ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

হারিকেনের আলো থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬

হারিকেনের আলো থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম
ছবি: সংগৃহীত

একসময় সন্ধ্যা নামলেই পড়ার টেবিলের একমাত্র সঙ্গী ছিল হারিকেন। এলাকায় তখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। প্রতিদিন স্কুলে যেতে হাঁটতে হতো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ। অভাব-অনটন আর সীমিত সুযোগের সেই শৈশব পেরিয়ে এবার ৪৭তম বিসিএসে প্রথমবার অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন নেত্রকোনার তানভীর রহমান।

রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে তানভীর রহমানের এই অসাধারণ সাফল্যে আনন্দের জোয়ার বইছে নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামে। পরিবার, স্বজন এবং এলাকাবাসী সবাই গর্বিত এই কৃতী সন্তানের অর্জনে।

তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুর রহমান ও রিনা পারভীনের ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার বাবা নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

ছেলের এমন সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. আব্দুর রহমান বলেন, ফল প্রকাশের খবর শুনেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! তানভীর ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও আগ্রহ ছিল তার।

তিনি জানান, গ্রামের বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে যেত তানভীর। তখন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয় রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করত। সীমিত সামর্থ্য কখনো তার স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি।

মা রিনা পারভীনও স্মৃতিচারণ করে বলেন, একসময় একটি ছোট টিনশেড ঘরেই পুরো পরিবার থাকত। সেখানেই খাওয়া, থাকা আর পড়াশোনা চলত। সংসারে কষ্ট ছিল, কিন্তু ছেলে কখনো হতাশ হয়নি। ছোটবেলা থেকেই সময়ের মূল্য বুঝত। অকারণে সময় নষ্ট না করে নিজের লক্ষ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তার নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলই আজকের এই অর্জন।

তানভীরের শিক্ষাজীবনও ছিল সাফল্যে ভরা। ২০১৯ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার ঘটনা অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও পরিবারের ভাষ্য, এটি হঠাৎ পাওয়া কোনো সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নিয়মিত অধ্যবসায় এবং আত্মনিবেদিত পরিশ্রমের স্বীকৃতি।

তানভীরের ছোটবোন সাদিয়া বলেন, ভাই সব সময় নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন। নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তাই তার এই সাফল্যে আমরা অবাক নই, বরং ভীষণ গর্বিত।

এলাকাবাসীর বিশ্বাস, একজন শিক্ষক পরিবারের সন্তান হয়েও দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করে তানভীর প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন পূরণে অর্থ নয়, প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম।

তাদের প্রত্যাশা, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালন করে তানভীর রহমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও সমুন্নত করবেন। পাশাপাশি তার এই অর্জন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীকে প্রতিকূলতার মধ্যেও বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করবে।

হারিকেনের আলোয় শুরু হওয়া এক কিশোরের স্বপ্নযাত্রা আজ পৌঁছেছে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সেবার দ্বারপ্রান্তে। তানভীর রহমানের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়, এটি বিশ্বাস, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


হারিকেনের আলো থেকে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

featured Image

একসময় সন্ধ্যা নামলেই পড়ার টেবিলের একমাত্র সঙ্গী ছিল হারিকেন। এলাকায় তখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। প্রতিদিন স্কুলে যেতে হাঁটতে হতো প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ। অভাব-অনটন আর সীমিত সুযোগের সেই শৈশব পেরিয়ে এবার ৪৭তম বিসিএসে প্রথমবার অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন নেত্রকোনার তানভীর রহমান।

রোববার (২৮ জুন) প্রকাশিত ৪৭তম বিসিএসের ফলাফলে তানভীর রহমানের এই অসাধারণ সাফল্যে আনন্দের জোয়ার বইছে নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামে। পরিবার, স্বজন এবং এলাকাবাসী সবাই গর্বিত এই কৃতী সন্তানের অর্জনে।

তানভীর রহমান নেত্রকোনা সদর উপজেলার রায়দুম বাগড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুর রহমান ও রিনা পারভীনের ছেলে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার বাবা নেত্রকোনার শামছুদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

ছেলের এমন সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা মো. আব্দুর রহমান বলেন, ফল প্রকাশের খবর শুনেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে! তানভীর ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও আগ্রহ ছিল তার।

তিনি জানান, গ্রামের বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব ছিল প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে যেত তানভীর। তখন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় হারিকেন কিংবা মোমবাতির আলোয় রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করত। সীমিত সামর্থ্য কখনো তার স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি।

মা রিনা পারভীনও স্মৃতিচারণ করে বলেন, একসময় একটি ছোট টিনশেড ঘরেই পুরো পরিবার থাকত। সেখানেই খাওয়া, থাকা আর পড়াশোনা চলত। সংসারে কষ্ট ছিল, কিন্তু ছেলে কখনো হতাশ হয়নি। ছোটবেলা থেকেই সময়ের মূল্য বুঝত। অকারণে সময় নষ্ট না করে নিজের লক্ষ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তার নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রমের ফলই আজকের এই অর্জন।

তানভীরের শিক্ষাজীবনও ছিল সাফল্যে ভরা। ২০১৯ সালে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ২০২৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েই পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়ার ঘটনা অনেকের কাছে বিস্ময়কর হলেও পরিবারের ভাষ্য, এটি হঠাৎ পাওয়া কোনো সাফল্য নয়; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, নিয়মিত অধ্যবসায় এবং আত্মনিবেদিত পরিশ্রমের স্বীকৃতি।

তানভীরের ছোটবোন সাদিয়া বলেন, ভাই সব সময় নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন করতেন। নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। তাই তার এই সাফল্যে আমরা অবাক নই, বরং ভীষণ গর্বিত।

এলাকাবাসীর বিশ্বাস, একজন শিক্ষক পরিবারের সন্তান হয়েও দেশের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অর্জন করে তানভীর প্রমাণ করেছেন, বড় স্বপ্ন পূরণে অর্থ নয়, প্রয়োজন দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রম।

তাদের প্রত্যাশা, দেশের পররাষ্ট্র সেবায় দায়িত্ব পালন করে তানভীর রহমান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও সমুন্নত করবেন। পাশাপাশি তার এই অর্জন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীকে প্রতিকূলতার মধ্যেও বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম করতে অনুপ্রাণিত করবে।

হারিকেনের আলোয় শুরু হওয়া এক কিশোরের স্বপ্নযাত্রা আজ পৌঁছেছে দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সেবার দ্বারপ্রান্তে। তানভীর রহমানের এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জনের গল্প নয়, এটি বিশ্বাস, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ