এই রাত উদযাপনের কোনো নজির নেই। তবে একজন মুমিন হিসেবে এই ঘটনার স্মরণ ও সাধারণ নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের সুযোগ রয়েছে। দালিলিকভিত্তিতে নিচে আলোচনা করা হলো—এ সময়ে একজন মুমিন কী ধরনের আমল করতে পারেন।
১. মেরাজের মূল শিক্ষা বাস্তবায়ন
মেরাজের রাতে উম্মতকে যে তিনটি মূল উপহার দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো আঁকড়ে ধরাই হলো এই রাতের প্রকৃত সম্মান।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ: মেরাজের প্রধান উপহার নামাজ। তাই এই দিনের প্রধান আমল হওয়া উচিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে তাকবিরে উলার সহিত আদায় করা এবং কাজা নামাজ আদায়ের পরিকল্পনা করা।
শিরক বর্জন: মেরাজে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে—এই উম্মতের যারা শিরক করবে না, তারা জান্নাত পাবে। তাই তাওহিদের ওপর অবিচল থাকার শপথ নেওয়াই অন্যতম ইবাদত।
২. সাধারণ নফল নামাজ ও তেলাওয়াত
শবে মেরাজ বা ২৭ রজব উপলক্ষে ‘বিশেষ পদ্ধতির’ কোনো নামাজ নেই। তবে রাতটি যেহেতু ফজিলতপূর্ণ হতে পারে, তাই সাধারণ নফল ইবাদত করা জায়েজ।
নফল নামাজ: দীর্ঘ সেজদা ও রুকুসহ ধীরস্থিরভাবে সাধারণ নফল নামাজ আদায় করা যেতে পারে।
তাহাজ্জুদ: শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়া মুমিনের নিয়মিত আমল, যা এই রাতেও করা যেতে পারে।
কোরআন তেলাওয়াত: পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত এবং এর অর্থ-ব্যাখ্যা পাঠ করা উত্তম ইবাদত।
৩. নফল রোজা (শর্তসাপেক্ষে)
শবে মেরাজ বা ২৭ রজব উপলক্ষে নির্দিষ্ট রোজার বিধান হাদিসে নেই। তবে রজব একটি সম্মানিত মাস (আশহুরে হুরুম)। কেউ এই মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখতে চাইলে তা রাখতে পারেন। ২৭ রজব যদি সোমবার, বৃহস্পতিবার বা আইয়ামে বিজের (১৩, ১৪, ১৫) মধ্যে পড়ে, তাহলে সুন্নাহর নিয়তে রোজা রাখা যাবে। তবে এটিকে ‘মেরাজের বিশেষ রোজা’ মনে করা সঠিক নয়।
৪. মেরাজের ঘটনা ও সিরাত পাঠ
পরিবার বা মসজিদে বসে সহিহ হাদিসের আলোকে মেরাজের ঘটনা পাঠ করা বড় ইবাদত হতে পারে। ভিত্তিহীন কিচ্ছা-কাহিনি পরিহার করে বিশুদ্ধ সিরাত গ্রন্থ—যেমন আর-রাহিকুল মাখতুম—থেকে মেরাজের অধ্যায় পাঠ করা যেতে পারে। এতে ঈমান মজবুত হবে।
৫. ইস্তেগফার ও দোয়া
রজব মাস ও মেরাজের ঘটনা আল্লাহর কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই এ সময়ে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা বাঞ্ছনীয়। বিশেষ করে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত—যা মেরাজে নাজিল হয়েছিল—পাঠ করা ও সে অনুযায়ী আমল করা উত্তম।
সতর্কতা: যা বর্জনীয়
এই রাতকে কেন্দ্র করে আতশবাজি, আলোকসজ্জা বা হালুয়া-রুটির আয়োজন শরিয়তসম্মত নয়।
‘সালাতুর রাগাইব’ বা বিশেষ নামের নামাজ সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।
দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে উৎসব পালন করা সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহর পরিপন্থী।
মেরাজের রাতে নতুন কোনো বিশেষ আমল আবিষ্কার না করে দৈনন্দিন ফরজ ও সুন্নাহ ইবাদতগুলো সুন্দরভাবে আদায় করাই একজন মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের বিদআত থেকে বেঁচে সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন।

আপনার মতামত লিখুন