শিক্ষা

সন্তানের হাতে কি তুলছেন—ভবিষ্যৎ, নাকি ধ্বংসের চাবিকাঠি- কিশোরগঞ্জ -২ এর সাংসদ জালাল উদ্দিন।

সন্তানের হাসি মুখ দেখতে, কিংবা আর দশজনের সামনে নিজের সামাজিক 'স্ট্যাটাস' জাহির করতে গিয়ে সেই অন্যায্য আবদার পূরণ করছেন অনেক বাবা-মা।

⎙ প্রিন্ট
সন্তানের হাতে কি তুলছেন—ভবিষ্যৎ, নাকি ধ্বংসের চাবিকাঠি- কিশোরগঞ্জ -২ এর সাংসদ জালাল উদ্দিন।
সন্তানের হাতে অতি আদরে তুলে দিচ্ছেন ধ্বংসের চাবিকাঠি - কিশোরগঞ্জ ২ এর সাংসদ এডঃ জালাল উদ্দিন।
⌖ পাকুন্দিয়া
একটি শিশু যখন হেঁটে যেতে শেখেনি, তখনও কান্না থামানোর সহজ ওষুধ হিসেবে তার হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে জ্বলজ্বলে পর্দার স্মার্টফোন। আর সেই শিশুই যখন একটু বড় হয়ে প্রাথমিকে পড়া শেষ করে মাধ্যমিকের কোঠায় পা রাখছে, তখন অভিভাবকের কাছে তার আবদার দাঁড়াচ্ছে—একখানা দ্রুতগতির মোটরসাইকেল। সন্তানের হাসি মুখ দেখতে, কিংবা আর দশজনের সামনে নিজের সামাজিক 'স্ট্যাটাস' জাহির করতে গিয়ে সেই অন্যায্য আবদার পূরণও করছেন অনেক বাবা-মা। কিন্তু বুক পকেটে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর হাতে একটা দ্রুতগতির মোটরসাইকেল তুলে দিয়ে অভিভাবকেরা কি আদতে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ছেন, নাকি তাদের এক অনিশ্চিত ও ধ্বংসাত্মক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন?
২২ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার ) সকালের কুয়াশাছোঁয়া রোদে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ঠিক এই প্রশ্নটিই গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উচ্চারিত হলো। সোনালী স্বপ্ন ফাউন্ডেশন আয়োজিত ২০২৫ সালের বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন অভিভাবকদের এই আত্মঘাতী প্রবণতা নিয়ে তুলোধোনা করেন এবং তাদের বিবেকের কাছে এক বড় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।​​আজকের কিশোর-কিশোরীদের হাতে থাকা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন কেবল আর যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি রূপ নিয়েছে এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে। সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “সন্তানের অন্যায় আবদার পূরণ করতে গিয়ে তাকে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিনে দিচ্ছেন। কিন্তু আপনি কি ভেবে দেখেছেন—মোবাইল কিনে দিলেন, নাকি আপনার সন্তানকে ধ্বংসের পথ তৈরি করে দিলেন?”
​অভিভাবকেরা ভাবেন, সন্তান ঘরে বসে মোবাইল টিপছে, মানে সে নিরাপদেই আছে। চোখের সামনেই তো আছে! কিন্তু এই চোখের সামনের ভার্চুয়াল জগতই এখন সবচেয়ে বড় বিপদের নাম। স্ক্রিনের ওপারে সে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে বা কীসে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে—তার খবর কতজন অভিভাবক রাখেন? ​আজকের আধুনিক যুগের কিশোর-কিশোরীরা গেম খেলার ছলে ঢুকছে 'অনলাইন জুয়া' কিংবা পর্নোগ্রাফির মারাত্মক জগতে। দিনের পর দিন সামাজিক মিথস্ক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা মানসিক বিষাদ, বিষণ্নতা এবং মনোযোগের অভাবে ভুগছে। রাতের পর রাত জেগে ফোনে স্ক্রোল করার ফলে তারা শৈশব ও কৈশোরের মূল সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছে। অথচ সন্তানকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে দেওয়ার অজুহাতে অভিভাবকেরাই নিজ হাতে তুলে দিচ্ছেন এই ধীরগতির বিষ।​​অনুষ্ঠানে এমপি জালাল উদ্দিন অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে তুলে ধরেন একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মৃতি, যা উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়। আফতাবউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের একটি স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জ জেলার মধ্যে প্রথম হওয়া ওই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক চরম মেধাবী শিক্ষার্থী মোটরসাইকেলে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে এক অটোরিকশার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায়। ​একটি পরিবার, একটি বিদ্যালয় এবং একটি পুরো এলাকার আলো এক নিমেষেই নিভে যায় সেই সড়ক দুর্ঘটনায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? ওই ১৩ বা ১৪ বছর বয়সী কিশোরটি, নাকি সেই অভিভাবক যিনি তার অন্যায্য আবদারের কাছে মাথা নত করে তাকে একটি চার চাকা কিংবা দুই চাকার দ্রুতগতির বাহন কিনে দিয়েছিলেন? ​সংসদ সদস্য স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি ওই শিক্ষার্থীকে দায়ী করি না। ছোটরা আবদার করতেই পারে, কিন্তু তাদের সব অন্যায় আবদার কি আমাদের পূরণ করতে হবে? এই মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুর দায় অভিভাবকদেরও নিতে হবে।”​​আজকালের কিশোরদের হাতে যেসব মোটরসাইকেল দেখা যায়—অ্যাপাচি, পালসার বা অন্যান্য স্পোর্টস বাইক—সেগুলোর ইঞ্জিন ক্ষমতা ও গতি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যা চালান, অষ্টম বা নবম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থীও বাবার কাছে ঠিক একই বাইকের দাবি বসে। কিন্তু বিজ্ঞান ও মানব মনস্তত্ত্ব বলে, এই বয়সের কিশোরদের মস্তিষ্ক বা স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়া এত উচ্চগতি সামলানোর জন্য প্রস্তুত নয়। ​এমপি জালাল উদ্দিন অত্যন্ত যুক্তিযুক্তভাবে ব্যাখ্যা করেন, “এসব মোটরসাইকেলের গতি মুহূর্তের মধ্যেই ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটারে উঠে যায়। কিন্তু এই অতীব গতি নিয়ন্ত্রণ করার মতো শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বা পরিপক্বতা অষ্টম, নবম বা দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের থাকে না। ফলে রাস্তায় একটি ছোট ভুল বা নিয়ন্ত্রণ হারানোর মাসুল তাদের দিতে হয় জীবন দিয়ে।”​গাড়ির গতির তীব্র রোমাঞ্চ এবং সহপাঠীদের সামনে ভাব জাহির করার প্রবণতা এই বয়সে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এই প্রবৃত্তি যখন নিয়ন্ত্রণহীন গতির মোহে পড়ে, তখন রাস্তা রূপ নেয় রক্তাত শ্মশানে। ​মোটরসাইকেল এবং নিয়ন্ত্রণহীন মোবাইল কেবল সড়ক দুর্ঘটনা বা পড়াশোনার ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি কিশোরদের এক বিপজ্জনক অন্ধকার জগতের দিকে ধাবিত করে। ​বাইক হাতে পেয়ে কিশোরদের চলাফেরা ও সামাজিক পরিসর রাতারাতি বদলে যায়। শুরু হয় বেপরোয়া আড্ডা, দূর-দূরান্তে অহেতুক ঘোরাঘুরি এবং তথাকথিত ‘বাইকার গ্যাং’ কালচার। এই বন্ধুমহল যখন বড় হয়, তখন ভালো সংসঙ্গের চেয়ে খারাপ সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। একপর্যায়ে এদের অনেকেই জড়িয়ে পড়ে মাদক সেবন, ইভটিজিং, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন কিশোর গ্যাং ভিত্তিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। একবার মাদকের নীল দংশনে জড়িয়ে পড়লে সেই আলোহীন গহ্বর থেকে ফিরে আসা যে কতটা কঠিন, তা আজ আমাদের সমাজের অগণিত ভুক্তভোগী পরিবার জানে।
​একজন সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, একজন বড় ভাই ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আকুল আবেদন জানিয়ে অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “আপনারা সন্তানদের এমন সর্বনাশ করবেন না। তাদের হাতে অন্ধভাবে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল তুলে দেবেন না, মোটরসাইকেল কিনে দেবেন না। তারা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, সেদিকে কঠোর নজর রাখুন।” ​তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, সন্তানকে ভালো ভালোবাসা মানে তার সব ইচ্ছা পূরণ করা নয়। সঠিক সময়ে কোনটা দেওয়া উচিত আর কোনটা দেওয়া উচিত নয়—তা কঠোরভাবে বিচার করাই একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের কাজ।সন্তানের প্রতি অবহেলা বা অতিরিক্ত আস্কারা—দুটোই সমান ক্ষতিকর।​​জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ভিপি তৌফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে এই আবেগঘন ও বার্তাবহ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পাকুন্দিয়া থানার ওসি মো. হেলাল উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আহমেদ ফারুক খোকন, আহ্বায়ক মিজানুর রহমান খান সুমন এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহীন আলম জনি।
​অনুষ্ঠানে জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ২৭০ জন কৃতী ও মেধা অর্জনকারী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা, ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু সোনালী স্বপ্নের সনদ হাতে পাওয়ার পাশাপাশি এই সংবর্ধনা সভা অভিভাবক ও সমাজ সচেতন মানুষদের জন্য রেখে গেল এক মস্ত বড় শিক্ষণীয় বার্তা।
​আজ আমাদের গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে—আমরা কি সন্তানদের হাতে স্বপ্নের আলো দেব, নাকি তাদের অনিশ্চিত গতির মোহে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেব? উপহার হিসেবে দামি মোবাইল কিংবা দ্রুতগতির বাইক নয়; আজ কিশোর-কিশোরীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা, অভিভাবকদের গুণগত সময়, ভালোবাসা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। সন্তানের লাগামহীন আবদারকে 'না' বলতে শেখাই হোক আজ প্রতিটি অভিভাবকের প্রধান অঙ্গীকার।
tapashmainul70@gmail.com

সম্পর্কিত সংবাদ