একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুবসমাজের ওপর। আর একজন মুসলিম যুবকের ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি গড়ে ওঠে আল্লাহর ঘরের সঙ্গে তার সম্পর্কের মাধ্যমে। মসজিদ শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি ঈমান, চরিত্র, জ্ঞান, নেতৃত্ব এবং সমাজ গঠনের এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র।
কিন্তু উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ধীরে ধীরে মসজিদ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটি শুধু বর্তমানের একটি সংকট নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
আজ যদি যুবকদের হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে আগামী ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছর পর মসজিদের কাতার পূর্ণ করবে কারা? কে আজান দেবে, কে কুরআনের শিক্ষা ছড়িয়ে দেবে, আর কে ইসলামের আদর্শকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হবে আজকের যুবসমাজের দিকেই।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তরুণদের জীবনযাত্রাও বদলেছে। কর্মব্যস্ততা, ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেককে ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার ঘাটতি, পরিবারে ইসলামী পরিবেশের অভাব, মসজিদে যুববান্ধব কার্যক্রমের স্বল্পতা, কখনো প্রবীণদের কঠোর আচরণ এবং নেতিবাচক বন্ধুমহলের প্রভাবও এ দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ফলে অনেক তরুণের কাছে মসজিদ আর আপন ঠিকানা হয়ে উঠছে না।
ইসলামের সূচনালগ্নে মসজিদ ছিল যুবকদের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে তারা শুধু নামাজই আদায় করতেন না, বরং কুরআন শিক্ষা, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, সমাজসেবা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার শিক্ষাও গ্রহণ করতেন।
ইসলামের ইতিহাসে হজরত আলী (রা.), হজরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.), হজরত তালহা (রা.), হজরত মুসআব ইবন উমাইর (রা.) এবং হজরত উসামা ইবন যায়েদ (রা.)-এর মতো অসংখ্য তরুণ সাহাবির উজ্জ্বল অবদান রয়েছে। অল্প বয়সেই তারা ইসলামের জন্য অসাধারণ ত্যাগ ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন, তাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى
অর্থ: "নিশ্চয়ই তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল। আর আমরা তাদের হিদায়াত আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।"
(সুরা আল-কাহফ: ১৩)
আরও ইরশাদ হয়েছে,
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
অর্থ: "নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। অতএব আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে আহ্বান করো না।"
(সুরা আল-জিন: ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন... তাদের একজন সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে।"
(সহিহ বুখারি: ৬৬০, সহিহ মুসলিম: ১০৩১)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন,
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান হলো মসজিদসমূহ।"
(সহিহ মুসলিম: ৬৭১)
মসজিদমুখী একজন তরুণের জীবন শুধু ধর্মীয়ভাবেই সমৃদ্ধ হয় না, বরং তার ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
মসজিদমুখী হলে একজন যুবক:
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ইমাম, খতিব, আলেম, দাঈ ও সমাজনেতা।
যুবকদের মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
যুবকরাই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি, আর মসজিদ তাদের আত্মিক শক্তির প্রধান উৎস। যে সমাজের তরুণরা মসজিদমুখী, সে সমাজ নৈতিকতা, আদর্শ ও নেতৃত্বে সমৃদ্ধ হয়। আর যে সমাজের তরুণরা মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সেখানে ধীরে ধীরে মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দেয়।
তাই যুবকদের সমালোচনা নয়, বরং ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে তাদের মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সময়ের দাবি। রাসুলুল্লাহ (সা.) যেমন যুবকদের বিশ্বাস করেছেন, দায়িত্ব দিয়েছেন এবং নেতৃত্বের সুযোগ করে দিয়েছেন, তেমনি আমাদেরও তাদের জন্য মসজিদের দরজা আরও উন্মুক্ত করতে হবে।
তরুণদের পদচারণায় মুখরিত একটি মসজিদই পারে একটি আদর্শ, নৈতিক ও আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে। আর সেই সমাজ নির্মাণের প্রধান কারিগর হবে ঈমানদীপ্ত, সচেতন ও দায়িত্বশীল যুবসমাজ।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুবসমাজের ওপর। আর একজন মুসলিম যুবকের ব্যক্তিত্ব, আদর্শ ও নৈতিকতার অন্যতম ভিত্তি গড়ে ওঠে আল্লাহর ঘরের সঙ্গে তার সম্পর্কের মাধ্যমে। মসজিদ শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের স্থান নয়; এটি ঈমান, চরিত্র, জ্ঞান, নেতৃত্ব এবং সমাজ গঠনের এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র।
কিন্তু উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো, সমাজের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ ধীরে ধীরে মসজিদ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এটি শুধু বর্তমানের একটি সংকট নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।
আজ যদি যুবকদের হৃদয়ে মসজিদের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করা না যায়, তাহলে আগামী ১০, ২০ কিংবা ৩০ বছর পর মসজিদের কাতার পূর্ণ করবে কারা? কে আজান দেবে, কে কুরআনের শিক্ষা ছড়িয়ে দেবে, আর কে ইসলামের আদর্শকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হবে আজকের যুবসমাজের দিকেই।
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তরুণদের জীবনযাত্রাও বদলেছে। কর্মব্যস্ততা, ক্যারিয়ারের প্রতিযোগিতা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেককে ধর্মীয় জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার ঘাটতি, পরিবারে ইসলামী পরিবেশের অভাব, মসজিদে যুববান্ধব কার্যক্রমের স্বল্পতা, কখনো প্রবীণদের কঠোর আচরণ এবং নেতিবাচক বন্ধুমহলের প্রভাবও এ দূরত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ফলে অনেক তরুণের কাছে মসজিদ আর আপন ঠিকানা হয়ে উঠছে না।
ইসলামের সূচনালগ্নে মসজিদ ছিল যুবকদের প্রাণকেন্দ্র। সেখানে তারা শুধু নামাজই আদায় করতেন না, বরং কুরআন শিক্ষা, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, সমাজসেবা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার শিক্ষাও গ্রহণ করতেন।
ইসলামের ইতিহাসে হজরত আলী (রা.), হজরত যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.), হজরত তালহা (রা.), হজরত মুসআব ইবন উমাইর (রা.) এবং হজরত উসামা ইবন যায়েদ (রা.)-এর মতো অসংখ্য তরুণ সাহাবির উজ্জ্বল অবদান রয়েছে। অল্প বয়সেই তারা ইসলামের জন্য অসাধারণ ত্যাগ ও নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন, তাদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এবং নেতৃত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
إِنَّهُمْ فِتْيَةٌ آمَنُوا بِرَبِّهِمْ وَزِدْنَاهُمْ هُدًى
অর্থ: "নিশ্চয়ই তারা ছিল কয়েকজন যুবক, যারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান এনেছিল। আর আমরা তাদের হিদায়াত আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।"
(সুরা আল-কাহফ: ১৩)
আরও ইরশাদ হয়েছে,
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
অর্থ: "নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। অতএব আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে আহ্বান করো না।"
(সুরা আল-জিন: ১৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
"সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাঁর আরশের ছায়ায় আশ্রয় দেবেন... তাদের একজন সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে।"
(সহিহ বুখারি: ৬৬০, সহিহ মুসলিম: ১০৩১)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন,
"আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান হলো মসজিদসমূহ।"
(সহিহ মুসলিম: ৬৭১)
মসজিদমুখী একজন তরুণের জীবন শুধু ধর্মীয়ভাবেই সমৃদ্ধ হয় না, বরং তার ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
মসজিদমুখী হলে একজন যুবক:
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ইমাম, খতিব, আলেম, দাঈ ও সমাজনেতা।
যুবকদের মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে সম্মিলিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।
যুবকরাই একটি জাতির সবচেয়ে বড় শক্তি, আর মসজিদ তাদের আত্মিক শক্তির প্রধান উৎস। যে সমাজের তরুণরা মসজিদমুখী, সে সমাজ নৈতিকতা, আদর্শ ও নেতৃত্বে সমৃদ্ধ হয়। আর যে সমাজের তরুণরা মসজিদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, সেখানে ধীরে ধীরে মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দেয়।
তাই যুবকদের সমালোচনা নয়, বরং ভালোবাসা, প্রজ্ঞা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে তাদের মসজিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা সময়ের দাবি। রাসুলুল্লাহ (সা.) যেমন যুবকদের বিশ্বাস করেছেন, দায়িত্ব দিয়েছেন এবং নেতৃত্বের সুযোগ করে দিয়েছেন, তেমনি আমাদেরও তাদের জন্য মসজিদের দরজা আরও উন্মুক্ত করতে হবে।
তরুণদের পদচারণায় মুখরিত একটি মসজিদই পারে একটি আদর্শ, নৈতিক ও আলোকিত সমাজ গড়ে তুলতে। আর সেই সমাজ নির্মাণের প্রধান কারিগর হবে ঈমানদীপ্ত, সচেতন ও দায়িত্বশীল যুবসমাজ।

আপনার মতামত লিখুন