ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

‘মা-বাবাকে অপমান করত, বাচ্চাদের মারত’: ব্রাইট স্কুলের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ



‘মা-বাবাকে অপমান করত, বাচ্চাদের মারত’: ব্রাইট স্কুলের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ
ছবি: প্রতিনিধি

রাজধানীর ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজে দীর্ঘদিন ধরে চলা ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুন নাহারের আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও কয়েকজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ— এটি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং যেন একটি 'টর্চার সেল'।

সাবিকুন নাহারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বছরের পর বছর ধরে চলা নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সামনে আসতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্পষ্ট অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা লিটন এবং তার কয়েকজন সহকর্মী মিলে স্কুলটিকে একটি টর্চার সেলে পরিণত করেছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষিকা মাহমুদা, সানজিদা এবং রিফাত নিয়মতান্ত্রিকভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালাতেন। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে শিক্ষার্থীদের নির্দয়ভাবে শারীরিক শাস্তি দেওয়া এবং সামান্য অজুহাতে স্কুল থেকে টিসি (ছাড়পত্র) দিয়ে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের চর্চা।

তদন্তে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের নির্যাতনের ধরন ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও মানসিক বিকারগ্রস্ত। সামান্য কোনো বিষয়েও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের স্কুলে ডেকে আনা হতো। এরপর সবার সামনে, অন্যান্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে অভিভাবকদের চরমভাবে অপমান ও অপদস্থ করা হতো।

এক ভুক্তভোগী অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

"ওরা শুধু বাচ্চাদের মারত বা বকত তা নয়, আমাদের ডেকে নিয়ে সবার সামনে জুনিয়র শিক্ষকদের দিয়ে অপমান করাত। একটা ১৬-১৭ বছরের বাচ্চার সামনে তার মা-বাবাকে অপমান করলে সেই বাচ্চার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা এই নিষ্ঠুর কর্তৃপক্ষ কখনোই বুঝতে চায়নি।

স্কুল কর্তৃপক্ষের এই ভয়াবহ ও অপমানজনক আচরণের প্রভাব শুধু স্কুল ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকত না, তা ছড়াত শিক্ষার্থীদের ঘরেও। স্কুল থেকে অপমানিত ও ভর্ৎসিত হয়ে বাড়ি ফেরার পর অনেক অভিভাবক তীব্র মানসিক চাপে ভুগতেন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সন্তানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়তেন।

এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়ত। একদিকে স্কুলের টর্চার সেল, অন্যদিকে বাড়িতে মা-বাবার ক্ষোভ— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ত এবং পরিবারের সাথে তাদের এক ধরণের মানসিক দূরত্ব ও দেয়াল তৈরি হতো। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহারও এমনই এক দমবন্ধকর পরিবেশ ও চরম মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়ে, কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই আত্মহত্যার ঘটনার পর স্কুলটির সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ রানা লিটন, শিক্ষিকা মাহমুদা, সানজিদা, রিফাতসহ এই টর্চার সেলের সাথে জড়িত সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবিলম্ব গ্রেফতার এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

অভিভাবকদের দাবি, এই ঘটনার যদি আজ দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হয়, তবে ব্রাইট স্কুলের মতো আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন 'টর্চার সেল' গড়ে উঠবে এবং আরও বহু সাবিকুন নাহারকে অকালে প্রাণ হারাতে হবে।

এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


‘মা-বাবাকে অপমান করত, বাচ্চাদের মারত’: ব্রাইট স্কুলের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ২২ মে ২০২৬

featured Image

রাজধানীর ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজে দীর্ঘদিন ধরে চলা ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুন নাহারের আত্মহত্যার ঘটনায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও কয়েকজন শিক্ষিকার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ— এটি কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং যেন একটি 'টর্চার সেল'।

সাবিকুন নাহারের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বছরের পর বছর ধরে চলা নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র সামনে আসতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্পষ্ট অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা লিটন এবং তার কয়েকজন সহকর্মী মিলে স্কুলটিকে একটি টর্চার সেলে পরিণত করেছিলেন।

অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষিকা মাহমুদা, সানজিদা এবং রিফাত নিয়মতান্ত্রিকভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ন চালাতেন। তুচ্ছাতিতুচ্ছ কারণে শিক্ষার্থীদের নির্দয়ভাবে শারীরিক শাস্তি দেওয়া এবং সামান্য অজুহাতে স্কুল থেকে টিসি (ছাড়পত্র) দিয়ে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের চর্চা।

তদন্তে জানা যায়, এই প্রতিষ্ঠানের নির্যাতনের ধরন ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও মানসিক বিকারগ্রস্ত। সামান্য কোনো বিষয়েও শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের স্কুলে ডেকে আনা হতো। এরপর সবার সামনে, অন্যান্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উপস্থিতিতে অভিভাবকদের চরমভাবে অপমান ও অপদস্থ করা হতো।

এক ভুক্তভোগী অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:

"ওরা শুধু বাচ্চাদের মারত বা বকত তা নয়, আমাদের ডেকে নিয়ে সবার সামনে জুনিয়র শিক্ষকদের দিয়ে অপমান করাত। একটা ১৬-১৭ বছরের বাচ্চার সামনে তার মা-বাবাকে অপমান করলে সেই বাচ্চার মানসিক অবস্থা কেমন হতে পারে, তা এই নিষ্ঠুর কর্তৃপক্ষ কখনোই বুঝতে চায়নি।

স্কুল কর্তৃপক্ষের এই ভয়াবহ ও অপমানজনক আচরণের প্রভাব শুধু স্কুল ক্যাম্পাসেই সীমাবদ্ধ থাকত না, তা ছড়াত শিক্ষার্থীদের ঘরেও। স্কুল থেকে অপমানিত ও ভর্ৎসিত হয়ে বাড়ি ফেরার পর অনেক অভিভাবক তীব্র মানসিক চাপে ভুগতেন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সন্তানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়তেন।

এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়ত। একদিকে স্কুলের টর্চার সেল, অন্যদিকে বাড়িতে মা-বাবার ক্ষোভ— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ত এবং পরিবারের সাথে তাদের এক ধরণের মানসিক দূরত্ব ও দেয়াল তৈরি হতো। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাবিকুন নাহারও এমনই এক দমবন্ধকর পরিবেশ ও চরম মানসিক যন্ত্রণার শিকার হয়ে, কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই আত্মহত্যার ঘটনার পর স্কুলটির সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাসুদ রানা লিটন, শিক্ষিকা মাহমুদা, সানজিদা, রিফাতসহ এই টর্চার সেলের সাথে জড়িত সমস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবিলম্ব গ্রেফতার এবং আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

অভিভাবকদের দাবি, এই ঘটনার যদি আজ দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হয়, তবে ব্রাইট স্কুলের মতো আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন 'টর্চার সেল' গড়ে উঠবে এবং আরও বহু সাবিকুন নাহারকে অকালে প্রাণ হারাতে হবে।

এই বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ