ঢাকা    সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শান্তি ও অগ্রযাত্রার নবসংকল্প, কিশোরগঞ্জের জননিরাপত্তা ও নদী-হাওরের উন্নয়নে মতবিনিময়ে প্রতিশ্রুতির সুর প্রতিধ্বনি।


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

শান্তি ও অগ্রযাত্রার নবসংকল্প, কিশোরগঞ্জের জননিরাপত্তা ও নদী-হাওরের উন্নয়নে মতবিনিময়ে প্রতিশ্রুতির সুর প্রতিধ্বনি।
কিশোরগঞ্জে মত বিনিময় করছেন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।

​আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, হাওর-বাঁওড় আর মেঘনা-ধনু-নরসুন্দরা বিধৌত শস্য-শ্যামল জনপদ কিশোরগঞ্জ। এ জেলার মাটির গভীরে যেমন লুকিয়ে রয়েছে আবহমান সংস্কৃতি আর সংগ্রামের ইতিহাস, তেমনি এর বিস্তৃত হাওরাঞ্চলে প্রতিদিন রচিত হয় নতুন জীবনের আখ্যান। তবে জনপদের এই গতিময়তাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সবচেয়ে জরুরি শর্ত হলো সুদৃঢ় জননিরাপত্তা, সামাজিক স্থায়িত্ব এবং সমন্বিত প্রশাসনিক উন্নয়ন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ ৩১ আগস্ট (সোমবার) সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত হয় জেলার আইনশৃঙ্খলা স্থায়ীকরণ ও সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা। ​শরতের স্নিগ্ধ আলো যখন নরসুন্দরা নদীর বুকে মৃদু ঢেউ তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সুবিশাল চত্বরে ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই সম্মেলন কক্ষে সমবেত হয়েছিলেন জেলার প্রশাসন, পুলিশ, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। কিশোরগঞ্জের মানুষের স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন পথ উন্মোচনের এই সংকল্পযাত্রায় প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং কিশোরগঞ্জ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।

​জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এ ছাড়া মতবিনিময়ে অংশ নেন জেলার বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ এবং জেলায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ।

​কিশোরগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নরসুন্দরা নদী কিংবা বিশাল হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জলমহাল—কোথাও যেন কোনো অন্যায়ের ছায়া না পড়ে, সে বিষয়ে শুরুতেই কঠোর বার্তা দেন প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ​“আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ছাড়া কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই স্থায়ী সুফল আনতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কেবল সরকারি পরিপত্রের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার নাম।” ​তিনি প্রশাসনের সব স্তরের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, মাদকের বিষাক্ত থাবা থেকে তরুণের ভাবমূর্তিকে রক্ষা করতে হবে। মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। শহরের যানজট নিরসন, কিশোর গ্যাং কালচার উৎখাত এবং গ্রামীণ সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

​পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তাঁর সমাপনী প্রতিবেদনে জানান, জেলার ১৩টি থানাতেই বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাতে শহর ও প্রত্যন্ত হাওর এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করার ফলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, অপরাধী যে দলের বা যে পরিচয়েরই হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাবে না।

​কিশোরগঞ্জের নাম উচ্চারিত হলেই যে চিত্রটি চোখে ভাসে তা হলো হাওরের উত্তাল জলরাশি ও দিগন্তজোড়া বোরো ফসলের সবুজ খেত। সভায় হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে এক বিস্তারিত ও অনুসন্ধানী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ চিরতরে বন্ধ করার তাগিদ দেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। ​প্রতিনিধিদের বক্তব্যের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, হাওরের কৃষক কেবল ফসল ফলান না, তাঁরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড রক্ষা করেন। আগাম বন্যা ও নদীভাঙন থেকে রক্ষা করতে স্থায়ী জিওবাগ ও ব্লকের বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া, হাওরের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘অল ওয়েদার রোড’-এর সুফল অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

​তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ইয়াসের খান চৌধুরী কিশোরগঞ্জের বিশাল পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগারসিন্ধুর, জঙ্গলবাড়ি দুর্গ, ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু এবং মাইজচর-মিঠামইন-ইটনা-অষ্টগ্রামের অপূর্ব হাওরকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হবে। এছাড়া জেলার তরুণ প্রজন্মের জন্য হাই-টেক পার্ক ও ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা তরান্বিত করা হবে।  

​প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের উন্মুক্ত বাক-প্রতিধ্বনি সভায় মুক্ত আলোচনা পর্বে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ এক অনন্য গণতান্ত্রিক চত্বরে পরিণত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জেলার বিদ্যুৎ সংকট, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নতকরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার নানা প্রস্তাব পেশ করেন।

​সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, “জেলা প্রশাসন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নাগরিকদের যেকোনো যৌক্তিক ও কল্যাণমূলক প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রশাসন সর্বদাই তৎপর রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা কঠোর, কিন্তু জনগণের সেবা প্রদানে অত্যন্ত নমনীয় ও আন্তরিক।”

​জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে তৃণমূলের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা জেলার সার্বিক সূচক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

​সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান অতিথি জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিশোরগঞ্জের সাংবাদিক সমাজ অতীতে যেমন জেলার সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন, ভবিষ্যতেও সেই বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ​তিনি স্পষ্ট করে জানান, বস্তুনিষ্ঠ খবরের মাধ্যমে প্রশাসনের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানো হবে, কারণ সত্য তথ্য প্রচার না হলে কোনো দেশ বা অঞ্চল সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা এদিন সাংবাদিকদের আবাসন, প্রেসক্লাব উন্নয়ন ও পেশাগত নিরাপত্তার নানা বিষয় প্রতিমন্ত্রীর নিকট তুলে ধরেন।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মতবিনিময় সভার শেষলগ্নে এক অভিন্ন প্রত্যয় ধ্বনিত হয়—দল-মত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কিশোরগঞ্জকে একটি শান্তিময়, দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক জেলায় রূপান্তর করা হবে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত তদারকি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।

​সবশেষে, কিশোরগঞ্জের হাওরের হাওয়া ও সমতলের মাটির ঘ্রাণে মিশে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ সভাকে ঘিরে জেলাবাসীর মনে নতুন আশা ও বিশ্বাসের সঞ্চার হয়েছে। এক সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও উন্নত কিশোরগঞ্জ গড়ার নতুন শপথ নিয়ে শেষ হয় দিনটির ঐতিহাসিক মতবিনিময় অনুষ্ঠান।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬


শান্তি ও অগ্রযাত্রার নবসংকল্প, কিশোরগঞ্জের জননিরাপত্তা ও নদী-হাওরের উন্নয়নে মতবিনিময়ে প্রতিশ্রুতির সুর প্রতিধ্বনি।

প্রকাশের তারিখ : ৩১ আগস্ট ২০২৬

featured Image

​আবহমান বাংলার ঐতিহ্য, হাওর-বাঁওড় আর মেঘনা-ধনু-নরসুন্দরা বিধৌত শস্য-শ্যামল জনপদ কিশোরগঞ্জ। এ জেলার মাটির গভীরে যেমন লুকিয়ে রয়েছে আবহমান সংস্কৃতি আর সংগ্রামের ইতিহাস, তেমনি এর বিস্তৃত হাওরাঞ্চলে প্রতিদিন রচিত হয় নতুন জীবনের আখ্যান। তবে জনপদের এই গতিময়তাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে সবচেয়ে জরুরি শর্ত হলো সুদৃঢ় জননিরাপত্তা, সামাজিক স্থায়িত্ব এবং সমন্বিত প্রশাসনিক উন্নয়ন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আজ ৩১ আগস্ট (সোমবার) সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত হয় জেলার আইনশৃঙ্খলা স্থায়ীকরণ ও সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভা। ​শরতের স্নিগ্ধ আলো যখন নরসুন্দরা নদীর বুকে মৃদু ঢেউ তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সুবিশাল চত্বরে ছড়িয়ে পড়ছিল, ঠিক তখনই সম্মেলন কক্ষে সমবেত হয়েছিলেন জেলার প্রশাসন, পুলিশ, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। কিশোরগঞ্জের মানুষের স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন পথ উন্মোচনের এই সংকল্পযাত্রায় প্রধান অতিথির আসন অলঙ্কৃত করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং কিশোরগঞ্জ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।

​জেলা প্রশাসন আয়োজিত এই প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল এবং জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এ ছাড়া মতবিনিময়ে অংশ নেন জেলার বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ এবং জেলায় কর্মরত বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ।


​কিশোরগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা নরসুন্দরা নদী কিংবা বিশাল হাওরাঞ্চলের প্রত্যন্ত জলমহাল—কোথাও যেন কোনো অন্যায়ের ছায়া না পড়ে, সে বিষয়ে শুরুতেই কঠোর বার্তা দেন প্রধান অতিথি প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, ​“আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ছাড়া কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই স্থায়ী সুফল আনতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কেবল সরকারি পরিপত্রের বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়ার নাম।” ​তিনি প্রশাসনের সব স্তরের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, মাদকের বিষাক্ত থাবা থেকে তরুণের ভাবমূর্তিকে রক্ষা করতে হবে। মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের কঠোর নির্দেশ দেন তিনি। শহরের যানজট নিরসন, কিশোর গ্যাং কালচার উৎখাত এবং গ্রামীণ সহিংসতা বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়।


​পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তাঁর সমাপনী প্রতিবেদনে জানান, জেলার ১৩টি থানাতেই বিশেষ নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। রাতে শহর ও প্রত্যন্ত হাওর এলাকায় পুলিশি টহল জোরদার করার ফলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, অপরাধী যে দলের বা যে পরিচয়েরই হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাবে না।


​কিশোরগঞ্জের নাম উচ্চারিত হলেই যে চিত্রটি চোখে ভাসে তা হলো হাওরের উত্তাল জলরাশি ও দিগন্তজোড়া বোরো ফসলের সবুজ খেত। সভায় হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন নিয়ে এক বিস্তারিত ও অনুসন্ধানী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির পথ চিরতরে বন্ধ করার তাগিদ দেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। ​প্রতিনিধিদের বক্তব্যের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, হাওরের কৃষক কেবল ফসল ফলান না, তাঁরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মেরুদণ্ড রক্ষা করেন। আগাম বন্যা ও নদীভাঙন থেকে রক্ষা করতে স্থায়ী জিওবাগ ও ব্লকের বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া, হাওরের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘অল ওয়েদার রোড’-এর সুফল অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে পরিবেশ ভারসাম্য রক্ষা করা যায়, সেদিকে নজর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

​তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে ইয়াসের খান চৌধুরী কিশোরগঞ্জের বিশাল পর্যটন সম্ভাবনাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রকাশ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগারসিন্ধুর, জঙ্গলবাড়ি দুর্গ, ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু এবং মাইজচর-মিঠামইন-ইটনা-অষ্টগ্রামের অপূর্ব হাওরকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করা হবে। এছাড়া জেলার তরুণ প্রজন্মের জন্য হাই-টেক পার্ক ও ডিজিটাল স্কিল ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা তরান্বিত করা হবে।  


​প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের উন্মুক্ত বাক-প্রতিধ্বনি সভায় মুক্ত আলোচনা পর্বে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ এক অনন্য গণতান্ত্রিক চত্বরে পরিণত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা জেলার বিদ্যুৎ সংকট, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান উন্নতকরণ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার নানা প্রস্তাব পেশ করেন।


​সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, “জেলা প্রশাসন জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নাগরিকদের যেকোনো যৌক্তিক ও কল্যাণমূলক প্রস্তাব বাস্তবায়নে প্রশাসন সর্বদাই তৎপর রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে আমরা কঠোর, কিন্তু জনগণের সেবা প্রদানে অত্যন্ত নমনীয় ও আন্তরিক।”


​জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল বলেন, জেলা পরিষদের মাধ্যমে তৃণমূলের গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারিত হচ্ছে, যা জেলার সার্বিক সূচক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

​সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান অতিথি জোর দিয়ে বলেন, গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কিশোরগঞ্জের সাংবাদিক সমাজ অতীতে যেমন জেলার সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন, ভবিষ্যতেও সেই বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ​তিনি স্পষ্ট করে জানান, বস্তুনিষ্ঠ খবরের মাধ্যমে প্রশাসনের গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানানো হবে, কারণ সত্য তথ্য প্রচার না হলে কোনো দেশ বা অঞ্চল সঠিকভাবে পরিচালিত হতে পারে না। জেলায় কর্মরত সাংবাদিকরা এদিন সাংবাদিকদের আবাসন, প্রেসক্লাব উন্নয়ন ও পেশাগত নিরাপত্তার নানা বিষয় প্রতিমন্ত্রীর নিকট তুলে ধরেন।


দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মতবিনিময় সভার শেষলগ্নে এক অভিন্ন প্রত্যয় ধ্বনিত হয়—দল-মত ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কিশোরগঞ্জকে একটি শান্তিময়, দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক জেলায় রূপান্তর করা হবে। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য একটি সমন্বিত তদারকি কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হয়।


​সবশেষে, কিশোরগঞ্জের হাওরের হাওয়া ও সমতলের মাটির ঘ্রাণে মিশে যাওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ সভাকে ঘিরে জেলাবাসীর মনে নতুন আশা ও বিশ্বাসের সঞ্চার হয়েছে। এক সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও উন্নত কিশোরগঞ্জ গড়ার নতুন শপথ নিয়ে শেষ হয় দিনটির ঐতিহাসিক মতবিনিময় অনুষ্ঠান।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ