ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটে? কুরআন-হাদিসে রূহ বের হওয়ার বর্ণনা


সোহেল রানা প্রধান
সোহেল রানা প্রধান
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬

মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটে? কুরআন-হাদিসে রূহ বের হওয়ার বর্ণনা
ছবি: সংগৃহীত । প্রতীকী

মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটে? কুরআন-হাদিসে রূহ বের হওয়ার বর্ণনা

মৃত্যু এমন এক অবশ্যম্ভাবী সত্য, যা থেকে পৃথিবীর কোনো মানুষই রেহাই পাবে না। একদিন সব সম্পর্ক, সম্পদ, পরিচয় ও অর্জন পেছনে ফেলে প্রত্যেককেই একাকী মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। তাই মৃত্যুর মুহূর্ত কেমন হবে, রূহ কীভাবে বের হবে, সেই সময় একজন মানুষের অবস্থা কেমন থাকে, এসব প্রশ্ন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই জাগে।

পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিস জানিয়ে দিয়েছে, মৃত্যুর সময় মুমিন ও পাপাচারী মানুষের অবস্থা এক নয়। কারও জন্য মৃত্যু হবে শান্তি, রহমত ও সুসংবাদের সূচনা, আবার কারও জন্য তা হবে কঠিন ও ভয়াবহ এক যাত্রার শুরু।

রূহ বের হওয়ার সময় কী ঘটে?

ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা মানুষের রূহ কবজ করেন। নেককার বান্দার রূহ অত্যন্ত কোমল ও সহজভাবে বের করে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, অবাধ্য ও পাপাচারীর রূহ কঠিনভাবে টেনে বের করা হয়।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, রূহ বের হওয়ার সময় শরীরের কোন অংশে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়?

এ বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশকে সবচেয়ে বেশি কষ্টের স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে কুরআনে মৃত্যুর সময় প্রাণ কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে, যা মৃত্যুর অনিবার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

কুরআনের আলোকে মৃত্যুর মুহূর্ত

১. প্রাণ যখন কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যায়

كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ ۝ وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ ۝ وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ

অর্থ:

"কখনো নয়! যখন প্রাণ কণ্ঠনালীতে এসে পৌঁছাবে, তখন বলা হবে, 'কে আছে ঝাড়ফুঁককারী?' আর সে নিশ্চিত বুঝে নেবে, এটাই বিদায়ের সময়।"

(সুরা আল-কিয়ামাহ: ২৬-২৮)

২. মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যম্ভাবী

وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ۖ ذَٰلِكَ مَا كُنتَ مِنْهُ تَحِيدُ

অর্থ:

"মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই সত্যসহ উপস্থিত হবে। এটাই সেই বিষয়, যেখান থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।"

(সুরা ক্বাফ: ১৯)

সহিহ হাদিসে মুমিন ও পাপাচারীর রূহ বের হওয়ার বর্ণনা

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যুর সময় মুমিন ও অবিশ্বাসীর অবস্থার পার্থক্য তুলে ধরেছেন।

মুমিনের রূহ সম্পর্কে তিনি বলেন—

فَتَخْرُجُ تَسِيلُ كَمَا تَسِيلُ الْقَطْرَةُ مِنْ فِي السِّقَاءِ

অর্থ:

"মুমিনের রূহ এমন সহজে বের হয়ে আসে, যেমন পানির মশক থেকে পানির একটি ফোঁটা সহজে বেরিয়ে আসে।"

অন্যদিকে অবিশ্বাসী বা পাপাচারীর রূহ সম্পর্কে তিনি বলেন—

كَالسَّفُّودِ يُنْتَزَعُ مِنَ الصُّوفِ الْمَبْلُولِ

অর্থ:

"তার রূহ এমনভাবে টেনে বের করা হয়, যেমন ভেজা পশমের ভেতর থেকে কাঁটাযুক্ত লোহার শিক টেনে বের করা হয়।"

(মুসনাদ আহমদ: ১৮৫৩৪, সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৫৩)

আমাদের জন্য শিক্ষা

মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হওয়া উচিত নেক আমল, আন্তরিক তওবা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা।

এই আলোচনা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—

  • মৃত্যু অবধারিত, তাই এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

  • নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তওবা ও সৎকর্ম মৃত্যুর সময় আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

  • মানুষের হক নষ্ট করা এবং পাপের ওপর অটল থাকা কঠিন পরিণতির কারণ হতে পারে।

  • কুরআন ও সহিহ হাদিসে যা নেই, তা ইসলামের নিশ্চিত বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

  • মৃত্যুর কথা স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে রেখে আখিরাতমুখী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করে।

শেষ কথা

মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং অনন্ত জীবনের সূচনা। তাই আমাদের প্রকৃত চিন্তা হওয়া উচিত, রূহ শরীরের কোন অংশ দিয়ে বের হবে বা কোথায় বেশি কষ্ট হবে, তা নয়। বরং চিন্তা হওয়া উচিত, মৃত্যুর সেই ক্ষণে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী বান্দা হিসেবে বিদায় নিতে পারব কি না।

আসুন, নিয়মিত ইবাদত, আন্তরিক তওবা, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের হক আদায় এবং সৎকর্মের মাধ্যমে সেই চূড়ান্ত সফরের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে, সহজ ও কল্যাণময় মৃত্যু দান করুন এবং উত্তম পরিণতি নসিব করুন। আমিন।


আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটে? কুরআন-হাদিসে রূহ বের হওয়ার বর্ণনা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ জুলাই ২০২৬

featured Image

মৃত্যুর মুহূর্তে কী ঘটে? কুরআন-হাদিসে রূহ বের হওয়ার বর্ণনা

মৃত্যু এমন এক অবশ্যম্ভাবী সত্য, যা থেকে পৃথিবীর কোনো মানুষই রেহাই পাবে না। একদিন সব সম্পর্ক, সম্পদ, পরিচয় ও অর্জন পেছনে ফেলে প্রত্যেককেই একাকী মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। তাই মৃত্যুর মুহূর্ত কেমন হবে, রূহ কীভাবে বের হবে, সেই সময় একজন মানুষের অবস্থা কেমন থাকে, এসব প্রশ্ন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই জাগে।

পবিত্র কুরআন ও সহিহ হাদিস জানিয়ে দিয়েছে, মৃত্যুর সময় মুমিন ও পাপাচারী মানুষের অবস্থা এক নয়। কারও জন্য মৃত্যু হবে শান্তি, রহমত ও সুসংবাদের সূচনা, আবার কারও জন্য তা হবে কঠিন ও ভয়াবহ এক যাত্রার শুরু।

রূহ বের হওয়ার সময় কী ঘটে?

ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা মানুষের রূহ কবজ করেন। নেককার বান্দার রূহ অত্যন্ত কোমল ও সহজভাবে বের করে নেওয়া হয়। পক্ষান্তরে, অবাধ্য ও পাপাচারীর রূহ কঠিনভাবে টেনে বের করা হয়।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, রূহ বের হওয়ার সময় শরীরের কোন অংশে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়?

এ বিষয়ে কুরআন ও সহিহ হাদিসে শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশকে সবচেয়ে বেশি কষ্টের স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তবে কুরআনে মৃত্যুর সময় প্রাণ কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যাওয়ার দৃশ্য অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে, যা মৃত্যুর অনিবার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

কুরআনের আলোকে মৃত্যুর মুহূর্ত

১. প্রাণ যখন কণ্ঠনালীতে পৌঁছে যায়

كَلَّا إِذَا بَلَغَتِ التَّرَاقِيَ ۝ وَقِيلَ مَنْ رَاقٍ ۝ وَظَنَّ أَنَّهُ الْفِرَاقُ

অর্থ:

"কখনো নয়! যখন প্রাণ কণ্ঠনালীতে এসে পৌঁছাবে, তখন বলা হবে, 'কে আছে ঝাড়ফুঁককারী?' আর সে নিশ্চিত বুঝে নেবে, এটাই বিদায়ের সময়।"

(সুরা আল-কিয়ামাহ: ২৬-২৮)

২. মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যম্ভাবী

وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ۖ ذَٰلِكَ مَا كُنتَ مِنْهُ تَحِيدُ

অর্থ:

"মৃত্যুযন্ত্রণা অবশ্যই সত্যসহ উপস্থিত হবে। এটাই সেই বিষয়, যেখান থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।"

(সুরা ক্বাফ: ১৯)

সহিহ হাদিসে মুমিন ও পাপাচারীর রূহ বের হওয়ার বর্ণনা

রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মৃত্যুর সময় মুমিন ও অবিশ্বাসীর অবস্থার পার্থক্য তুলে ধরেছেন।

মুমিনের রূহ সম্পর্কে তিনি বলেন—

فَتَخْرُجُ تَسِيلُ كَمَا تَسِيلُ الْقَطْرَةُ مِنْ فِي السِّقَاءِ

অর্থ:

"মুমিনের রূহ এমন সহজে বের হয়ে আসে, যেমন পানির মশক থেকে পানির একটি ফোঁটা সহজে বেরিয়ে আসে।"

অন্যদিকে অবিশ্বাসী বা পাপাচারীর রূহ সম্পর্কে তিনি বলেন—

كَالسَّفُّودِ يُنْتَزَعُ مِنَ الصُّوفِ الْمَبْلُولِ

অর্থ:

"তার রূহ এমনভাবে টেনে বের করা হয়, যেমন ভেজা পশমের ভেতর থেকে কাঁটাযুক্ত লোহার শিক টেনে বের করা হয়।"

(মুসনাদ আহমদ: ১৮৫৩৪, সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৫৩)

আমাদের জন্য শিক্ষা

মৃত্যু থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হওয়া উচিত নেক আমল, আন্তরিক তওবা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা।

এই আলোচনা থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—

  • মৃত্যু অবধারিত, তাই এর জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

  • নিয়মিত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তওবা ও সৎকর্ম মৃত্যুর সময় আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

  • মানুষের হক নষ্ট করা এবং পাপের ওপর অটল থাকা কঠিন পরিণতির কারণ হতে পারে।

  • কুরআন ও সহিহ হাদিসে যা নেই, তা ইসলামের নিশ্চিত বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

  • মৃত্যুর কথা স্মরণ মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে দূরে রেখে আখিরাতমুখী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করে।

শেষ কথা

মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং অনন্ত জীবনের সূচনা। তাই আমাদের প্রকৃত চিন্তা হওয়া উচিত, রূহ শরীরের কোন অংশ দিয়ে বের হবে বা কোথায় বেশি কষ্ট হবে, তা নয়। বরং চিন্তা হওয়া উচিত, মৃত্যুর সেই ক্ষণে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারী বান্দা হিসেবে বিদায় নিতে পারব কি না।

আসুন, নিয়মিত ইবাদত, আন্তরিক তওবা, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের হক আদায় এবং সৎকর্মের মাধ্যমে সেই চূড়ান্ত সফরের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে, সহজ ও কল্যাণময় মৃত্যু দান করুন এবং উত্তম পরিণতি নসিব করুন। আমিন।



দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ