বাংলাদেশ আজ আরেকটি তীক্ষ্ণ, বিবেকবান ও আপোষহীন কণ্ঠ হারাল। শরীফ ওসমান হাদী আর নেই। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে থেমে গেল এক প্রতিবাদী জীবনের স্পন্দন। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রস্থান নয়—এটি এ দেশের রাজনীতিতে সততা, সাহস ও নির্ভীক উচ্চারণের ওপর আরেকটি নির্মম আঘাত।
হাদীর মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট ও নির্মম। প্রকাশ্য রাজপথে, দিনের আলোয়, রাজনৈতিক মত ও অবস্থানের কারণে তাঁকে লক্ষ্য করে চালানো হয় গুলি। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা, আইসিইউতে দীর্ঘ সময় ধরে জীবন-মৃত্যুর দোলাচল—সবশেষে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যুই তাঁকে নিয়ে যায়। এই মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার শূন্যতাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদীর রাজনৈতিক জীবন ছিল আপোষহীনতার প্রতীক। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি ধীরে ধীরে পরিণত হন একটি দৃঢ় কণ্ঠে—যে কণ্ঠ ক্ষমতার সামনে নত হয়নি, সুবিধার কাছে বিক্রি হয়নি। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি বারবার কথা বলেছেন গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদা নিয়ে। যে রাজনীতিতে চুপ থাকাই অনেক সময় নিরাপদ, সেখানে হাদী বেছে নিয়েছিলেন কথা বলার ঝুঁকি।
তাঁর সততা ছিল অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। তিনি জানতেন, সত্য বলা মানেই শত্রু বাড়ানো। তবু তিনি পিছু হটেননি। রাজনৈতিক সমঝোতা ও সুবিধাভোগী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন—রাজনীতি যদি মানুষের জন্য না হয়, তবে সে রাজনীতি অর্থহীন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আপোষ করেননি, ভয় পাননি, এমনকি নিজের জীবনকেও ঝুঁকির বাইরে রাখেননি।
হাদীর ত্যাগ ছিল নীরব কিন্তু গভীর। রাজপথে আন্দোলন, বক্তৃতায় আগুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট ভাষা—সবখানেই তিনি ছিলেন সক্রিয়। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পরিবার কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার চেয়ে তিনি বড় করে দেখেছেন আদর্শকে। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব।
তাঁর বক্তব্যগুলো আজও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। তিনি বলতেন, “গণতন্ত্র ভিক্ষা নয়, এটা মানুষের অধিকার।” আবার কখনো উচ্চারণ করতেন, “ভয় দেখিয়ে যদি সত্য থামানো যেত, তাহলে পৃথিবীতে কোনো বিপ্লব হতো না।” এসব বক্তব্য তাঁকে জনপ্রিয় করেছে তরুণদের কাছে, আবার বিপজ্জনক করে তুলেছে ক্ষমতাকেন্দ্রের চোখে।
শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু আমাদের সামনে কঠিন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। এই দেশে কি আপোষহীন রাজনীতির কোনো নিরাপদ জায়গা আছে? সত্য কথা বলার মূল্য কি শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়েই দিতে হবে? রাজনৈতিক সহিংসতা কি আমাদের গণতন্ত্রের স্থায়ী ভাষা হয়ে উঠছে?
আজ হাদী নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে। তাঁর রক্তের দাগ কেবল রাজপথে নয়, রাষ্ট্রের বিবেকেও লেগে আছে। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে—তিনি মাথা নত করেননি, আপোষ করেননি, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের আদর্শের মূল্য জীবন দিয়ে চুকিয়েছেন।
শরীফ ওসমান হাদী হয়তো একটি জীবন হারালেন, কিন্তু তিনি একটি বার্তা রেখে গেলেন—সততা কখনো পরাজিত হয় না, যদিও তার মূল্য অনেক সময় রক্ত দিয়ে দিতে হয়।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
বাংলাদেশ আজ আরেকটি তীক্ষ্ণ, বিবেকবান ও আপোষহীন কণ্ঠ হারাল। শরীফ ওসমান হাদী আর নেই। গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে থেমে গেল এক প্রতিবাদী জীবনের স্পন্দন। তাঁর মৃত্যু কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীর প্রস্থান নয়—এটি এ দেশের রাজনীতিতে সততা, সাহস ও নির্ভীক উচ্চারণের ওপর আরেকটি নির্মম আঘাত।
হাদীর মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট ও নির্মম। প্রকাশ্য রাজপথে, দিনের আলোয়, রাজনৈতিক মত ও অবস্থানের কারণে তাঁকে লক্ষ্য করে চালানো হয় গুলি। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা, আইসিইউতে দীর্ঘ সময় ধরে জীবন-মৃত্যুর দোলাচল—সবশেষে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যুই তাঁকে নিয়ে যায়। এই মৃত্যু আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার শূন্যতাকে নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদীর রাজনৈতিক জীবন ছিল আপোষহীনতার প্রতীক। ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি ধীরে ধীরে পরিণত হন একটি দৃঢ় কণ্ঠে—যে কণ্ঠ ক্ষমতার সামনে নত হয়নি, সুবিধার কাছে বিক্রি হয়নি। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে তিনি বারবার কথা বলেছেন গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদা নিয়ে। যে রাজনীতিতে চুপ থাকাই অনেক সময় নিরাপদ, সেখানে হাদী বেছে নিয়েছিলেন কথা বলার ঝুঁকি।
তাঁর সততা ছিল অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। তিনি জানতেন, সত্য বলা মানেই শত্রু বাড়ানো। তবু তিনি পিছু হটেননি। রাজনৈতিক সমঝোতা ও সুবিধাভোগী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন—রাজনীতি যদি মানুষের জন্য না হয়, তবে সে রাজনীতি অর্থহীন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি আপোষ করেননি, ভয় পাননি, এমনকি নিজের জীবনকেও ঝুঁকির বাইরে রাখেননি।
হাদীর ত্যাগ ছিল নীরব কিন্তু গভীর। রাজপথে আন্দোলন, বক্তৃতায় আগুন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট ভাষা—সবখানেই তিনি ছিলেন সক্রিয়। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পরিবার কিংবা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার চেয়ে তিনি বড় করে দেখেছেন আদর্শকে। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল ক্ষমতা অর্জনের সিঁড়ি নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দায়িত্ব।
তাঁর বক্তব্যগুলো আজও মানুষের মনে দাগ কেটে আছে। তিনি বলতেন, “গণতন্ত্র ভিক্ষা নয়, এটা মানুষের অধিকার।” আবার কখনো উচ্চারণ করতেন, “ভয় দেখিয়ে যদি সত্য থামানো যেত, তাহলে পৃথিবীতে কোনো বিপ্লব হতো না।” এসব বক্তব্য তাঁকে জনপ্রিয় করেছে তরুণদের কাছে, আবার বিপজ্জনক করে তুলেছে ক্ষমতাকেন্দ্রের চোখে।
শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু আমাদের সামনে কঠিন কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে। এই দেশে কি আপোষহীন রাজনীতির কোনো নিরাপদ জায়গা আছে? সত্য কথা বলার মূল্য কি শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়েই দিতে হবে? রাজনৈতিক সহিংসতা কি আমাদের গণতন্ত্রের স্থায়ী ভাষা হয়ে উঠছে?
আজ হাদী নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে। তাঁর রক্তের দাগ কেবল রাজপথে নয়, রাষ্ট্রের বিবেকেও লেগে আছে। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে—তিনি মাথা নত করেননি, আপোষ করেননি, এবং শেষ পর্যন্ত নিজের আদর্শের মূল্য জীবন দিয়ে চুকিয়েছেন।
শরীফ ওসমান হাদী হয়তো একটি জীবন হারালেন, কিন্তু তিনি একটি বার্তা রেখে গেলেন—সততা কখনো পরাজিত হয় না, যদিও তার মূল্য অনেক সময় রক্ত দিয়ে দিতে হয়।

আপনার মতামত লিখুন