ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ভুয়া জুলাই যোদ্ধা সেজে হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি ভাতা


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫

ভুয়া জুলাই যোদ্ধা সেজে হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি ভাতা

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জুলাই বিপ্লবের সময় আহত না হয়েও জুবায়ের ইসলাম নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়ে প্রতি মাসে সরকারি ভাতা তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত জুবায়ের ইসলাম দেবীগঞ্জ পৌরসভার উত্তর পাড়া এলাকার রেজাউল করিমের ছেলে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৫ মার্চ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে রংপুর বিভাগের 'গ শ্রেণির' আহত জুলাই যোদ্ধার তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় গেজেট নাম্বার ১০২০ এ দেবীগঞ্জ উপজেলা থেকে আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে জুবায়েরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গেজেটভুক্ত হওয়ার পর থেকে সরকারে পক্ষ থেকে এককালীন এক লক্ষ টাকা অনুদান এবং প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে দশ হাজার টাকা করে ভাতা তুলছেন অভিযুক্ত জুবায়ের।

তবে অভিযোগ উঠেছে, গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা জুবায়ের দেবীগঞ্জে জুলাই বিপ্লবের মূল সময় অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট আহত হননি। তিনি বরং ৬ আগস্ট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে একটি দোকানের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের ধস্তাধস্তিতে সামান্য আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শী জামাল হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের বিপরীতে অবস্থিত একটি দোকান নিয়ে জুবায়েরের চাচা রফিকের সাথে আমাদের কয়েকজনের বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে জুবায়ের এসে ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে হাতাহাতির একপর্যায়ে তাঁর মাথায় এবং হাতের আঙুলে আঘাত লাগে। এরপর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে থানায় অভিযোগ করলে সেটি আপোষ করা হয়। দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুসন্ধান করে জানা যায়, জুবায়েরসহ মোট দুজন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বাম হাতের আঙুল ও মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলে নিশ্চিত করেছেন আবাসিক চিকিৎসক ডা. আবু নোমান মো. ইফতেখারুল তৌহিদ।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী একাধিক ছাত্র নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরো জুলাই বিপ্লবে দেবীগঞ্জ উপজেলায় শুধুমাত্র ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিপ্লবী ছাত্র জনতার উপর হামলা চালায়, সেদিন রবিউল ইসলাম রুবেল নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এই দুই দিনে জুবায়ের আন্দোলনে অংশ নিলেও তিনি আহত হননি। ছাত্র নেতা আব্দুল্লাহ আল কাফী শায়ের বলেন, "জুবায়ের ভাই জুলাই আন্দোলনে ছিলেন কিন্তু ৪ ও ৫ তারিখ আহত হননি। ৬ আগস্ট পারিবারিক দোকানের জমি নিয়ে বিরোধে তিনি আহত হন, অথচ তাঁকে জুলাইয়ের আহত যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে যারা জড়িত ছিলাম, বিভিন্নভাবে আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।" আরেক জুলাই বিপ্লব নেতা ওয়াসিম আকরাম বলেন, "দেবীগঞ্জে মূলত ৪ আগস্ট মারামারি হয়। ৫ আগস্টেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। যারা এই তালিকা করেছে, সেই কমিটি যদি জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সারির যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের কাছে তথ্য নিয়ে তালিকা করতো, তাহলে আরো ভালো হতো।"

অনুসন্ধানে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবে আহতদের তালিকা যাচাই করতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ, ওই কমিটির দুই ছাত্র প্রতিনিধি ৬ আগস্ট পর্যন্ত কারাগারে থাকায় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি, আর সেই পরিস্থিতিতে জুবায়ের ইসলামের নামও জুলাইয়ের আহত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও কমিটির ছাত্র প্রতিনিধি ওয়াসিস আলম বলেন, "আমাদের মনে হয়েছিল যেহেতু সে জুলাই যোদ্ধা, সেহেতু সে আহত হতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের এটা যাচাই করার সুযোগ হয়নি।" আরেক ছাত্র প্রতিনিধি খালিদ মাহমুদ সৈকত বলেন, "আমরা যখন কারাগার থেকে আসি, তখন আহতদের ভেরিফাই করার সময় তাকদীর (জুবায়ের) আমাদের কাছে কিছু তথ্য গোপন করেছিলো। তথ্য গোপন করেই সে জুলাই আহত যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।" এ বিষয়ে অভিযুক্ত জুবায়ের ইসলামের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, তাঁর একটি অডিও কথোপকথনে তিনি দাবি করেন, তিনি কাউকে অনুরোধ বা যোগাযোগ করেননি, সরকার নিজ উদ্যোগে তালিকা করেছে। তিনি বলেন, ৬ আগস্ট আহত হওয়ার তথ্যই তিনি জানান এবং সেটি মেডিকেল রিপোর্টেও উল্লেখ ছিল।

এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, তাঁর যোগদানের আগেই কমিটি যাচাই-বাছাই করে তালিকা পাঠিয়েছে। তিনি জানান, কেউ আহত না হলেও তালিকায় থাকলে তার নাম বাতিলের প্রস্তাব পাঠানো হবে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ভুয়া জুলাই যোদ্ধা সেজে হাতিয়ে নিচ্ছে সরকারি ভাতা

প্রকাশের তারিখ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জুলাই বিপ্লবের সময় আহত না হয়েও জুবায়ের ইসলাম নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়ে প্রতি মাসে সরকারি ভাতা তোলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত জুবায়ের ইসলাম দেবীগঞ্জ পৌরসভার উত্তর পাড়া এলাকার রেজাউল করিমের ছেলে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৫ মার্চ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে রংপুর বিভাগের 'গ শ্রেণির' আহত জুলাই যোদ্ধার তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় গেজেট নাম্বার ১০২০ এ দেবীগঞ্জ উপজেলা থেকে আহত জুলাই যোদ্ধা হিসেবে জুবায়েরের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গেজেটভুক্ত হওয়ার পর থেকে সরকারে পক্ষ থেকে এককালীন এক লক্ষ টাকা অনুদান এবং প্রতিমাসে নিয়মিতভাবে দশ হাজার টাকা করে ভাতা তুলছেন অভিযুক্ত জুবায়ের।

তবে অভিযোগ উঠেছে, গেজেটভুক্ত আহত জুলাই যোদ্ধা জুবায়ের দেবীগঞ্জে জুলাই বিপ্লবের মূল সময় অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৪ ও ৫ আগস্ট আহত হননি। তিনি বরং ৬ আগস্ট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে একটি দোকানের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষের ধস্তাধস্তিতে সামান্য আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শী জামাল হোসেন বলেন, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের বিপরীতে অবস্থিত একটি দোকান নিয়ে জুবায়েরের চাচা রফিকের সাথে আমাদের কয়েকজনের বাকবিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে জুবায়ের এসে ধাক্কাধাক্কি শুরু করলে হাতাহাতির একপর্যায়ে তাঁর মাথায় এবং হাতের আঙুলে আঘাত লাগে। এরপর তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে থানায় অভিযোগ করলে সেটি আপোষ করা হয়। দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুসন্ধান করে জানা যায়, জুবায়েরসহ মোট দুজন ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে বাম হাতের আঙুল ও মাথায় আঘাত নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন বলে নিশ্চিত করেছেন আবাসিক চিকিৎসক ডা. আবু নোমান মো. ইফতেখারুল তৌহিদ।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী একাধিক ছাত্র নেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, পুরো জুলাই বিপ্লবে দেবীগঞ্জ উপজেলায় শুধুমাত্র ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিপ্লবী ছাত্র জনতার উপর হামলা চালায়, সেদিন রবিউল ইসলাম রুবেল নামে একজন গুরুতর আহত হয়েছিলেন। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এই দুই দিনে জুবায়ের আন্দোলনে অংশ নিলেও তিনি আহত হননি। ছাত্র নেতা আব্দুল্লাহ আল কাফী শায়ের বলেন, "জুবায়ের ভাই জুলাই আন্দোলনে ছিলেন কিন্তু ৪ ও ৫ তারিখ আহত হননি। ৬ আগস্ট পারিবারিক দোকানের জমি নিয়ে বিরোধে তিনি আহত হন, অথচ তাঁকে জুলাইয়ের আহত যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। জুলাই আন্দোলনে যারা জড়িত ছিলাম, বিভিন্নভাবে আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই।" আরেক জুলাই বিপ্লব নেতা ওয়াসিম আকরাম বলেন, "দেবীগঞ্জে মূলত ৪ আগস্ট মারামারি হয়। ৫ আগস্টেও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। যারা এই তালিকা করেছে, সেই কমিটি যদি জুলাই বিপ্লবের সম্মুখ সারির যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের কাছে তথ্য নিয়ে তালিকা করতো, তাহলে আরো ভালো হতো।"

অনুসন্ধানে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবে আহতদের তালিকা যাচাই করতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে সদস্য সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ, ওই কমিটির দুই ছাত্র প্রতিনিধি ৬ আগস্ট পর্যন্ত কারাগারে থাকায় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি, আর সেই পরিস্থিতিতে জুবায়ের ইসলামের নামও জুলাইয়ের আহত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও কমিটির ছাত্র প্রতিনিধি ওয়াসিস আলম বলেন, "আমাদের মনে হয়েছিল যেহেতু সে জুলাই যোদ্ধা, সেহেতু সে আহত হতে পারে। অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের এটা যাচাই করার সুযোগ হয়নি।" আরেক ছাত্র প্রতিনিধি খালিদ মাহমুদ সৈকত বলেন, "আমরা যখন কারাগার থেকে আসি, তখন আহতদের ভেরিফাই করার সময় তাকদীর (জুবায়ের) আমাদের কাছে কিছু তথ্য গোপন করেছিলো। তথ্য গোপন করেই সে জুলাই আহত যোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।" এ বিষয়ে অভিযুক্ত জুবায়ের ইসলামের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, তাঁর একটি অডিও কথোপকথনে তিনি দাবি করেন, তিনি কাউকে অনুরোধ বা যোগাযোগ করেননি, সরকার নিজ উদ্যোগে তালিকা করেছে। তিনি বলেন, ৬ আগস্ট আহত হওয়ার তথ্যই তিনি জানান এবং সেটি মেডিকেল রিপোর্টেও উল্লেখ ছিল।

এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, তাঁর যোগদানের আগেই কমিটি যাচাই-বাছাই করে তালিকা পাঠিয়েছে। তিনি জানান, কেউ আহত না হলেও তালিকায় থাকলে তার নাম বাতিলের প্রস্তাব পাঠানো হবে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ