পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতেন, এমন অভিযোগে পরিকল্পিতভাবে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামকে হত্যা এবং পরে তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়ীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের আগে সরকারের বাছাই করা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর জাহিদুল ইসলামেরও সেখানে পদায়নের কথা ছিল। তবে তিনি ওই দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। একই সময়ে তার কোর্সমেট ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দার পিলখানায় কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দিন ক্যাপ্টেন মাজহারুল ফোনে মেজর জাহিদকে জানান, সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বিডিআরের পোশাক পরা কিছু হিন্দিভাষী ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যাদের আগে কখনো পিলখানায় দেখেননি বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই ঘটনার পর মেজর জাহিদ বিভিন্ন সময় পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতেন এবং বিষয়টি জানার কারণেই তিনি সরকারের নজরদারিতে চলে আসেন।
এছাড়া সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০১৫ সালে তিনি চাকরি ছাড়েন এবং পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি ছাড়ার পরও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি অব্যাহত ছিল। একপর্যায়ে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিলে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে রূপনগরের বাসা থেকে পুলিশ পরিচয়ে মেজর জাহিদকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। একই রাতে তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুকন্যাকেও চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
জেবুন্নাহারের অভিযোগ, তাকে স্বামীকে 'জঙ্গি' হিসেবে স্বীকার করতে চাপ দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ডিবির কথিত ‘আয়নাঘরে’ তাদের ৪ মাস ৭ দিন গুম করে রাখা হয়েছিল।
গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন জেবুন্নাহার। এতে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন ডিসি মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি শাহীদ আলম, ডিবির তৎকালীন ডিসি কৃষ্ণ পদ রায়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ প্রধান আসামি একেএম শহীদুল হককে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
জেবুন্নাহার দাবি করেন, স্বামীকে হত্যার পর তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় এবং মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে একটি এবং তার বিরুদ্ধে দুটি জঙ্গিবাদের মামলা দায়ের করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।
যুগান্তরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জেবুন্নাহার বলেন, তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে 'জঙ্গি' আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনিও দীর্ঘদিন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন না হলে তিনি হয়তো আর মুক্তি পেতেন না।
অন্যদিকে, জেবুন্নাহারের ভাই জাহিদুল হক মজুমদার অভিযোগ করেন, নিহত মেজর জাহিদের মরদেহ দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হলেও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। পরে বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহ হস্তান্তরের পর আড়াই বছর পর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ আগস্ট ২০২৬
পিলখানা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতেন, এমন অভিযোগে পরিকল্পিতভাবে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামকে হত্যা এবং পরে তার স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যাকে গুম করে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় দায়ীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। মামলার প্রধান আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহীদুল হককে গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডের আগে সরকারের বাছাই করা সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মেজর জাহিদুল ইসলামেরও সেখানে পদায়নের কথা ছিল। তবে তিনি ওই দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। একই সময়ে তার কোর্সমেট ক্যাপ্টেন মো. মাজহারুল হায়দার পিলখানায় কর্মরত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের দিন ক্যাপ্টেন মাজহারুল ফোনে মেজর জাহিদকে জানান, সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয়েছে। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বিডিআরের পোশাক পরা কিছু হিন্দিভাষী ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যাদের আগে কখনো পিলখানায় দেখেননি বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ওই ঘটনার পর মেজর জাহিদ বিভিন্ন সময় পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতেন এবং বিষয়টি জানার কারণেই তিনি সরকারের নজরদারিতে চলে আসেন।
এছাড়া সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ২০১৫ সালে তিনি চাকরি ছাড়েন এবং পরিবার নিয়ে ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি ছাড়ার পরও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি অব্যাহত ছিল। একপর্যায়ে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিলে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাতে রূপনগরের বাসা থেকে পুলিশ পরিচয়ে মেজর জাহিদকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। একই রাতে তার স্ত্রী জেবুন্নাহার ও দুই শিশুকন্যাকেও চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
জেবুন্নাহারের অভিযোগ, তাকে স্বামীকে 'জঙ্গি' হিসেবে স্বীকার করতে চাপ দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ সময় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ডিবির কথিত ‘আয়নাঘরে’ তাদের ৪ মাস ৭ দিন গুম করে রাখা হয়েছিল।
গত বছরের ১০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন জেবুন্নাহার। এতে সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের সাবেক প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, সিটিটিসির সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামান, মিরপুর বিভাগের তৎকালীন ডিসি মাসুদ আহমেদ, রূপনগর থানার তৎকালীন ওসি শাহীদ আলম, ডিবির তৎকালীন ডিসি কৃষ্ণ পদ রায়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ প্রধান আসামি একেএম শহীদুল হককে এ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে একদিনের জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।
জেবুন্নাহার দাবি করেন, স্বামীকে হত্যার পর তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় এবং মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে মেজর জাহিদের বিরুদ্ধে একটি এবং তার বিরুদ্ধে দুটি জঙ্গিবাদের মামলা দায়ের করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট তিনি জামিনে মুক্তি পান।
যুগান্তরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জেবুন্নাহার বলেন, তার স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে 'জঙ্গি' আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং তিনিও দীর্ঘদিন অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন না হলে তিনি হয়তো আর মুক্তি পেতেন না।
অন্যদিকে, জেবুন্নাহারের ভাই জাহিদুল হক মজুমদার অভিযোগ করেন, নিহত মেজর জাহিদের মরদেহ দীর্ঘদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হলেও পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। পরে বেওয়ারিশ হিসেবে মরদেহ হস্তান্তরের পর আড়াই বছর পর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন