নিঝুম রাতের আঁধার চিরে যেখানে ট্রেনের চাকার খটখট শব্দ আর সিটির আওয়াজ শোনাই স্বাভাবিক, সেখানে ইদানীং শোনা যাচ্ছে তালা ভাঙা আর বৈদ্যুতিক তার কাটার নিঃশব্দ শব্দ। কিশোরগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রেলওয়ে স্টেশন এলাকা এখন চোর ও মাদকসেবী সিন্ডিকেটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। একে একে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার ও মালামাল চুরির ঘটনায় পুরো স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ীদের মনে নেমে এসেছে গভীর আতঙ্ক। চরম নিরাপত্তাহীনতায় রাত জাগছেন স্থানীয় ছোট-বড় দোকানদাররা।
তবে গল্পের মোড় ঘোরে রোববারের এক তীব্র রোদের দুপুরে—যখন চোরের কৌশল, স্থানীয়দের ধাওয়া এবং ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়ায় থাকা এক যুবকের নাম উঠে আসার মধ্য দিয়ে নাটকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার দিন দুপুরে তীব্র দাবদাহে স্টেশন এলাকার কিছু স্থানীয় তরুণ রেলওয়ে পুকুরে গোসল করতে যাচ্ছিলেন। পুকুরপাড়ের ছায়ায় পৌঁছাতেই তাদের নজর পড়ে 'শাহীন' নামে এক যুবকের দিকে। তার হাতে একটি ভারী ব্যাগ, আর চোখ-মুখে চরম অস্থিরতা। সন্দেহ জাগায় স্থানীয় তরুণরা শাহীনকে ঘিরে ধরেন এবং ব্যাগে কী আছে তা জানতে চান। চাঞ্চল্য ছড়ায় তখনই, যখন ব্যাগ খুলতেই দেখা যায় জ্বলজ্বল করছে তামার তার—ওজনে যা এক কেজিরও বেশি। এত বিপুল পরিমাণ তামার তার শাহীনের কাছে কীভাবে এলো, সে প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব সে দিতে পারছিল না। ঠিক তখনই নাটকে আবির্ভাব ঘটে মোস্তাকিম ও তার সহযোগী মুন্নার। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মোস্তাকিম বেশ দাপটের সাথেই দাবি করে বসে—এই তামার তার অন্য কারও নয়, তার নিজের! অভিযোগ রয়েছে, মোস্তাকিম সাধারণ কোনো নাম নয়, সে শহরের পূর্ব তারাপাশা এলাকার বাসিন্দা এবং জেলা শ্রমিকদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন দুলালের ছেলে। বাবার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে সে চুরির মালামাল নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার জোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু সচেতন স্থানীয়রা দমে যাননি। তারা মোস্তাকিমের কাছে তারের প্রকৃত মালিকানার প্রমাণ চান। মোস্তাকিম প্রথমে হরেক রকম অবান্তর ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে সে দাবি করে, স্টেশন এলাকার নির্দিষ্ট একটি স্থান থেকে সে এই তার সংগ্রহ করেছে। কিন্তু স্থানীয় তরুণরা তাকে সাথে নিয়ে সেই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে কোনো কাটা তার বা চুরির আলামত খুঁজে পাননি। জালিয়াতি ও মিথ্যা ধরা পড়ে যাচ্ছে দেখে মোস্তাকিম এক চতুর চাল খোলে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে "জরুরি ফোন এসেছে" বলার ভান করে ভিড়ের মাঝখান থেকে আস্তে করে সরে পড়ে এবং মুহূর্তেই চম্পট দেয়। মোস্তাকিম সটকে পড়ার পরপরই সুযোগ বুঝে শাহীনও চতুরতার সাথে স্থানীয়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উদ্ধার হওয়া মূল্যবান তামার তারগুলো প্রথমে একটি মুদি দোকানে সুরক্ষিত রাখেন এবং পরে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে জিআরপি (GRP) থানায় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন।
স্টেশন এলাকার দীর্ঘদিনের মুদি দোকানি এনামুল হোসেন নিজের ক্ষোভ ও আতঙ্কের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, "আমার দোকান থেকে কিছুদিন আগেই বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে গেছে। এলাকারই এক ছেলে এর সাথে জড়িত ছিল। প্রতিবেশী এবং চেনা মুখ ভেবে গতকাল তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে মাফ করতে করতে চোরদের সাহস আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। উদ্ধার হওয়া মালামাল এখন থানায় জমা আছে, কিন্তু আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?"
অন্যান্য ব্যবসায়ীরা জানান, গত কয়েক সপ্তাহে স্টেশন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। গভীর রাতে তো বটেই, গোধূলির আলো আঁধারেও সরিয়ে ফেলছে দোকানের মালামাল ও বৈদ্যুতিক তার। চোরেরা এখন আর শুধু ক্যাশবাক্সের টাকায় সীমাবদ্ধ নেই, তারা কেটে নিয়ে যাচ্ছে দোকানের প্রধান সংযোগ লাইনের তারও। ফলে পরদিন সকালে এসে দোকান খোলাই দুষ্কর হয়ে পড়ছে।
এক কাপড় ব্যবসায়ী হতাশার সাথে বলেন, "ব্যবসা করব নাকি রাত জেগে দোকান পাহারা দেব? তার কেটে নিয়ে গেলে পুরো দোকান অন্ধকার হয়ে যায়, বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক ব্যবসা চালানো অসম্ভব। আমরা অবিলম্বে এই চোর চক্রের মূলোৎপাটন চাই।"
সমগ্র বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠলে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাহাউদ্দিন ফারুকী ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, গত ২৪ জুলাই দিবাগত গভীর রাতে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের জুয়েল মাস্টারের দোকান, তার ভাইয়ের দোকান এবং দক্ষিণ পাশের এনামুলের মুদি দোকান—একযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা ঘটে। শুধু তা-ই নয়, একই রাতে আরও একটি দোকানে চুরির অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে দোকান মালিকের সময়োচিত চিৎকার এবং পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও স্থানীয়দের যৌথ ধাওয়ায় চোরের দল মালামাল ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, "আমরা চুরির পর থেকেই তদন্ত শুরু করেছিলাম। পুকুরপাড়ে স্থানীয়দের তৎপরতায় ব্যাগসহ চোরদের চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং এক কেজিরও বেশি তামার তার জব্দ করা সম্ভব হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা চুরির কথা স্বীকারও করেছিল, কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই কৌশলে ধাক্কাধাক্কি করে পালিয়ে যায়।"
তিনি আরও জানান, খবর পাওয়ার সাথে সাথেই জিআরপি থানার এসআই দীপক ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকৃত আলামত জব্দ করে থানায় নিয়ে আসেন। অভিযুক্ত মোস্তাকিমের বিষয়ে ওসি স্পষ্ট করে বলেন, "স্থানীয়দের নিকট থেকে আমরা জানতে পেরেছি মোস্তাকিম নিয়মিত মাদকসেবন করে এবং তার অতীত ইতিহাসও অপরাধমূলক। সে কার ছেলে বা কোন পরিচয়ের—তা আইনের কাছে বিবেচ্য নয়। মোস্তাকিমকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।" তবে কিছু স্থানীয় গুজবের অবসান ঘটিয়ে ওসি স্পষ্ট করেন যে, স্থানীয় জনতা তিন চোরকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। স্থানীয়রা কেবল উদ্ধার হওয়া তার থানায় জমা দিয়েছেন, কাউকে সরাসরি আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলেই আইনগত প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কঠোর করা হবে।
কিশোরগঞ্জ স্টেশন এলাকার এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ তার চুরির গল্প নয়, এটি উন্মোচন করে দিয়েছে একটি গভীর সামাজিক ক্ষতকে। মাদকাসক্তি কীভাবে তরুণ সমাজকে অপরাধের অন্ধ গলিতে ঠেলে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়াকে কীভাবে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—মোস্তাকিমের ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতেই এসব তরুণেরা বিদ্যুৎ ও তামার তার চুরির মতো অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। আর পেছনে যদি থাকে কোনো রাজনৈতিক নেতার হাত, তবে তা যেন তাদের অপরাধের লাইসেন্স এনে দেয়।
বর্তমানে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ী সমিতি ও সাধারণ দোকানদারদের দাবি একটাই, মোস্তাকিম্, মুন্না ও শাহীনসহ ঘটনার সাথে জড়িত সকল অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। চুরির পেছনে কোনো বড় চক্র বা চোরাই মালামাল কেনার অবৈধ মহাজন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং রাতের বেলায় জিআরপি ও আরএনবি-র নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে, যাতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তিই পারে কিশোরগঞ্জ স্টেশন এলাকায় আবার শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে—এমনটাই মনে করছেন ভুক্তভোগী জনতা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুলাই ২০২৬
নিঝুম রাতের আঁধার চিরে যেখানে ট্রেনের চাকার খটখট শব্দ আর সিটির আওয়াজ শোনাই স্বাভাবিক, সেখানে ইদানীং শোনা যাচ্ছে তালা ভাঙা আর বৈদ্যুতিক তার কাটার নিঃশব্দ শব্দ। কিশোরগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রেলওয়ে স্টেশন এলাকা এখন চোর ও মাদকসেবী সিন্ডিকেটের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। একে একে একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার ও মালামাল চুরির ঘটনায় পুরো স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ীদের মনে নেমে এসেছে গভীর আতঙ্ক। চরম নিরাপত্তাহীনতায় রাত জাগছেন স্থানীয় ছোট-বড় দোকানদাররা।
তবে গল্পের মোড় ঘোরে রোববারের এক তীব্র রোদের দুপুরে—যখন চোরের কৌশল, স্থানীয়দের ধাওয়া এবং ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রছায়ায় থাকা এক যুবকের নাম উঠে আসার মধ্য দিয়ে নাটকীয় পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার দিন দুপুরে তীব্র দাবদাহে স্টেশন এলাকার কিছু স্থানীয় তরুণ রেলওয়ে পুকুরে গোসল করতে যাচ্ছিলেন। পুকুরপাড়ের ছায়ায় পৌঁছাতেই তাদের নজর পড়ে 'শাহীন' নামে এক যুবকের দিকে। তার হাতে একটি ভারী ব্যাগ, আর চোখ-মুখে চরম অস্থিরতা। সন্দেহ জাগায় স্থানীয় তরুণরা শাহীনকে ঘিরে ধরেন এবং ব্যাগে কী আছে তা জানতে চান। চাঞ্চল্য ছড়ায় তখনই, যখন ব্যাগ খুলতেই দেখা যায় জ্বলজ্বল করছে তামার তার—ওজনে যা এক কেজিরও বেশি। এত বিপুল পরিমাণ তামার তার শাহীনের কাছে কীভাবে এলো, সে প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব সে দিতে পারছিল না। ঠিক তখনই নাটকে আবির্ভাব ঘটে মোস্তাকিম ও তার সহযোগী মুন্নার। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মোস্তাকিম বেশ দাপটের সাথেই দাবি করে বসে—এই তামার তার অন্য কারও নয়, তার নিজের! অভিযোগ রয়েছে, মোস্তাকিম সাধারণ কোনো নাম নয়, সে শহরের পূর্ব তারাপাশা এলাকার বাসিন্দা এবং জেলা শ্রমিকদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন দুলালের ছেলে। বাবার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে সে চুরির মালামাল নিজের বলে চালিয়ে দেওয়ার জোর চেষ্টা চালায়। কিন্তু সচেতন স্থানীয়রা দমে যাননি। তারা মোস্তাকিমের কাছে তারের প্রকৃত মালিকানার প্রমাণ চান। মোস্তাকিম প্রথমে হরেক রকম অবান্তর ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে সে দাবি করে, স্টেশন এলাকার নির্দিষ্ট একটি স্থান থেকে সে এই তার সংগ্রহ করেছে। কিন্তু স্থানীয় তরুণরা তাকে সাথে নিয়ে সেই নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে কোনো কাটা তার বা চুরির আলামত খুঁজে পাননি। জালিয়াতি ও মিথ্যা ধরা পড়ে যাচ্ছে দেখে মোস্তাকিম এক চতুর চাল খোলে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে "জরুরি ফোন এসেছে" বলার ভান করে ভিড়ের মাঝখান থেকে আস্তে করে সরে পড়ে এবং মুহূর্তেই চম্পট দেয়। মোস্তাকিম সটকে পড়ার পরপরই সুযোগ বুঝে শাহীনও চতুরতার সাথে স্থানীয়দের চোখ ফাঁকি দিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উদ্ধার হওয়া মূল্যবান তামার তারগুলো প্রথমে একটি মুদি দোকানে সুরক্ষিত রাখেন এবং পরে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে জিআরপি (GRP) থানায় নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন।
স্টেশন এলাকার দীর্ঘদিনের মুদি দোকানি এনামুল হোসেন নিজের ক্ষোভ ও আতঙ্কের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, "আমার দোকান থেকে কিছুদিন আগেই বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে গেছে। এলাকারই এক ছেলে এর সাথে জড়িত ছিল। প্রতিবেশী এবং চেনা মুখ ভেবে গতকাল তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে মাফ করতে করতে চোরদের সাহস আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। উদ্ধার হওয়া মালামাল এখন থানায় জমা আছে, কিন্তু আমাদের নিরাপত্তা কোথায়?"
অন্যান্য ব্যবসায়ীরা জানান, গত কয়েক সপ্তাহে স্টেশন এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। গভীর রাতে তো বটেই, গোধূলির আলো আঁধারেও সরিয়ে ফেলছে দোকানের মালামাল ও বৈদ্যুতিক তার। চোরেরা এখন আর শুধু ক্যাশবাক্সের টাকায় সীমাবদ্ধ নেই, তারা কেটে নিয়ে যাচ্ছে দোকানের প্রধান সংযোগ লাইনের তারও। ফলে পরদিন সকালে এসে দোকান খোলাই দুষ্কর হয়ে পড়ছে।
এক কাপড় ব্যবসায়ী হতাশার সাথে বলেন, "ব্যবসা করব নাকি রাত জেগে দোকান পাহারা দেব? তার কেটে নিয়ে গেলে পুরো দোকান অন্ধকার হয়ে যায়, বিদ্যুৎ ছাড়া আধুনিক ব্যবসা চালানো অসম্ভব। আমরা অবিলম্বে এই চোর চক্রের মূলোৎপাটন চাই।"
সমগ্র বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠলে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে জিআরপি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাহাউদ্দিন ফারুকী ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, গত ২৪ জুলাই দিবাগত গভীর রাতে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের জুয়েল মাস্টারের দোকান, তার ভাইয়ের দোকান এবং দক্ষিণ পাশের এনামুলের মুদি দোকান—একযোগে তিনটি প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনা ঘটে। শুধু তা-ই নয়, একই রাতে আরও একটি দোকানে চুরির অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে দোকান মালিকের সময়োচিত চিৎকার এবং পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ও স্থানীয়দের যৌথ ধাওয়ায় চোরের দল মালামাল ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। ওসি বাহাউদ্দিন ফারুকী পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, "আমরা চুরির পর থেকেই তদন্ত শুরু করেছিলাম। পুকুরপাড়ে স্থানীয়দের তৎপরতায় ব্যাগসহ চোরদের চ্যালেঞ্জ করা হয় এবং এক কেজিরও বেশি তামার তার জব্দ করা সম্ভব হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তারা চুরির কথা স্বীকারও করেছিল, কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পাওয়ার আগেই কৌশলে ধাক্কাধাক্কি করে পালিয়ে যায়।"
তিনি আরও জানান, খবর পাওয়ার সাথে সাথেই জিআরপি থানার এসআই দীপক ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকৃত আলামত জব্দ করে থানায় নিয়ে আসেন। অভিযুক্ত মোস্তাকিমের বিষয়ে ওসি স্পষ্ট করে বলেন, "স্থানীয়দের নিকট থেকে আমরা জানতে পেরেছি মোস্তাকিম নিয়মিত মাদকসেবন করে এবং তার অতীত ইতিহাসও অপরাধমূলক। সে কার ছেলে বা কোন পরিচয়ের—তা আইনের কাছে বিবেচ্য নয়। মোস্তাকিমকে গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।" তবে কিছু স্থানীয় গুজবের অবসান ঘটিয়ে ওসি স্পষ্ট করেন যে, স্থানীয় জনতা তিন চোরকে ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে—এমন তথ্য সঠিক নয়। স্থানীয়রা কেবল উদ্ধার হওয়া তার থানায় জমা দিয়েছেন, কাউকে সরাসরি আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলেই আইনগত প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কঠোর করা হবে।
কিশোরগঞ্জ স্টেশন এলাকার এই ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ তার চুরির গল্প নয়, এটি উন্মোচন করে দিয়েছে একটি গভীর সামাজিক ক্ষতকে। মাদকাসক্তি কীভাবে তরুণ সমাজকে অপরাধের অন্ধ গলিতে ঠেলে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়াকে কীভাবে অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে—মোস্তাকিমের ঘটনা তারই এক জলজ্যান্ত প্রমাণ। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতেই এসব তরুণেরা বিদ্যুৎ ও তামার তার চুরির মতো অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে। আর পেছনে যদি থাকে কোনো রাজনৈতিক নেতার হাত, তবে তা যেন তাদের অপরাধের লাইসেন্স এনে দেয়।
বর্তমানে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন এলাকার ব্যবসায়ী সমিতি ও সাধারণ দোকানদারদের দাবি একটাই, মোস্তাকিম্, মুন্না ও শাহীনসহ ঘটনার সাথে জড়িত সকল অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। চুরির পেছনে কোনো বড় চক্র বা চোরাই মালামাল কেনার অবৈধ মহাজন রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে এবং রাতের বেলায় জিআরপি ও আরএনবি-র নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে, যাতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।
আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তিই পারে কিশোরগঞ্জ স্টেশন এলাকায় আবার শান্তির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে—এমনটাই মনে করছেন ভুক্তভোগী জনতা।

আপনার মতামত লিখুন